খাগড়াছড়িতে এবিপিএনের প্রকল্পে দূর্নীতি, প্রতিটি ঢেউ টিন ১ লক্ষ টাকা

শাহাদাত শাওন : রূপপুর বালিশকান্ড, এরপর ফরিদপুর মেডিকেলে পর্দা কেনায় পুকুরচুরি, এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে ঢেউ টিনের দূর্নীতি। এবারের অভিযোগ পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে।

একটি সংস্কার প্রকল্পে প্রতিটি ঢেউ টিন শিটের দাম দেখানো হয়েছে ১ লাখ টাকা। যা বর্তমান বাজারমূল্যের চেয়ে অন্তত ১০০ গুণ বেশি। এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল টিন শীট হিসেবে বললেও বেশি বলা হবে না ।

সশস্ত্র পুলিশ ব্যাটালিয়ন-৬ এর (এপিবিএন -৬) ১০টি সংস্কার প্রকল্পের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মিশু এন্টারপ্রাইজ মাত্র দুটি টিন শীট বান্ডিলের জন্য ১৪ লক্ষ টাকা ব্যয় দেখিয়েছেন। এছাড়াও, সশস্ত্র পুলিশ ব্যাটালিয়ন -৬ এর (এপিবিএন -৬) ১০টি সংস্কার প্রকল্পের মোট তহবিল প্রত্যাহার করে। পুরো প্রকল্পের কাজ ২০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল।

দূর্নীতির এমন অভিযোগ উঠেছে এপিবিএন-৬ ব্যাটালিয়নের প্রাক্তন কমান্ডার ও বর্তমানে পুলিশ সুপার (এসপি) মাহবুব হাসানের বিরুদ্ধে।

অভিযোগ অস্বীকার করে মাহবুব হাসান বলেন, এর জন্য দায়ী ডেপুটি কমান্ডার মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদ। যিনি ১০ টি সংস্কার প্রকল্পের অনিয়মের বিষয়ে একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন।

সূত্র জানায়, প্রকল্পের কাজের মধ্যে রয়েছে মেরামত ও ওভারহোলিং এবং দুটি মডিউল তাঁবু স্থাপন। খাগড়াছড়ির মহালচোরিতে দায়িত্বে থাকাকালীন মাহবুব ৭১ লক্ষ টাকার একটি ওয়ার্ক অর্ডার দিয়েছিলেন। চার মাসে ওয়ার্ক অর্ডারের মাত্র ১৫ শতাংশ কাজ শেষ করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।

প্রকল্পের কাজ শুরুর তিন মাস পরে, কাজ শেষ না করেই মোট প্রকল্প বিল ছাড় করে এপিবিএন-৬ উপ-কমান্ডার এবং কমিটির সদস্য সচিব শাহনেওয়াজ খালেদ।

পুলিশ সদর দফতর ১মার্চ, ২০১৮ এ সাতটি মেরামত বা সংস্কার কাজের জন্য ৪৬ লাখ টাকার কাজের আদেশ দেয়। আদেশে ১১.৫ লক্ষ টাকা মূল্যের দুটি মডিউল তাঁবু সংগ্রহ ও ১৪ লক্ষ টাকার ড্রেন নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এতে এপিবিএন-৬ এর সহকারী কমান্ডারের বাংলো, রেশন স্টোর মেরামত বা সংস্কার. এই বাহিনীর দুটি আধা-পাকা ফোর্স ব্যারাক, পরিদর্শক কোয়ার্টার এবং একটি ১৫ শয্যা বিশিষ্ট একটি আধা-পাকা হাসপাতালও ছিল।

জানা যায়, সাতটি মেরামত বা সংস্কার প্রকল্পের একটিও সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি । ফোর্স ব্যারাকের জন্য ১৪ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হলেও ঠিকাদারি সংস্থা তা মাত্র দুটি টিন-শীট বান্ডিল ব্যবহার করে সংস্কার শেষ করে। এছাড়া দুটি মডিউল তাঁবুর জন্য ১১ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

ডেপুটি কমান্ডারের বাংলোয় পুলিশ সদর দফতর এয়ার কন্ডিশনার (এসি) প্রেরণ করেছিল। ওয়্যারিং এবং টেকনিশিয়ান ব্যয় বাঁচাতে, দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ এসি ইনস্টল করেনি। এসিগুলি ফোর্স ব্যারাক স্টোররুমে থেকে যায়।  ২৪ ইঞ্চি ড্রেন নির্মাণের জন্য ১৪ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। তবে মাত্র ৬ ইঞ্চি ড্রেন তৈরি করা হয়েছিল।

মাহবুব বলেন, প্রকল্পটি শুরু করার ২২ দিন পরে ১০০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। এপিবিএন হিসাবরক্ষক রতন ৪৬ লক্ষ টাকা ছাড় করে মিশু এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. জসিম ও মাহবুবকে দিয়েছিল। তখন দু’জনেই একই ঘরে ছিলেন। প্রকল্পের তহবিলের বাকি অংশগুলির বিলও পরে ছাড় করা হয়েছিল।

চার মাস পর, প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, কেবল ১৫ শতাংশ কাজ করা হয়েছিল। পরের মাসে, আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ২৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। সংস্কার প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব শাহনেওয়াজ ১০ ডিসেম্বর অনুসন্ধানে সংস্কার কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির কথা উল্লেখ করে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। তিনি এই অনিয়মের ভিডিও এবং ছবি সংযুক্ত করেছেন তখন মনিটরিং কমিটি গঠনকে সমর্থন করে মাহবুব অন্য একজনকে সদস্য সচিব করেন। এরপরে, পুলিশ সদর দফতর প্রকল্পের দুর্নীতি ও অনিয়মের তদন্ত শুরু করে।

প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার জসিম বলেছিলেন,”আমি যেমন নির্দেশ পেয়েছি তেমনই কাজ করেছি।” সে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার জন্যও অনুরোধ করেছেন প্রতিবেদককে।

শাহনেওয়াজ তার প্রতিবেদনে মিশু এন্টারপ্রাইজের অনিয়ম নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন এবং এটিকে কালো তালিকাভুক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এপিবিএন-এর বর্তমান কমান্ডার আবদুর রহিম এই বছরও এই সংস্থাটিকে কালো তালিকাভুক্ত করেনি।

আব্দুর রহিম বলেন,”শাহনেওয়াজ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ দাবি করে, তারা দিতে অসম্মতি দেখালে তিনি অভিযোগ করেছেন। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।

মাহবুব জানান,অভিযোগ করার পরে পুলিশ সদর দফতরের একটি টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি শাহনেওয়াজকে জিজ্ঞাসাবাদ করার অনুরোধও জানান। পুলিশ সদর দফতরে যোগাযোগ করা হলে, সদর দফতরেরর কোন কর্মকর্তা এসব অভিযোগ সম্পর্কে কোনও মন্তব্য করেন নি।