ভগবান শ্রীকৃষ্ণের উৎসব সাড়ম্বরে উদযাপিত
শ্রীকৃষ্ণ ধ্বনিতে জনসমুদ্রে নগরী, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় ভক্তের ঢল

চট্টগ্রাম মেইল : হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম বড় ধর্মীয় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উৎসব। শ্রীকৃঞ্চের জন্মতিথি উপলক্ষে বাংলাদেশের সকল স্থানে শ্রীকৃষ্ণের জন্মাষ্টমী উৎসব সাড়ম্বরে উদযাপিত হচ্ছে। সারাদেশের ন্যায় চট্টগ্রামেও নানা আয়োজনে দিনব্যাপী উৎসব পালিত হচ্ছে।

শুক্রবার সাড়ে ১০টায় শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্দ্যেগে ঐতিহাসিক মহাশোভাযাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয় আয়োজন। চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা কয়েক হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে।বর্ণাঢ্য এ শোভাযাত্রায়।

নগরীর আন্দরকিল্লাহ সিটি করপোরেশন ভবনের সামনে থেকে শুরু হওয়া মহাশোভাযাত্রাটির উদ্বোধন করেন চট্টগ্রামস্থ সহকারী ভারতীয় হাই কমিশনার অনিন্দ্য ব্যানার্জী। উদ্বোধন শেষে শুরু হয় শোভাযাত্রা। এতে অংশ নিতে নগর ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলা থেকে ট্রাক, মিনিট্রাক, পিকআপ, লরি নিয়ে ভক্তরা আন্দরকিল্লা, মোমিন রোডসহ আশপাশের এলাকায় জড়ো হন।

শ্রীকৃষ্ণ ধ্বনিতে জনসমুদ্রে পরিণত হয় পুরো এলাকা। ভক্তরা কৃষ্ণের রথ, রাধা-কৃষ্ণের যুগল মূর্তি, কংসের কারাগারসহ শ্রীকৃষ্ণের জীবনের নানা অংশের আদলে সেজে শোভাযাত্রায় অংশ নেন। বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের পক্ষ থেকেও র‌্যালি যোগ দেয় শোভাযাত্রায়।

উদ্বোধনী বক্তব্যে চট্টগ্রামে নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার অনিন্দ্য ব্যানার্জি বলেন, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের জন্য মানবপ্রেম প্রচারের উদ্দেশে সাড়ে ৫ হাজার বছর আগে ভগবান শ্রীকৃঞ্চের আর্বিভাব হয়েছিল। শ্রীকৃঞ্চের আদর্শ ধারণ করতে পারলেই হানাহানিমুক্ত বিশ্ব গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা প্রাণ দিয়েছেন, আমি তাদের গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি। ভারতীয় বাহিনীর অনেকে যুদ্ধে প্রাণ দিয়েছেন, এটা আমাদের জন্য গর্ব।

‘স্বাধীনতার পর গত ৪৮ বছরে বাংলাদেশের অনেক অর্জন আছে। বাংলাদেশ অর্থনীতিতে প্রভূত উন্নতি করে এখন মধ্যম আয়ের দেশ হতে যাচ্ছে। বাংলাদেশের এই উন্নতিতে ভারত খুবই খুশি। ভারত সবসময় বাংলাদেশের পাশে ছিল। বর্তমানেও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে, বলেন অনিন্দ্য ব্যানার্জী

শ্রীশ্রী জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের সহ-সভাপতি ও মহাশোভাযাত্রা উপ-পরিষদের আহ্বায়ক অলক দাশের সভাপতিত্বে শোভাযাত্রার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন, এদেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে আবহমানকাল থেকে বসবাস করে আসছে। এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে হবে। শ্রীকৃষ্ণ আজীবন মানবতার জয়গান গেয়েছেন। তাঁর আদর্শ ধারণ করতে পারলে সমাজে কোনও বৈষম্য থাকবে না।

বিশেষ অতিথি ছিলেন সিএমপি কমিশনার মো. মাহাবুবর রহমান, ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত, দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, সিলেটের মহাপ্রভু শ্রীঅঙ্গনের অধ্যক্ষ শ্রীল রাধাবিনোদ মিশ্রজী মহারাজ। বক্তব্য দেন জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের সহ-সভাপতি বিমল কান্তি দে, সাবেক সভাপতি ও রাউজান পৌরসভার মেয়র দেবাশীষ পালিত, সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট চন্দন তালুকদার।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালে। আজ ৪৭ বছর পার হয়ে আমাদের অনেক উন্নয়ন, অনেক অগ্রগতি হয়েছে। আবার অনেক কিছু করারও আছে। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলছে। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সকলের প্রতি সহমর্মিতা নিয়েই যাতে আমরা বাংলাদেশ গড়তে পারি। উন্নয়নের পথে শেখ হাসিনার যাত্রায় যেন সবাই শামিল হতে পারি।

বক্তারা বলেন, সনাতন ধর্মের প্রাণপুরুষ মহাবতার পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ নানান ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে মানবজাতির কাছে জীবন ধারণের অনন্য উদাহরণ রেখে গেছেন। শ্রীকৃষ্ণের বাণী সমগ্র বিশ্বকে আলোড়িত করছে হাজার বছর ধরে। শ্রীকৃষ্ণের শিক্ষা হলো- অন্যায়কে পরাভূত করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা। এই পবিত্র দিনে সকল অকল্যাণ ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে অন্তর আত্মাকে জাগ্রত করার শপথ নিতে হবে।

উপস্থিত ছিলেন চসিক প্যানেল মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমন, জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের কার্যকরী সভাপতি ডা. মনোতোষ ধর, সহ-সভাপতি সাধন ধর, লায়ন দুলাল চন্দ্র দে, পরেশ চন্দ্র চৌধুরী, মহাশোভাযাত্রা উপ-পরিষদের সদস্য সচিব লায়ন আশীষ কুমার ভট্টাচার্য্য, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক লায়ন তপন কান্তি দাশ, এস প্রকাশ পাল প্রমুখ।

শোভাযাত্রা ঘিরে নগরের কয়েকটি সড়কের যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করে নগর পুলিশের ট্রাফিক উত্তর বিভাগ। গুডস হিল ক্রসিং, জামাল খান, এনায়েত বাজার, ফিশারি ঘাট, সিটি কলেজ মোড়, লাভ লেইন, আমতলা, তিনপুল সহ শোভাযাত্রার গমনপথের সব সড়কে যানবাহন চলাচল সকাল ৮টা থেকে দুপুর পর্যন্ত আংশিক বন্ধ রাখা হয়।

জন্মাষ্টমীর্ শোভাযাত্রা জেএমসেন হল থেকে শুরু হয়ে আন্দরকিল্লা মোড়, টেরীবাজার, লালদীঘির পূর্ব পাড়, সোনালী ব্যাংক মোড়, কোতোয়ালী থানার মোড়, নিউ মার্কেট, রাইফেল ক্লাব, তুলসীধাম, নন্দনকানন, মোমিন রোড ও চেরাগী পাহাড় ঘুরে ১২টার দিকে জেএমসেন হলের সামনে এসে শেষ হয়।

জন্মাষ্টমী উপলক্ষে নগরীর জে এম সেন হলে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি রক্তদানসহ বিভিন্ন কর্মসূচীরও আয়োজন করা হয়েছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আশীর্বাদ পেতে এদিন উপবাস রেখে পুজো-অর্চনা করছেন সনাতনীরা।

বিএম/আরএসপি..