পেতেছে প্রতারণার নতুন ফাঁদ
অনুসন্ধান : ইউনিপে টু চট্টগ্রামের রাশেদুল গড়েছে সম্পদের পাহাড়!

বিশেষ প্রতিবেদন : মামলার সাত বছর গত হলেও ইউনিপে টু’র প্রতারিত গ্রাহকরা ফেরত পাননি তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ। চট্টগ্রামের সাড়ে তিন লাখ বিনিয়োগকারী তাদের অর্থ ফেরত না পেলেও নগরীতে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছে অভিযুক্তরা।

সাত বছর আগেও তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সাত হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন রাশেদুল বারি শিপলু। ইউনিপের টাকায় এখন তিনি অঢেল সম্পত্তির মালিক।

ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার শহরে তার রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট, প্লটসহ স্থাবর-অস্থাবর শত কোটি টাকার সম্পদ। এসবই হয়েছে সাধারণ মানুষের শত শত কোটি টাকা আমানত লোপাট করে।

তিনি হলেন-মাল্টি লেবেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানি ইউনিপে টু ইউ’র চট্টগ্রাম জোনের শীর্ষ কর্মকর্তা রাশেদুল বারী ওরফে শিবলু (৩৯)। তার গ্রামের বাড়ি মিরসরাই উপজেলার সদরে। বাবার নাম খোরশেদ আলম মেম্বার।

নগর পুলিশ জানাচ্ছে, রাশেদুল একজন বড়মাপের প্রতারক। ইউনিপে টু ইউ’র প্রতারক হিসেবে টপ টেনে রয়েছে তার নাম। প্রতারণার মামলায় সে একাধিবার জেল খাটলেও এখন সে জামিনে আছে।

তথ্য বলছে ইউনিপে টু ইউ’র এমডিসহ কারাবন্দি অন্য কর্মকর্তাদের মামলা পরিচালনা করছেন রাশেদুল বারী।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের অসংখ্য গ্রাহকের শত কোটি লোপাট করে এখন ভিন্নধর্মী প্রতারণা শুরু করেছেন তিনি। এবার নগরের খুলশিতে মিজানুর রহমান নামের এক প্রবাসীর মালিকানাধীন ৭ কোটি টাকা দামের একটি ফ্ল্যাট অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন রাশেদুল বারী।

জানা গেছে, দশমাস আগে নগরের খুলশি থানা কার্যালয়ের পাশে চার নম্বর রোডের চার নম্বর ‘ফয়জুন ভিসতা’ নামে দশতলা ভবনের ৯ তলার প্রায় সাত হাজার বর্গফুট আয়তনের বিলাসবহুল একটি ফ্ল্যাট (বি-৯) একজন ব্রোকারের মাধ্যমে এক লাখ ৫ হাজার টাকায় ভাড়ায় নেন রাশেদুল বারী শিবলু। কিছুদিনের মধ্যে ফ্ল্যাট মালিক মিজানুর রহমানের সঙ্গে চুক্তিপত্র সম্পাদন করার আশ্বাস দিয়ে ফ্ল্যাটটিতে বসবাস শুরু করেন রাশেদুল বারী।

এভাবে দশমাস চলে গেলেও ফ্ল্যাটের ভাড়া বাবদ ওই ফ্ল্যাট মালিককে ভাড়া পরিশোধ করেনি। ভাড়ানামা চুক্তিও না থাকলেও জোর করে ফ্ল্যাট দখল করে রেখেছেন।

এদিকে রাশেদুল বারীর কবজা থেকে ফ্ল্যাটটি উদ্ধারে আইনগত পদক্ষেপ নিতে খুলশি থানা পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী। এ ব্যাপারে আইনগত পদক্ষেপ নিতে নগর পুলিশ কমিশনার মাহবুবর রহমান খুলশি থানার ওসিকে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নাম ভাঙিয়ে কথিত ক্যাপ্টেন সালেহ’র স্ত্রী পরিচয় দিয়ে এক নারী (মোবাইল নম্বর-০১৭৩১৮৮৮৩০২) রাশেদুলের পক্ষে পুলিশের উপর চাপ সৃষ্টি করছেন। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে কল করলেও ফোন রিসিভ করেননি ওই নারী।

খুলশি থানার ওসি প্রণব চৌধুরী বলেন, ‘ রাশেদুল একজন প্রতারক। কয়েকবছর আগেও সাত হাজার টাকা বেতনে চাকরি করে রাশেদুল এখন আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন।

নগরের গোলপাহাড় এলাকায় কেএসএ স্টিল নামে একটি কোম্পানির স্বত্বাধিকারী এস এম দেলোয়ার বলেন, ‘২০০৮ সালে আমার প্রতিষ্ঠানে রাশেদুল সাত হাজার টাকা বেতনে চাকুরি করেছে। পরে সে ইউনিপে টু ইউতে যোগ দিয়ে সাধারণ মানুষের শত শত কোটি টাকা লোপাট করে বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছেন ।’

এদিকে বছরখানেক আগে প্রতারক রাশেদুল বারী নগরের খুলশি এলাকায় একই কায়দায় আরকটি ফ্ল্যাট দখলের চেষ্টা করেছেন বলে জানিয়েছেন সাবেক মেয়র প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী মো. ওসমান গণি।

তিনি প্রতিবেদককে জানান ‘সাধারণ মানুষের শত শত কোটি লোপাট করে রাশেদুল বারী এখন ভিন্ন কায়দায় প্রতারণায় নেমেছেন। এর আগে সে একই কায়দায় আমার এক আত্মীয়ের ফ্ল্যাট বাড়ি দখল করার চেষ্টা করেছে। পরে তাকে উচ্ছেদ করা হয়। ”

এদিকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়ায় গত ১৮ জুলাই রাশেদুল বারীর  বিরুদ্ধে খুলশি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন ওই ভবনের একটি ফ্ল্যাটের মালিক এবং শিল্পপতির পক্ষে অথরাইজার মেরিন ক্যাপ্টেন ও চট্টগ্রাম চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক সফি চৌধুরী।

জানা গেছে, অথরাইজার হিসেবে ক্যাপ্টেন সফি এবং অ্যাপার্টমেন্ট মালিক অ্যাসেসিয়েশনের সভাপতি ইমদাদ আলী ভাড়ানামা চুক্তি চাইলে তাদের এবং তাদের পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকি দেন রাশেদুল বারী।

ক্যাপ্টেন সফি চৌধুরী বলেন, ‘রাশেদুল বারী একজন বড় প্রতারক এবং সন্ত্রাসী। সে ইউনিপে টু ইউ’র নামে আমার ছেলের দশ লাখ টাকা মেরে দিয়েছে।’

মেরিন ক্যাপ্টেন সফি জানান, ঈদুল আজহার আগের দিন রাতে ১১টার দিকে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ইমদাদ আলীর তৃতীয় তলার বাসায় সন্ত্রাসী নিয়ে হামলা চালানোর চেষ্টা করেন রাশেদুল বারী। এসময় ক্যাপ্টেন সফি থানায় ফোন করলে সেখান থেকে ইকবাল নামে পুলিশের এক এসআই ঘটনাস্থলে আসেন।

বাসায় হামলা চালানোর চেষ্টার বিষয়টি নিশ্চিত করে ইমদাদ আলী বলেন, ‘মালিকের অসুস’তা এবং সরলতার সুযোগ নিয়ে রাশেদুল বারী ফ্ল্যাটটি অবৈধভাবে দশমাস ধরে দখলে রেখেছেন। তিনি কোনো ভাড়ানামা চুক্তিও করেননি। ফ্ল্যাট খালি করতে বললে উল্টো আমাদের হেনস্থা করছেন।’

জানা গেছে, রাশেদুল তার স্ত্রী পাপিয়া রফিক, শ্বশুর রফিকুল ইসলাম, শাশুড়ি, শ্যালক ও বড়ভাই সাজেদুল বারীসহ নামে-বেনামে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে বিপুল পরিমাণ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, হালিশহর কে বস্নকে দুই নম্বর রোডে ১৫ নম্বর বাড়ি ‘লাভ ল্যান্ড টাওয়ারে রাশেদুলের আছে ১২৬০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট (নম্বর ডি-১)।

নগরের আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকায় ২২ নম্বর রোডে ১৯ নম্বর ‘বিএন হাউস’ নামের বহুতল ভবনের তৃতীয় তলায় আছে ৭ হাজার বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাট।

কক্সবাজারে ‘গ্রিন ডেল্টা’ নামে একটি পাঁচতারকা হোটেলে আড়াই কোটি টাকায় কিনেছেন একটি ফ্লোর। নগরের পশ্চিম ফিরোজশাহ জি বস্নকের ১১ নম্বর পস্নটে এন আর জি কমপেস্নক্সের প্রথম ও দ্বিতীয় তলাজুড়ে গড়ে তুলেছেন  ‘হোটেল হলি ফেইম রেস্ট্ররেন্ট‘ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। একই নম্বর প্লটে গড়ে তুলেছেন ‘হলি ইন রেস্টুরেন্ট নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠান।

নগরের আগ্রাবাদ চৌমুহনী এলাকায় কে কে মোটরসের বিপরীতে রাশেদুল বারীর রয়েছে দুটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যথাক্রমে রোশা অটোমোবাইলস লিমিটেড ও নেকসাস অটোমোবাইলসহ লিমিটেড।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মিরসরাই উপজেলা সদরে আছে নামে-বেনামে রয়েছে বিপুল সম্পদ। এছাড়া নিজের ও স্ত্রী পাপিয়া রফিকের নামে হালিশহর বি-ব্লকে তিনটি, হালিশহর এল, জে, এইচ বস্নকেও আছে একাধিক ফ্ল্যাট বাড়ি।

স্ত্রী পাপিয়ার নামে একাধিক ব্যাংকে আছে কোটি কোটি টাকার এফডিআর। ২০০৮ সালে নগরের একটি বিউটি পার্লারে ৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন রাশেদুল বারীর স্ত্রী পাপিয়া রফিক। ২০১০ সালে সী-ভিউ নামের একটি ডেভেলপার কোম্পানিতে মাত্র ৮ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করতেন এই প্রতারক রাশেদুল বারী শিবলু।

ইউনিপে টু’র কর্মকর্তা ও এজেন্টের বিরোদ্ধে
বিনিয়োগকারীদের চট্টগ্রামের আদালতে দায়েরকৃত মামলা দেখভাল করেন শিবলু।

প্রতারণামূলক কর্মকান্ডের পাশাপাশি রাশেদুলের বিরুদ্ধে নিজস্ব ফ্ল্যাট বাড়িতে মাদক ব্যবসা ও অসামাজিক কাজের অভিযোগ করেন স্থানীয়রা ।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায় , দক্ষিণ খুলশির এক নম্বর রোডের এক নম্বর লেইনের সি-ব্লকের ছয়তলা ভবনের দ্বিতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা ও অসামাজিক কার্যকলাপ চালিয়ে আসছেন রাশেদুল বারী ওরফে শিবলু।

বক্তব্য জানতে শিবলুর সাথে যোগাযোগ করা হলে সে নিজেকে মাই চ্যানেল নামক কথিত টিভির মালিক বলে জানায়। এসময় প্রতিবেদককে প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিবের সাথে নিজের ভিডিও দেখায়।

ভিডিওতে রাশেদুল বারি শিবলুর উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপ প্রেস সচিবকে বক্তব্য রাখতে দেখা যায়।

শিবলুর সাথে ঘনিষ্ট একটি সুত্র জানায় ইউনিপে টু’র গ্রাহক ও বিভিন্ন এজেন্টদের প্রায় শত কোটি টাকার পে অর্ডার নিজের কব্জায় রেখেছেন তিনি।

সুত্রটি আরো জানায় এসব পে অর্ডার বেসরকারী ব্যাংক আইএফআইসির চট্টগ্রামের একটি শাখা থেকে করা। আদালতের নির্দেশের কারনে এসব পে অর্ডার নগদায়ন করা সম্ভব হয় নি।

বিএম/ও জামান/আর এস প্রিন্স