অসচেতনতায় বাড়ছে বায়ু দূষণ : পদক্ষেপ জরুরি-নুর মোহাম্মদ রানা

    বিএম বিশেষ কলাম : আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র প্রধান অনুষঙ্গ হলো বায়ু বা বাতাস। এই বায়ু বা বাতাস ছাড়া প্রাণী জগৎ এক মুহুর্তও বাঁচতে পারে না। জীবন ধারণের অপরিহার্য উপাদান এই বায়ুকে দূষণ করছি আমরা নিজেরাই। যার ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। মানুষ ভোট লালসা চরিতার্থ করার জন্য বিচার বিবেচনাহীনভাবে দূষিত করছে জীবনের অপরিহার্য উপাদান বাতাসকে।

    মারাত্মক বায়ু দূষণ নিয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা আজ উদ্ধিগ্ন। এই থেকে মুক্তি নিয়ে চলছে নানা গবেষণা। প্রাকৃতিকভাবে অথবা মানুষের কর্মকান্ডের ফলে সৃষ্ট ক্ষতিকর ও বিষাক্ত পদার্থের দ্বারা বায়ূমণ্ডলের দূষণ হয়। বায়ুদূষণ পূর্ণ কোন একটি এলাকায় বায়ুতে অবমুক্ত ক্ষতিকর পদার্থ সমুহের পরিমান অন্যান্য স্থানের তুলনায় অধিকতর হওয়ায় সহজেই দূষণের ক্ষতিকর প্রভাব সমূহ শনাক্ত করা যায়। বায়ূ দূষণের প্রধান উৎস সমূহ হচ্ছে গাড়ি থেকে নির্গত ধোয়া।

    বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপাদনকারী যন্ত্র থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া, শিল্প কারখানা এবং কঠিন বর্জ্য পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট ধোঁয়া। সাম্প্রতিককালে বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতো এশিয়াতেও পরিবেশগত ইস্যুগুলির মধ্যে বায়ুদূষণে অধিকতর প্রাধান্য লাভ করেছে। এর মূল কারণ অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়ন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শহর এলাকায় অনেক সময় এমন সব শিলা ও মৃত্তিকার উপর বাড়িঘর নির্মাণ করা হয় যাদের ভিত্তি থেকে তেজস্ক্রিয়া গ্যাস অবতীর্ণ হয়।

    বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের মতো ভয়ঙ্কর গ্রিনহাউজ গ্যাসের উপস্থিতি বেড়েই চলেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বায়ু দূষণে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। আর নয়াদিল্লী সবচেয়ে বেশি দূষিত শহর। দ্বিতীয় কায়রো। তারপরেই ঢাকার অবস্থান। চতুর্থ অবস্থানে মুম্বাই। বিশ্বে প্রতিবছর ৭০ লাখ মানুষ বায়ু দূষণের শিকার হয়ে মারা যায়। বায়ু দূষণ নীরব ঘাতক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। এটা এখন একটা চ্যালেঞ্জ। যা সবাইকে একযোগে মোকাবেলা করতে হবে। বায়ু দূষণ ঠেকাতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যেতে হবে।

    বায়ু এখন অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর মানে অবস্থান করছে। অথচ পরিবেশ রক্ষায় যে কাজ হচ্ছে সেখানে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিবেশবাদীদের সমন্বয় নেই। সমন্বয় নেই সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের। এই সমন্বয়হীনতার সংস্কৃতির কারণে পরিবেশ সুরক্ষায় গতিশীলতা আসছে না। বায়ু দূষণকে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, গ্যাস কোম্পানিগুলো, বিদ্যুৎ বিভাগ, বিআরটিএ এবং পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।

    পরিবেশের উপর নেমে আসা বিপর্যয় নিয়ে আজ বিশ্বের মত বাংলাদেশও উদ্বিগ্ন। কারণ আজ মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার কারণে মানুষ বায়ু দূষণের শিকার হচ্ছে। যারা পথে-ঘাটে চলাচল করেন, বাসে-টেম্পোতে চলেন তারা সবাই বায়ু দূষণ দ্বারা আক্রান্ত। উন্নত বিশ্ব বায়ুকে দূষণমুক্ত রাখতে কী কী পদ্ধতি ব্যবহার করছে, সেসব যেমন আমাদের ব্যবহার করতে হবে, একইসঙ্গে মানুষকেও এ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। বায়ুকে নির্মল করে তুলতে হলে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সরকারকে যেমন আরো দায়িত্বশীল হতে হবে তেমনি পরিবেশ রক্ষায় যারা নিয়োজিত তাদের দায়িত্ব পালনের কোন বিকল্প নেই। দেশের শহরগুলোতে বায়ু দূষণের জন্য মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বছরে চারমাস। শীতকালীন মৌসুমে

    বর্ষাকালে বায়ু দূষণ থাকে না। শীতকালে বায়ু দূষণের মূল কারণ ক্ষুদ্র বস্তুকণা। গ্যাসের দূষণ বাংলাদেশে এখনও প্রকট আকার নেয়নি। বায়ু দূষণকে ভাল পর্যায়ে রাখতে হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। আর শহরের বাইরে বায়ু দূষণ করে মূলত ইটভাটা। পুরাতন পদ্ধতির ইটভাটার কারণে ৫৮ ভাগ বায়ু দূষণ হয়। এরপরেই রয়েছে পুরনো গাড়ি। এরা ২০ ভাগ দূষণ করে। আমাদের বাড়ি নির্মাণ কাজে দূষণ হয় ২০ ভাগ। আর শিল্প-কারখানা থেকে আসে ১০ ভাগ দূষণ।

    বাড়ি নির্মাণ ও অন্যান্য কনস্ট্রাকশন কাজ বায়ু দূষণের একটি বড় কারণ। এই নির্মাণ সামগ্রী কিভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এসবের গাইডলাইন থাকা জরুরি। আর তা নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের তদারকিও জরুরি। সমীক্ষায় দেখা গেছেবাতাসের সীসার পরিমাণও বায়ু দূষণের বড় কারণ। ব্যাটারি শিল্প বাতাসে সীসার পরিমাণ বাড়াচ্ছে। আমরা ইটভাটা নিয়ে সোচ্চার হচ্ছি, কিন্তু ব্যাটারি শিল্প থেকে সীসার পরিমাণ যে বাড়ছে তা অতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বর্জ্যগুলোকে আগুন দিয়ে পোড়ানোর চল রয়েছে আমাদের দেশে। কিন্তু এসব পুড়িয়ে আমরা অসংখ্য ধূলিকণা বাতাসে ছড়িয়ে দিচ্ছি। তাই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে হবে।

    বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ তার একটি বাংলাদেশ। বাংলাদেশে প্রতিবছরে যতো মানুষের মৃত্যু হয় তার ২৮ শতাংশই মারা যায় পরিবেশ দূষণ জনিত অসুখ-বিসুখের কারণে। কিন্তু সারা বিশ্বে এধরণের মৃত্যুর গড় মাত্র ১৬ শতাংশ।

    আমাদের প্রথম প্রচেষ্টা হবে দূষণ রোধ করা আর এই বায়ু দূষণ রোধে নিজেরা যদি সচেতন না হই তাহলে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটবে এই ক্ষেত্রে ব্যাক্তিগত ভূমিকা ও জনসচেতনতা সৃষ্টি করা দরকার। যেমন- (১) যত্রতত্র বর্জ্য বা আবর্জনা না ফেলে পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা, (২) পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ব্যবহারে যতসম্ভব সাশ্রয়ী হওয়া এবং খাদ্য দ্রব্য সহ সব ধরনের সম্পদের অপচয় কমানো, (৩) সব ধরনের বিলাসিতা বর্জনের চেষ্টা।

    ক্ষতিকর সিনতেটিক বর্জ্য পলিথিন প্লাস্টিক জাতীয় দ্রব্য যেগুলি হয় না হয় বা পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে সেগুলোর ব্যবহার রোধ করা, (৪) নবায়নযোগ্য জ্বালানী শক্তির ব্যবহার করতে হবে। কাঠ, কয়লা, তেল ইত্যাদি জ্বালানী যেগুলো পরিবেশ দূষণ ঘটায় সেগুলো যথা সম্ভব কম ব্যবহার করা, (৫) শিল্প বিপ্লবের নামে অপরিকল্পিত শিল্পায়ন বন্ধ করে পরিবেশ বান্ধব শিল্প প্রতিষ্ঠা করা। যদি আমরা সচেতন না হই আর ভয়াবহ বায়ু দূষণ ঘটে তাহলে এই পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হবে এবং যা মানব সভ্যতার জন্য হবে হুমকি স্বরূপ।

    লেখক: প্রবন্ধিক ও কলামিষ্ট