বন্ধুর স্ত্রীকে একান্তে চেয়েছিল ফাহিম, ক্ষোভে খুন করে আরিফ

চট্টগ্রাম মেইল : তিনদিন ধরে নিখোঁজ থাকার পর চকবাজারের ডিসি রোডের একটি বাড়ির পরিত্যক্ত পানির ট্যাংকি থেকে শাখাওয়াত হোসেন ফাহিমে (২১)র গলিত মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের পর লাশের সুরতহাল রিপোর্ট ও আলামতে এটি পরিকল্পিত হত্যাকান্ড হিসেবেই তদন্তে নামে পুলিশ।

নিহত ফাহিমের কল লিস্ট ও অন্যান্য স্বজনদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য উপাত্ত নিয়ে হত্যাকান্ডে জড়িত মুল আসামিকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ।

মঙ্গলবার (২৭ আগস্ট) দিবাগত রাতে ভোলা জেলার রতনপুর থেকে নিহতের ফাহিমের বন্ধু মো. আরিফকে গ্রেফতার করা হয়। আরিফ চকবাজার থানার ডিসি রোডের আবু কলোনির বাসিন্দা মো. খোকনের ছেলে।

বুধবার সকালে তাকে চট্টগ্রামে আনার পর বেলা ১১টার দিকে মোমিন রোডের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে খুনের কারণ সম্পর্কে গণমাধ্যম কর্মীদের তুলে ধরেন নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) মেহেদী হাসান।

তিনি জানিয়েছে গ্রেফতারের পর খুনী আরিফ পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে নিহত ফাহিম ও সে দুজনই প্রতিবেশি এবং ভাল বন্ধু ছিলেন। তারা মাঝে মধ্যে ইয়াবা সেবন করতো। ফাহিম খুন হওয়ার দুদিন আগে ইয়াবা সেবনকালে ফাহিম তার স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করার প্রস্তাব দেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিশোধ নিতে গত ২০ আগষ্ট ফোন করে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে খুন করে পানির ট্যাংকে ফাহিমের লাশ ফেলে সে পালিয়ে যায়।

সংবাদ সম্মেলনে উপ-কমিশনার মেহেদী বলেন, ডিসি রোডের আবু কলোনীর পাশে আবুল কাশেমের বাড়ির দ্বিতীয় তলায় টিনশেডঘেরা পানির টাংকি ও ভাড়াটিয়া বিপ্লব দে’র বাসায় আরিফ, ফাহিমসহ আরো কয়েকজন আড্ডা দিতো এবং প্রায় সময় তারা ইয়াবা সেবন করতো।

আড্ডায় প্রায় সময় আরিফের স্ত্রীর সাথে সঙ্গম করার প্রস্তাব করতো ফাহিম। এজন্য তার স্ত্রী অফিস থেকে আসার পর তাকে বাসা থেকে বেড়িয়ে সুযোগ করে দেওয়ারও প্রস্তাব দিয়েছিলো। এতে ক্ষদ্ধ হয়ে মনের ক্ষোভ থেকে ফাহিমকে খুন করার পরিকল্পনার ছক আকে আরিফ।

ঘটনাস্থলে আগে থেকে একটি কাঁথা ও একটি ছুরি প্রস্তুত রেখে গত ২০ আগষ্ট ফাহিমকে সেখানে আসতে ফোন করা হয়। তবে সেদিন তার ফোন থেকে ফাহিমের সাথে যোগাযোগ করেনি আরিফ। অপর এক বন্ধু শাহজাহানের মোবাইল থেকে ফাহিমকে ফোন করে ডেকে আনা হয়।

সকাল সাড়ে ৮টার সময় গল্প করার এক পর্যায়ে আরিফ ছুরি দিয়ে ফাহিমের গলায় পোঁচ দেন এবং মৃত্যু নিশ্চিত করতে বুক, পেট, পিঠে এলাপাতাড়ি ছুরি মারেন। এরপর লাশ পানির ট্যাংকে ফেলে দিয়ে তার স্ত্রীর কর্মস্থল অক্সিজেন গিয়ে তার কাছ থেকে ৮শ টাকা সংগ্রহ করে আরিফ। পরে ভোলার রতনপুরে খালার বাসায় আশ্রয় নিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়।

নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) শাহ মো. আব্দুর রউফ জানিয়েছেন গত ২৩ আগস্ট দুপুর সাড়ে ১২টায় চকবাজার ডিসি রোডের আবু কলোনি রোডের আবুল কাশেমের ভাড়া ঘরের দ্বিতীয় তলায় পরিত্যক্ত একটি কক্ষ থেকে ফাহিমের গলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

এর আগে গত ২০ আগস্ট সকাল ৯টায় মোবাইলে অজ্ঞাত এক ব্যক্তির কল পেয়ে শহীদ কমিশনার গলি দাদীর বাসা থেকে বের হয়েছিলেন ফাহিম। ২৪ ঘণ্টায়ও বাসায় না ফেরায় তার বাবা আনোয়ার হোসেন চকবাজার থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। গত ২৩ আগস্ট প্রচন্ড দুর্গন্ধ বের হলে স্থানীয়রা ওই বাড়ির ছাদে পরিত্যক্ত একটি পানির ট্যাংকে ফাহিমের লাশ দেখতে পান।

লাশ উদ্ধারের পর গত শুক্রবার রাতে নিহতের বাবা আনোয়ার হোসেন বাদি হয়ে অজ্হাতনামা আসামি করে একটি মামলা দায়ের করে। মামলার পর ফাহিমের মোবাইলে সর্বশেষ কল করা ব্যক্তির মোবাইল নম্বরের সূত্র ধরে খুনিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালায় পুলিশ। এছাড়া স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে ও তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় খুনির পরিচয় নিশ্চিত হয়ে ভোলার রতনপুর থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারের পর পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আরিফের দাবি হত্যাকা-ের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত নেই। সে একাই এ হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে।

জানা যায়, নিহত ফাহিমের বাবা আনোয়ার হোসেন পরিবার নিয়ে নগরীর চান্দগাঁও থানার বলিরহাট এলাকার ঘাটকুল বাদশা সওদাগরের বাড়িতে থাকতেন। তাদের গ্রামের বাড়ি পটিয়া উপজেলার আজিমপুর অলিরহাট এলাকায়। ডিসি রোডের শহীদ কমিশনারের গলি এলাকায় দাদীর পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জায়গায় গড়ে তোলা একটি বাড়িতে ছোট চাচা মো. ইদ্রিস ওরফে হিরু এবং দাদীর সাথে থাকতেন ফাহিম।

নিহত ফাহিম নগরের ফকিরহাট শাহরিয়ার অ্যান্ড ব্রাদার্স নামে একটি সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন বলে জানিয়েছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও চকবাজার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আবছার উদ্দিন রুবেল।

সংবাদ সম্মেলনে চকবাজার জোনের সহকারী কমিশনার মুহাম্মদ রাইস্লু ইসলাম, চকবাজার থানার ওসি মো. নিজাম উদ্দিন, পরিদর্শক (তদন্ত) মো. রিয়াজ উদ্দিন চৌধুরীসহ অভিযান পারিচালনাকারী টিমের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

বিএম/রাজীব সেন প্রিন্স..