বাকলিয়া উপ-নির্বাচন ঘিরে দ্বিধাবিভক্ত নগর আওয়ামী লীগ

চট্টগ্রাম মেইল : আগামি ২৫ জুলাই চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) ১৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে উপ-নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতির মাঠ।

বারবার চেষ্টা করে সমঝোতায় ব্যর্থ হওয়ায় এ উপ-নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে আওয়ামী লীগের ৫ প্রার্থী। গত ১৭ ই এপ্রিল বাকলিয়া-১৭ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর এ কে এম জাফরুল হক ইন্তেকাল করলে গত ১২ জুন ওই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদটি শূন্য ঘোষণা করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়।

এর পর থেকেই ওই ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্ধিতা করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে শুরু হয়ে যায় দৌড়ঝাপ। আওয়ামী লীগের ৫ প্রার্থী মনোনয়ন সংগ্রহ করলেও বিএনপি থেকে একক প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন সংগ্রহ করেন প্রয়াত কাউন্সিলর এ কে এম জাফরুল হকের মেঝ ছেলে এ কে এম আরিফুল ইসলাম।

এর মধ্যে গত ৫ জুলাই ছিল মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের শেষ দিন। ৬ জুলাই মনোনয়নপত্র নেয়া ৬ প্রার্থীকেই মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করে চট্টগ্রাম জেলা আঞ্চলিক নির্বাচন কমিশন।

এদিকে আওয়ামী লীগের একটি বিশ্বস্থ সূত্রে জানা গেছে ১১ জুলাই মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন হওয়ায় আগের দিন ১০ জুলাই আওয়ামী লীগ থেকে একক প্রার্থী নির্ধারণে জরুরি এক সভায় বসেছিলেন নগর আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দরা। তবে নগর আওয়ামী লীগ নেতাদের মতভেদে একক প্রার্থী নির্ধারণের বিষয়টি ভেস্তে যায়।

অতঃপর ১২ জুলাই নির্ধারিত প্রতীক বরাদ্ধের দিনে লটারির মাধ্যমে ৬ জন প্রার্থীর জন্য ৬ টি প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হয়। এরমধ্যে বিএনপির একক প্রার্থী একেএম আরিফুল ইসলাম পেয়েছেন (মিষ্টি কুমড়া) প্রতীক। আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মধ্যে মোহাম্মদ শহিদুল আলম পেয়েছেন (ঘুড়ি) প্রতীক এবং মো. মাসুদ করিম টিটু (রেডিও), মো. শফি (লাটিম), শাহেদুল ইসলাম (টিফিন ক্যারিয়ার) ও শেখ নায়েম উদ্দীন (ঠেলাগাড়ি) প্রতীক বরাদ্ধ পান।

জানা যায়, প্রতীক বরাদ্দ পাওয়া আওয়ামী লীগ ঘরানার প্রার্থীদের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার সম্পাদক শহিদুল আলম এর আগেও ওই ওয়ার্ড থেকে তিনবার কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। রাজনীতিতে তিনি প্রয়াত মেয়র এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরীর অনুসারী হিসাবে পরিচিত।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম সরকারী সিটি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি ও পশ্চিম বাকলিয়া ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের যুগ্ন-সম্পাদক মাসুদ করিম টিটু ওই ওয়ার্ড থেকে প্রথমবারের মত নির্বাচনী প্রতিদ্বন্ধিতায় অংশ নিচ্ছে। জানা যায়, তিনি আগে সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির অনুসারী থাকলেও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি তার রাজনীতিতে যুক্ত হন।

মূলত এই দুজন প্রার্থীকে কেন্দ্র করে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতি। বিশ্বস্থ সূত্রে জানা যায়, এই দুই প্রার্থীর মধ্যে সমঝোতা করতে না পারায় আওয়ামী ঘরাণার বাকী প্রার্থীদেরও নির্বাচন থেকে সরিয়ে আনতে পারেনি দলটি। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মহিউদ্দীন-নাছির বিভক্তি নগরে নতুন রুপে প্রকাশ পেল নওফেল-নাছির সমীকরণে।

দৃশ্যপটে দেখা যায়, গেলো সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম ৯ (কোতোয়ালি) সংসদীয় আসন থেকে আওয়ামী লীগ থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হওয়া ব্যরিষ্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অদৃশ্য সমর্থন রয়েছে আসন্ন উপনির্বাচনের কাউন্সিলর প্রার্থী শহিদুল আলমের পক্ষে। ফলে শহীদের পক্ষে মাঠে নেমেছে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগ।

অন্যদিকে মেয়র নাছিরের অলিখিত সমর্থন পাওয়া টিটুর পক্ষে গণসংযোগ করছে নাছিরের পক্ষের লোকজন ও সরকারি সিটি কলেজের সাবেক ছাত্রনেতাদের একাংশ। তবে সিটি কলেজ ছাত্রলীগ এবং সিটি কলেজ ব্লকের মহানগর ছাত্রলীগ নেতা কর্মীদের অংশটি শহীদের পক্ষে প্রচারনায় আটঘাট বেঁধে নেমেছে। যেটির তত্বাবধানে রয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সম্পাদক-সিটি কলেজর সাবেক ছাত্র সংসদের ভিপি রাজীব হাসান রাজন ও মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু।

জানা যায়, মাসুদ করিম টিটু সিটি কলেজের রাজনীতি থেকে উঠে আসলেও নগর ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক ও সিটি কলেজের ছাত্র সুদীপ্ত বিশ্বাসকে পিটিয়ে হত্যাকান্ডে টিটুর ইন্দন রয়েছে এমন অভিযোগের কারনে সিটি কলেজের সাধারণ ছাত্র নেতাদের অনেকেরই টিটুর প্রতি ক্ষোভ জন্মে। মূলত সুদীপ্ত হত্যাকান্ডকে কেন্দ্র করে টিটুর বিপক্ষেই নেমেছে সিটি কলেজের বর্তমান ছাত্রনেতারা। এছাড়াও ওমরগনি এমইএস কলেজ ও ইসলামিয়া কলেজের নেতারাও সাবেক কাউন্সিলর শহীদের পক্ষে রাতদিন গনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছে ১৭ নং ওয়ার্ডের পাড়া-মহল্লায়।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই একটি ওয়ার্ডের উপ-নির্বাচনেই ফুটে উঠেছে দলটির বিভক্তি কতটা চরম আকার ধারণ করেছে। আওয়ামী লীগের ৫ প্রার্থীর ভীড়ে জেতার ক্ষীণ সম্ভাবনায় বিএনপির একক প্রার্থী জয়ী হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, চসিকের ১৭ নং পশ্চিম বাকলিয়া ওয়ার্ডে মোট ভোটার সংখ্যা রয়েছে ৪৯ হাজার ৮শ ২৫ জন। এর মধ্যে ২৩ হাজার ৭শ ৪৮ জন পুরুষ এবং ২৬ হাজার ৭৭ জন রয়েছে মহিলা ভোটার। এ ওয়ার্ডে মোট ১৭টি ভোট কেন্দ্রে ভোট কক্ষ আছে ২শ ২৪টি। আগামী ২৫ শে ডিসেম্বর ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) অনুষ্ঠিত হবে এই উপ-নির্বাচন।

প্রসঙ্গত, সিটি করপোরেশন আইন ২০০৯-এর ১৬ ধারা অনুযায়ী, মেয়াদ শেষ হওয়ার ১৮০ দিন পূর্বে মেয়র বা কাউন্সিলর পদ শূন্য হলে ৯০ দিনের মধ্যে তা পূরণ করতে হবে। উপ-নির্বাচনে যিনি নির্বাচিত হবেন, তিনি অবশিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত ওই পদের দায়িত্ব গ্রহণ করে কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

বিএম/কে এম আর