গতি ফেরার প্রত্যাশায় তৃণমুল
ষোল বছর পরে চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের সম্মেলন!

রাজীব সেন প্রিন্স : সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ষোল বছর পরে চলতি মাসের মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে যুবলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের জন্য কেন্দ্র থেকে একটি মোখিক নির্দেশনা এসেছে। ঠিক একই সময়ের মধ্যে চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ জেলার তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি গঠন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সকল নেতাকর্মীদের সমন্বয় করতেও নির্দেশনা এসেছে। নির্দেশনা মতে সময়ের মধ্যেই ওয়ার্ড কমিটিগুলো গঠিত হলেই আগামী অক্টোবর মাসেই নগর যুবলীগের পাশপাশি চট্টগ্রাম উত্তর-দক্ষিণ জেলা যুবলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।

আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চুকে নগর ও উত্তর জেলায় তৃণমূল পর্যায়ে এবং আওয়ামী যুব লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মাহমুদুল হককে দক্ষিণ জেলার তৃণমূল পর্যায়ে কমিটি গঠন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে মৌাখিকভাবে দায়িত্ব ও নির্দেশনা দিয়েছেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী।

তবে চলতি মাসের মধ্যে কমিটি গঠন করে আগামী মাসে (অক্টোবরের) মধ্যে সম্মেলনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার নির্দেশনাটি এখনো সকলের অজানা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগর যুবলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী বলেন, অক্টোবরের মধ্যে যুবলীগের কমিটি গঠনের কথা আমাদের কেউ বলেনি। তবে মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চুর কাছে নির্দেশনা এসেছে।

তারা জানিয়েছেন, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় যুবলীগ নের্তৃবৃন্দের ডাকে সাড়া দিয়ে চট্টগ্রাম উত্তর-দক্ষিণ ও মহানগর যুবলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এবং আহবায়ক কমিটির সদস্যরা ঢাকায় গিয়ে সম্মেলনের প্রস্তুতির বিষয়ে অবগত করেছেন। তখন শুধুমাত্র দক্ষিণ জেলা যুবলীগের সম্মেলন আগামী অক্টোবরের মধ্যে সম্ভব হলেও চট্টগ্রাম উত্তরের বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত হয়নি এবং মহানগরে কিছু সমস্যা আছে উল্লেখ করে সব সমাধান করতে কয়েক মাস সময় প্রয়োজন বলেছিলেন নেতারা।

চট্টগ্রাম নগরের সম্মেলন কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরে দ্রুত কমিটি গঠন সম্ভব নয় উল্লেখ করে কেন্দ্রীয় কমিটি বরাবর একটি চিঠিও দেওয়া হয়। এতে বলা হয় মহানগরে সমস্যাগুলো সমাধান করে সকল নের্তৃবৃন্দকে নিয়ে সমন্বয় করতে কয়েক মাস সময় প্রয়োজন।

জানা যায়, চট্টগ্রামে ৪৩টি কমিটির মধ্যে ৬টি কমিটি মোটামুটি পূর্ণাঙ্গ হলেও আরো ৩৭টি কমিটি এখনো গঠিত হয়নি। সর্বশেষ ২০১৩ সালের জুলাইয়ে মহিউদ্দিন বাচ্চুকে আহবায়ক করে ৩ মাসের জন্য ১০১ সদস্যের আহবায়ক কমিটি গঠন হয়। মাত্র ৯০ দিনের জন্য আহবায়ক কমিটি গঠিত হলেও ইতিমধ্যে পার হয়ে গেছে ছয়টি বছর।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর অন্তর সম্মেলনের মাধ্যমে সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার কথা থাকলেও ছয় বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও এখনো বহাল আগের আহবায়ক কমিটি। এ কমিটি পুর্ণাঙ্গ কমিটি তো দুরে থাক গত ছয় বছরে নগরীর ৪৩টি সাংগঠনিক ওয়ার্ডের মধ্যে মাত্র ৬টিতে কোনো ধরণের সম্মেলন ছাড়া নামমাত্র কমিটি ঘোষণা করেছে।

ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে যুব জাগরণ, যুব সমাবেশ, সংবাদ চিত্র প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করলেও দীর্ঘ ৬ বছরে ওয়ার্ড সম্মেলন শেষ করতে পারেনি। মাত্র ৬টি ওয়ার্ডের সম্মেলন আয়োজনে সক্ষম হন তারা।

এরমধ্যেই আগামী এক মাসের মধ্যে বাকি থাকা ৩৭টি কমিটি গঠন করে অক্টোবরের সম্মেলন আয়োজনের খবর শুনা গেলেও এর বাস্তবিক কোনো সম্ভাবনা দেখছেন না যুবলীগের নতুন নেতৃত্ব প্রত্যাশীরা। তারা রীতিমতো হতাশ। ছাত্রলীগের নেতৃত্ব থেকে বিদায় নেওয়া অনেক নেতাই যুবলীগের নেতৃত্বপ্রাপ্তির প্রত্যাশা করছেন, কিন্তু সম্মেলন না হওয়ায় তাদের সে প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না।

তবে নগর যুবলীগের আহবায়ক কমিটিতে থাকা কয়েকজন সদস্য জানিয়েছেন, কেন্দ্র থেকে যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চুকে কমিটি গঠন ও সম্মেলনের জন্য নেতাকর্মীদের সমন্বয় করার দায়িত্ব দেয়া হলেও এখনো পর্যন্ত মহানগর নেতৃবৃন্দের সাথে কোন বৈঠক কিংবা আলোচনা করা হয়নি। তবে সম্মেলন করার জন্য আমরা সকলেই প্রস্তুতি নেওয়ার পক্ষে।

সম্মেলন করতে হলে আমাদের ওয়ার্ড কমিটি গুলো দ্রুত করতে হবে। সেক্ষেত্রে ৪৩টি কমিটির মধ্যে এখনো ৩৭টি কমিটি গঠন প্রক্রিয়া বাকি আছে। প্রত্যেকটি কমিটি গঠন করতে যদি তিনদিন করেও সময় ধরা হয় সেক্ষেত্রে কমপক্ষে তিনমাস সময়ের প্রয়োজন।

কেননা চট্টগ্রামের বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমাদের সময় দেয়া না হলে সম্মেলনের যে প্রস্তুতি সেটি নেওয়া সম্ভব নয়। তবে কিছু সংখ্যক নেতা আছে যারা কেন্দ্রকে তুষ্ঠ করে মহানগরের নেতৃত্ব দিতে চাই। শুধুমাত্র তারাই মনে করছে দ্রুত কমিটি গঠন করে সম্মেলন করা যাবে।

চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের আহবায়ক কমিটির যুগ্ম আহবায়ক মাহবুবুল হক সুমন বাংলাদেশ মেইলকে বলেন, তিনিও সম্মেলনের পক্ষে। তবে নগর যুবলীগে বিদ্যমান কিছু সমস্যা আছে, সেগুলো যতদ্রুত নিরসন করা সম্ভব হবে তত দ্রুত সম্মেলন আয়োজন সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে সহযোগীতা করতে হবে। চিঠি দিয়ে এসব বিষয় কেন্দ্রকে অবহিত করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের আহবায়ক কমিটির যুগ্ম আহবায়ক মাহবুবুল হক সুমন

তিনি বলেন, কেন্দ্রের নির্দেশনা মতে শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিনসহ চট্টগ্রাম মহানগরের সিনিয়র নের্তৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করে খুব দ্রুত সমন্বয় করা সম্ভব।

 

মাহবুবুল হক সুমন বলেন, শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল’র কাছ থেকে জেনেছি নগর যুবলীগের সম্মেলনের লক্ষ্যে কমিটি গঠনের জন্য কেন্দ্র থেকে যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চু ভাইকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

তিনি আশা করেন, আলতাফ হোসেন বাচ্চু চট্টগ্রামের রাজনীতির জন্য অতন্ত যোগ্য ব্যক্তি। উনি সম্মেলন করতে সঠিক একটি নির্দেশনা দেবেন। উনার নির্দেশনায় চট্টগ্রাম যুবলীগের রাজনীতি এগিয়ে যাবে।

 

মহানগর যুবলীগের আহবায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু বাংলাদেশ মেইলকে জানান, পূর্ণাঙ্গ কমিটির ব্যাপারে এখনো সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাইনি। তবে সম্মেলনটা হওয়া প্রয়োজন এবং তা যত দ্রুত সম্ভব। এ ক্ষেত্রে যে পদ্ধতিগুলোতে খুব সহজ ও সুন্দর হয় সেটায় খুঁজে বের করা দরকার।

তবে আগামী এক মাসের মধ্যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার যে নির্দেশনা আমরা তা মিডিয়ার মাধ্যমে জানতে পেরেছি সাংগঠনিকভাবে এখনো কারো সাথেই এ ব্যাপারে আলোচনা হয়নি বলে জানান।

  চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের আহবায়ক মহিউদ্দিন বাচ্চু

বলেন, আমরা যেহেতু সম্মেলনমুখী সেক্ষেত্রে আমার যে কোন নির্দেশনার জন্য প্রস্তুত আছি। ইতিমধ্যে আমরা কার্যক্রমও অনেকটা শুরু করে দিয়েছি।

কিন্তু সময় বেঁধে দিলে সে সময়ের সাথে সাথে একটি গাইডলাইনও কেন্দ্র থেকে ঠিক করে দিয়েছে এমনটি প্রত্যাশা করেন নগর যুবলীগের এ নেতা।

 

তিনি বলেন, কেন্দ্র থেকে যে নির্দেশনাটি দিয়েছে সেখানে নিশ্চয় একটি গাইড লাইন দেয়া হয়েছে। সেটি যদি আমাদের হাতে আসে বা আলোচনা হয় তখনই বলতে পারবো অক্টোবরে সম্মেলন সম্ভব নাকি সম্ভব না।

এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে আওয়ামী যুব লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চুর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বাংলাদেশ মেইলকে বলেন, নগর ও উত্তর জেলায় তৃণমূল পর্যায়ে যুবলীগের কমিটি গঠনের জন্য আমি কেন্দ্র থেকে মৌখিক ভাবে জেনেছি তবে এখনো চিঠি পাইনি।

চিঠি পেলে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী সমন্বয় করবো।

আওয়ামী যুব লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী বাচ্চু

তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্মেলন করা যায় সেজন্য আমি সে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সকল নেতাকর্মীদের নিয়ে সমন্বয় করবো।

আমাকে কেন্দ্র থেকে সমন্বয় করার দায়িত্ব মৌখিকভাবে দিয়েছে। সেক্ষেত্রে কমিটি গঠন নিয়ে কোন উদ্ধুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তখন বিষয়টা কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে তুলে ধরবো। আমি সুপারিশ করবো কেন্দ্র থেকেই যেন পরবর্তী নির্দেশনা দেন।

                                আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মাহমুদুল হক

আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ মাহমুদুল হকও জানিয়েছেন, দায়িত্বের বিষয়ে তিনি এখনো চিঠি পাননি। তবে দায়িত্ব দিলে তা যথাযথভাবে পালন করবেন।

যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী বাংলাদেশ মেইলকে বলেন, চট্টগ্রাম মহানগর এবং জেলার তৃণমুল কমিটিগুলোর জন্য দীর্ঘদিন ধরে নেতাকর্মীদের তালিকা তৈরি হয়ে আসছে। এখন এটি সম্পূর্ণ তৈরি। বর্তমানে তা শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার অপেক্ষায় রয়েছে। সুতরাং যে সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে তার মধ্যে কমিটি গঠন করে সম্মেলন আয়োজন সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

এক্ষত্রে স্থানীয় এমপি এবং সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের সাথে সমন্বয় করে অক্টোবরে সম্মেলন আয়োজনের লক্ষ্যে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব ওয়ার্ড কমিটি গঠন করে কাউন্সিলরের তালিকা জমা দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরের জন্য আওয়ামী যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আলতাফ হোসেন বাচ্চু এবং সৈয়দ মাহমুদুল হককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

এদিকে এরই মধ্যে চট্টগ্রামে যুবলীগের পদ প্রত্যাশীদের আগ্রহের শেষ নেই। বিশেষ করে ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা এই কমিটি কখন হবে, কিভাবে হবে তা নিয়ে খোঁজ-খবর রাখছেন। গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে দৌড়ঝাঁপ করছেন অনেকেই। তারা প্রত্যেকেই গতিশীল নেতৃত্ব দিয়ে আওয়ামী যুবলীগকে শক্তিশালী সংগঠন করার প্রয়াসে নিজেদের নিবেদিত রাখতে বদ্ধপরিকর।

উল্লেখ্য : বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর প্রতিষ্ঠা করা হয়। সংক্ষেপে যুবলীগ নামেই সংগঠনটি পরিচিত। এটি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের যুব অঙ্গসংগঠন। এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি। বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামে যুবলীগের নেতাকর্মীদের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গণতন্ত্র পুণররুদ্ধারের আন্দোলনে শহীদ হওয়া নূর হোসেন ছিলেন যুবলীগেরই সক্রিয় কর্মী।

১৯৮৯-৯০ সালে চট্টগ্রাম নগর যুবলীগের ৬৭ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়েছিল, ওই কমিটির সভাপতি ছিলেন নোমান আল-মাহমুদ ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শফিকুল হাসান। এরপর ২০০৩ সালের জুলাই মাসে মহানগর যুবলীগের সর্বশেষ সম্মেলন হয়। চন্দন ধরকে সভাপতি ও মশিউর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে ১০১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। সর্বশেষ ২০১৩ সালের জুলাইয়ে মহিউদ্দিন বাচ্চুকে আহবায়ক করে ৩ মাসের জন্য ১০১ সদস্যের আহবায়ক কমিটি গঠিত হয়। এ কমিটিও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করতে পারেনি।

বিএম/রাজীব সেন প্রিন্স