মানসম্পন্ন খাদ্য তৈরিতে মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন-মেয়র

চট্টগ্রাম মেইল : হোটেল-রেস্তোরাঁ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা ও মানসম্পন্ন নিরাপদ খাদ্য তৈরির জন্য মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।
রবিবার সকালে চট্টগ্রামের জামালখানের একটি কনভেনশন সেন্টারে নগরের হোটেল মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

সিটি মেয়র আরো বলেন, নগরীর ফুটপাতে কোন ধরনের খাওয়ার বিক্রয় করা যাবে না। এই খাবার গুলো নিরাপদ নয়। আমরা চাই আমাদের শহরে বিশুদ্ধ খাবার প্রস্তুত এবং বিক্রি হয়। এ লক্ষ্যে যত রকম উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন তার জন্য চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কাজ করে যাবে।

তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। মেয়র জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। নগরবাসী ও মেয়রের প্রত্যাশা অঙ্গাঙ্গীকভাবে জড়িত। হোটেল রেস্তোরায় জরিমানা করা সিটি কর্পোরেশনের মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। সিটি কর্পোরেশনের মুখ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে নগরীতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, সরকার জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন করে থাকে। এ আইন পরিবর্তনের কোনো সুযোগ সিটি কর্পোরেশনের নেই। আমরা চাই আপনারা সরকার প্রনিত আইন মেনে চলুন। যে কোন ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে সরকারি নিয়ম নীতি কিংবা আইন জানতে হবে। আইন না জানার অজুহাত কোনভাবে কাম্য নয়। এ মানসিকতা থেকে সংশ্লিষ্টদের বেরিয়ে আসতে হবে।

মেয়র বলেন, প্রতিটি রেস্তোরায় একজন ম্যানেজার থাকে। এই ম্যানেজারকে সচেতন করতে হবে মালিককে। এ প্রসঙ্গে ভোক্তার নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে নগরীর হোটেল ও রেস্টুরেন্ট ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১৯টি করণীয়াদি আরোপ করেছেন সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন।

এ শর্তগুলো বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে হোটেল রেস্তোরা বরাবরে ফেষ্টুন পদান করা হবে। ফেষ্টুনে রয়েছে অননুমোদিত রং, ফ্লেভার, কৃত্রিম রং মিশ্রিত মটর, কেমিক্যাল, ছাপা সংবাদপত্রের কাগজ ব্যবহার করে খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবেশন ও সরবরাহ, রেফ্রিজারেটরে কাঁচা মাছ-মাংসের সাথে সবজি, অর্ধ-রান্না খাবার, রান্না বা খাবার খোলা অবস্থায় সংরক্ষণ, জমানো পানিতে তৈজসপত্র ধৌত করা, নোংরা-ময়লা পাত্র/ তৈজসপত্র ব্যবহার হতে বিরত থাকুন এবং খাদ্যদ্রব্য পরিবেশনকারী গ্লাভস, এপ্রন, হেডক্যাপ ব্যবহার করবেন, খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনকারী এপ্রন অথবা ফুলহাতা জামা পরিধান করবেন, বাসি খাবার পরিবেশন, খাদ্যদ্রব্য উৎপাদনে পোড়াতেল, মানহীন তেল, লবণ, চিনি ব্যবহার, মেয়াদ উত্তীর্ণ খাদ্যদ্রব্য বিক্রয়, প্রদর্শন ও সংরক্ষণ, মেয়াদ উত্তীর্ণ উপকরণ ব্যবহার করে খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন হতে বিরত থাকুন।

এছাড়া খাদ্যদ্রব্য বিক্রয়কালে মোড়ক/পাত্র/ঠোঙ্গার ওজন বাদ দিন, খাদ্যদ্রব্য বিক্রয়কালে বিক্রয় রশিদ প্রদান করুন, দর্শনীয় প্রকাশ্য স্থানে খাদ্যদ্রব্যের হালনাগাদ মূল্য-তালিকা প্রদর্শন করুন, যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি/লাইসেন্স গ্রহণ পূর্বক ব্যবসা পরিচালনা করুন, হোটেল, রান্নাঘর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন। যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে রাখুন, হোটেল রেস্তোরায় প্রবেশ পথে তামাকজাত পণ্যের বিক্রয় ও প্রদর্শনী বন্ধ রাখুন, ভোক্তার সাথে সংযত আচরণের কথা অনুষ্ঠানে পাঠ করে শুনান সিটি মেয়র। আমরা যে ফেষ্টুন দিচ্ছি তা ক্যাশে কাউন্টারের পেছনে বা পাশে তা টাঙ্গিয়ে দিবেন। এতে জনসচেতনতা সৃষ্টি হবে। উল্লেখিত নির্দেশনা নগরীর হোটেল রেস্তোরা মালিককে অবশ্যই বাস্তবায়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, নিরাপত্তার জন্য গরিব মানুষও এখন নিরাপদ পানি কিনে খাচ্ছে। পচা, বাসি, মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার নিজে খাবেন না, ভোক্তাদের কেন খাওয়াবেন ? কর্মচারীরা যাতে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে সেদিকে লক্ষ্য রাখার পরামর্শ দেন মেয়র। তিনি বলেন, নগরীর হোটেল মালিক সমিতির ছাড়পত্র ছাড়া চসিকের ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হবে না। আমরা চাই সকলের মধ্যে দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হোক। এ প্রসঙ্গে তিনি প্রেস মালিক সমিতির কথা সভায় উল্লেখ করেন।

মেয়র বলেন, আপনি নগরীর একটি রেস্তোরাঁ মালিক হলেও অন্য জায়গায় আপনার পরিচয় একজন ভোক্তা। নগরীর সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ১০০ গজের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রির নিষিদ্ধ করণের কথা উল্লেখ করে মেয়র বলেন, আমরা তামাকমুক্ত নগরীর গড়তে চাই। এই তামাক দ্রব্য সেবন করতে করতে একদিন তামাক সেবনকারী মাদকাসক্ত হয়ে পরে। এ থেকে নগরীকে মুক্ত রাখতে নগরীতে কোনো প্রকার তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রয়, বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা না হয়, সে ব্যাপারে হোটেল মালিকদের সহযোগিতা কামনা করেন মেয়র।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আফিয়া আখতার বলেন, জনগণের স্বার্থে আইন তৈরি ও প্রয়োগ হয়। আইন জানতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে অপরাধ সংঘটিত হলে এবং অপরাধী অপরাধ স্বীকার করলে জরিমানা বা শাস্তি দেওয়া হয়। জরিমানার টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে চলে যায়। সচেতন করার জন্যই জরিমানা করা হয়।

হোটেল মালিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনার বাসার রান্নাঘরের পরিবেশ ও হোটেলের রান্নাঘরের পরিবেশ দেখুন। সুপারভিশন করুন। পরিষ্কার রাখুন। আপনারা সচেতন হলে আমরা আপনাদেরকে ধন্যবাদ জানাব।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. হাসানুজ্জামান বলেন, আমরা কেউ কারো প্রতিপক্ষ নই। দই তৈরি করতে হলে বিএসটিআই’র লাইসেন্স নিতে হবে। মোড়কের গায়ে উৎপাদন, মেয়াদ, খুচরা মূল্য থাকা বাঞ্চনীয়। বিদেশি পণ্যের মোড়কে আমদানিকারকের নাম, বাংলাদেশি টাকায় মূল্য ইত্যাদি থাকা বাধ্যবাদকতা রয়েছে।

হোটেল রেস্তোরা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবদুল হান্নান বাবু চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রদত্ত ফেষ্টুনের সিদ্ধান্ত কার্যকরে একবছর সময় চেয়েছেন। এ সময়ের পরই তারা হোটেল রেস্তোরায় চসিকের মোবাইল কোর্ট পরিচালনার অনুরোধ জানান। তবে হোটেল রেস্তোরা মালিকদের আবেদনকৃত সময়ের বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারনে মত প্রকাশ করেন মেয়র।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সামশুদ্দোহার সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক মো. হাসানুজ্জামান, কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন, সিটি কর্পোরেশনের মডার্ন খাদ্য পরীক্ষাগারের মাইক্রো বায়োলজিস্ট আশীষ কুমার দাশ, স্বাস্থ্য পরিদর্শক ইয়াসিনুল হক চৌধুরী, হোটেল মালিক সমিতির প্রধান উপদেষ্টা দিদারুল আলম ও সভাপতি ইলিয়াস আহমেদ ভূঁইয়া।

এতে আরো উপস্থিত ছিলেন চসিকের কাউন্সিলর, সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ক্যাবের কর্মকর্তা, হোটেল রেস্তোরা মালিক সমিতির কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ। বক্তারা বলেন, মানসম্মত খাবার নিশ্চিতে সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং যার যার অবস্থান থেকে একযোগে কাজ করতে হবে।

বিএম/আরএসপি..