পরিবেশ দুষণের ৮ কারণ চিহ্নিত : বন্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতি সুজনের আহবান

    ????????????????????????????????????

    রাজীব সেন প্রিন্স : চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাত্রাতিরিক্ত পরিবেশ দুষণের ৮টি কারণ চিহ্নিত করে দুষণ রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে বিশেষ আহবান জানিয়েছেন নাগরিক উদ্যোগের প্রধান উপদেষ্টা ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি খোরশেদ আলম সুজন।

    জনদূর্ভোগ লাঘবে পরিত্রানের লক্ষ্যে কর্মপন্থা নির্ধারনের জন্য তিনি আজ বুধবার সকাল ১১টায় পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগর এর পরিচালক মো. আজাদুর রহমান মল্লিকের সাথে বিশেষ সাক্ষাতে মিলিত হন।

    পরিবেশ অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আনুষ্ঠানিক মতবিনিময় সভায় নাগরিক উদ্যোগের প্রধান উপদেষ্টা খোরশেদ আলম সুজন দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী চট্টগ্রামের মাত্রাতিরিক্ত পরিবেশ দূষণে গভীর উদ্বেগ ও শংকা প্রকাশ করে বলেন, পাহাড়, টিলা, নদ নদী আর সাগরের মনোরম সৌন্দর্যে পরিপূর্ণ এই চট্টগ্রাম শহর। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন ‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ, সেই পাহাড়ের ঝর্ণায় আমি উদাস হয়ে রই’ কিন্তু বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই আকাশে হেলান দেওয়া পাহাড় কি আর আছে?

    পাহাড় খেকো ব্যাক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের হিংস্র শাবলের আঘাতে পাহাড়ের বুক আজ ছিন্নভিন্ন। পাহাড়ের করুণ কান্না শোনার মতো কেউ আজ নেই। এ অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই চট্টগ্রাম শহর পাহাড়শুন্য নগরীতে পরিণত হবে। তাছাড়া নগরীতে প্রতিদিনই বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন ব্যাক্তি এবং প্রতিষ্ঠান কতৃক মাত্রাতিরিক্তভাবে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে।

    নাগরিক উদ্যোগের পক্ষ থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পরিবেশ দূষণের ৮টি কারণ তুলে ধরে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালকের হাতে একটি লিখিত পত্র পেশ করেন।

    খোরশেদ আলম সুজন

    কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে (১) চট্টগ্রামের পাহাড় ও টিলাগুলো অর্থলিপ্স পাহাড় খেকোদের হাত থেকে রক্ষা করে সংরক্ষণ করতে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। (২) নগরীর বিভিন্ন এলাকায় সংরক্ষিত দিঘী ও পুকুরগুলো কতিপয় কুচক্রি মহলের হাত থেকে রক্ষা করে ফায়ার সার্ভিস এবং সিভিল ডিফেন্সসহ অগ্নি নির্বাপনের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে অগ্নি নির্বাপনের সুযোগ করে দেয়া। (৩) নগরীর ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও কলকারখানার কালো ধোঁয়া রোধ করতে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দ্যেগ নিয়ে নগরবাসীকে দুষিত বাতাসের কবল থেকে রক্ষা করা।

    (৪) নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে যানবাহনের হাইড্রলিক হর্ন, যত্রতত্র মাইকের ব্যবহার, কারখানার উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন শব্দ দূষণ বন্ধ করা। (৫) বাংলাদেশের অর্থনীতির নির্ভরযোগ্য অংশীদার পাট ও পাটজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিশ্চিত করতে নগরজুড়ে যত্রতত্র প্লাষ্টিকজাত দ্রব্য চিরতরে ব্যবহার নিষিদ্ধে উদ্দ্যেগ গ্রহণ করে থাইরয়েড, হরমোনের অতিরিক্ত ক্ষরণ, কিডনি রোগ, চর্মরোগসহ নানান রোগ থেকে জনগণকে মুক্ত করা।

    (৬) হোটেল, রেস্টুরেন্ট, শিল্প কারখানা, মেডিকেল, ছাপাখানার রংসহ অপ্রয়োজনীয় বর্জ্যে এবং কসাইখানার রক্ত যততত্র না ফেলতে সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে নগরবাসীকে পানিবাহিত রোগ ও বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির হাত থেকে রক্ষা করা। (৭) নদী দূষণ রোধে শিল্প কারখানা ও ডকইয়ার্ডের বর্জ্য নদীতে না ফেলা, নদী পথে চলাচলকারী জাহাজ, লঞ্চ, স্টিমার, ট্রলারের কয়লা ও তেল, আরোহী কর্তৃক কঠিন বর্জ্য ও পয়ঃপ্রণালীর সুষ্ঠু ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দ্যেগ গ্রহণ ও কঠোর নজরদারির ব্যবস্থা করা। এবং (৮) উন্মুক্ত জায়গায় বিভিন্ন কয়লা এবং লোহাজাত পণ্যের গুদামজাত বন্ধ করা।

    পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মহানগর এর পরিচালক মো. আজাদুর রহমান মল্লিক সুজনের লিখিত পত্রে পরিবেশ দুষণের কারণগুলো চিহ্নিত করায় নাগরিক উদ্যোগের নেতৃবৃন্দকে ধন্যবাদ জানান।

    এসময় তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সত্যিকার ভাবেই পাহাড়, টিলা, নদী আর সাগরের সমন্বয়ে অপরূপ সৌন্দর্য মন্ডলিত একটি শহর। পরিবেশ দূষণের যে চিত্র আপনারা পেশ করেছেন তা আসলেই উদ্বেগের বিষয়। আমরাও সরেজমিনে বিভিন্ন সময় অভিযান পরিচালনা করে বিভিন্ন ব্যাক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ দূষণের বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছি।

    তিনি বলেন, আমরা নিয়মিতভাবে পাহাড় কাটা এবং পুকুর ভরাটের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান পরিচালনা করছি। হোটেল, রেষ্টুরেন্ট এবং মেডিকেলের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধেও আমাদের অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। তাছাড়া বড়ো বড়ো শিল্প প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে অপসারণের জন্য ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বেশীরভাগ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে ইটিপি স্থাপন করেছে।

    তাছাড়া পলিথিনের সংগ্রহ, বিক্রয় এবং বিপনণের বিরুদ্ধেও আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। তবে জনগন যদি ব্যাপকভাবে পলিথিনের বিরুদ্ধে সচেতন না হয় তাহলে পরিবেশ অধিদপ্তরের একার পক্ষে পলিথিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা সত্যিকার অর্থেই দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে। তিনি জনগনকে পলিথিন ব্যবহারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহবান জানান।

    এছাড়া নগরীর পাহাড়, টিলা কাটা, দিঘী কিংবা পুকুর ভরাটের তথ্যও যদি নগরবাসীর কাছে থেকে থাকে তাহলে তা পরিবেশ অধিদপ্তরে দিয়ে সহায়তা করার অনুরোধ জানান।

    তিনি বলেন, বর্তমানে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের লোকবল কিংবা নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট নেই। একজন অথবা দুইজন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট পেলে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকান্ডে আরো গতিশীলতা আসবে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

    সমাপনী বক্তব্যে নাগরিক উদ্যোগের প্রধান উপদেষ্ঠা সুজন আরো বলেন, দেশের আমদানি রপ্তানীর সিংহভাগই অর্জন হয় চট্টগ্রাম থেকে। মূলত চট্টগ্রাম হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক হৃদপিন্ড।

    চট্টগ্রাম বন্দর, কাস্টম, ইপিজেডসহ বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিনই ব্যবসা বানিজ্যের কারণে বিপুল সংখ্যক বিদেশীরা আসা যাওয়া করে। কিন্তু বর্তমানে চট্টগ্রামের বাতাসে বিপুল পরিমান ধুলি ময়লা এবং জীবানু উড়ছে। এতে করে ব্যবসা বানিজ্যের অন্যতম স্থান চট্টগ্রামের ব্যবসা বানিজ্যও ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পাড়ে বলে তিনি আশংকা প্রকাশ করেন।

    সুজন পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালককে সাধারণ জনগনের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগীতা করার আশ্বাস প্রদান করেন এবং এলাকায় এলাকায় পরিবেশ দূষণের কুফল সর্ম্পকে জনগনকে সচেতন করে তোলার জন্য সভা ও সমাবেশ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

    তিনি চট্টগ্রামের মতো একটি দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শহরে পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট না থাকাকে দুঃখজনক উল্লেখ করে অতিসত্বর দুইজন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট এবং পর্যাপ্ত লোকবল নিয়োগ দানের জন্য সরকার এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

    এ সময় অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রাজনীতিবিদ হাজী মো. ইলিয়াছ, এস.এম.আবু তাহের, নিজাম উদ্দিন, সংগঠনের সদস্য সচিব হাজী হোসেন কোম্পানী, মো. কামাল উদ্দিন, মো. এজাহারুল হক, মো. শাহজাহান, এএসএম জাহিদ হোসেন, জাহেদ আহমদ চৌধুরী, শেখ মামুনুর রশীদ, জাহাঙ্গীর আলম, আবুল হাসান সৈকত, সমীর মহাজন লিটন, সাইফুল্লাহ আনসারী, আবু তালেব, স্বরূপ দত্ত রাজু, মো. বেলাল, রকিবুল আলম সাজ্জী, তোফাজ্জল ওয়াসিম, ইদ্রিস আলম, মোঃ হুমায়ুন প্রমূখ।

    বিএম/রাজীব সেন প্রিন্স…