নুসরাতের পর এবার চট্টগ্রামের শাহিনুর!

কেরোসিনের-আগুনে-শাহিনুরের-মৃত্যু

বাংলাদেশ মেইল ডেস্ক : ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতের গায়ে আগুন দিয়ে সারাদেশ যখন তোলপার ঠিক এরমাঝেই কেরোসিন গায়ে ঢেলে আগুনে পুুুড়ে মৃত্যু হয়েছে চট্টগ্রামের মেয়ে শাহিনুর আক্তারের। মৃত্যুুর আগে শাহিনুর হত্যা চেষ্টার অভিযোগ তুুুলেছিল তার স্বামীর বিরুদ্ধে।

রোববার (২১ এপ্রিল) বিকেলে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চর ফলকন ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওর্য়াডের আইয়ুবনগর এলাকার একটি সয়াবিন ক্ষেতে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা চেষ্টার অভিযোগটি উঠে।

ঘটনার পর স্থানীয়রা শাহিনুরকে উদ্ধার করে লক্ষীপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তার অবস্থা আশংকাজনক দেখে রবিবার রাতেই ঢাকা মেডিকেলে প্রেরণ করে।

সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার সময় শাহিনুর ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধিন অবস্থায় মারা যায়। তার শরীরের ৪০/৪৫ শতাংশ আগুনে পুড়ে এবং শ্বাস নালীর অধিকাংশ পুড়ে যাওয়ায় তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি বললেন ঢামেক চিকিৎসক।

ঢামেক পুলিশ বক্সের ইনচার্জ মো. বাচ্চু মিয়া তথ্যটি নিশ্চিত করে বলেন, লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে নেওয়া হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

এদিকে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঘটনায় থানায় কোন মামলা দায়ের হয়নি জানিয়েছেন কমলনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইকবাল হোসেন। তবে এ ঘটনায় সালাহউদ্দিনের দুই ভাই আব্দুর রহমান বিশ্বাস ও আলাউদ্দিনকে আটক করেছে পুলিশ। অভিযুক্ত মুল আসামী স্বামী রিক্সাচালক সালাউদ্দিনকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

জানা যায়, চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার নতুনহাট বাজার গাজী গ্রামের জাফর আলমের মেয়ে শাহীনুর আক্তার। গত দুই বছর আগে মোবাইল ফোনের সুত্র ধরে প্রেম হয় লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের পাটারীরহাট এলাকার মোহর আলীর ছেলে সালাহউদ্দিনের সাথে। প্রথম স্ত্রীর কথা গোপন রেখে গত দেড় বছর আগে রিক্সাচালক সালাউদ্দিন বিয়ে করে চট্টগ্রামের শাহিনুরকে।

বিয়ের পর থেকে স্বামী মাঝে মাঝে রাউজানে তার শ্বশুড়ালয়ে আসা যাওয়া করলেও বিগত এক বছরের মধ্যে সে শাহিনুরকে তার বাড়িতে নিয়ে আত্মীয় স্বজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়নি। এতে সন্দেহ হয় শাহিনুরের।

তাই স্ত্রীর স্বীকৃতি আদায়ের জন্য মেয়েটি চট্টগ্রাম থেকে ছুটে গিয়েছিল লক্ষ্মীপুরে। স্বীকৃতি তো দূরের, উল্টো প্রতারক স্বামী তাদের বাড়ির পাশের একটি সয়াবিন ক্ষেতে মেয়েটিকে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়।

স্থানীয় ইউপি সদস্য হাফিজ উল্লাহ ও গ্রাম পুলিশ আবু তাহের ওই তরুণীকে উদ্ধার করে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন। সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মেয়েটি সংবাদকর্মীদের ঠিক এভাবেই বর্ণনা করলেও স্থানীয়রা বলছেন শাহিনুর নিজেই নিজের গায়ে আগুন লাগিয়েছেন।

এদিকে মেয়েটির অবস্থা আশংকাজনক দেখে সদর হাসপাতালের চিকিৎসকরা লক্ষ্মীপুরের পুলিশ সুপার আ স ম মাহাতাব উদ্দিনের হেফাজতে ওই তরুণীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে পাঠিয়ে দেন।

স্থানীয়রা জানান, সালাহ উদ্দিন চর ফলকন গ্রামের মহর আলীর ছেলে। তার বাড়ি নদীতে ভেঙে যাওয়ায় আইয়ুবনগর এলাকায় ঘর জামাই থাকেন। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। তিনি রিকশা চালক। এর মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে এক তরুনী এসে স্ত্রী দাবী করলেও সালাউদ্দিন স্বীকৃতি দেয়নি। মেয়েটি দুদিন স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছে ধর্না দিতে থাকে।

ইউপি সদস্য হাফিজ উল্যা বলেন, ‘স্ত্রীর স্বীকৃতি চাওয়া যুবতীর কাছে বিয়ের কাগজপত্র তলব করা হয়। এ সময় মেয়েটি তার সংগ্রহে কোনো কাগজপত্র নেই বলে জানান। এজন্য রোববার দুপুরে তাকে কাগজপত্র নিয়ে ফেরত আসার কথা বলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ফিরিয়ে দেওয়ার কিছু সময় পরেই অগ্নিদগ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই।

স্থানীয়দের বরাতে তিনি বলেন, বাজার থেকে ব্যাগে করে মেয়েটি নিজেই কেরোসিন নিয়ে সালাহ উদ্দিনের বাড়ির পাশের একটি সয়াবিন ক্ষেতে যায়। সেখানে নিজেই শরীরে আগুন দিলে স্থানীয় অন্য নারীরা ছুটে গিয়ে পানি দিয়ে আগুন নেভায়। সেখান থেকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে মেয়েটিকে লক্ষীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করেন।

লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা আনোয়ারুল হক বলেন, মেয়েটির শরীরের প্রায় ৪০/৪২ ভাগ পুড়ে গেছে। শ্বাসনালীতেও প্রদাহ হয়েছে। অবস্থা আশংকাজনক হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে পুলিশের দায়িত্বে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

লক্ষ্মীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সফিউজ্জামান ভূঁইয়াসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা অগ্নিদগ্ধ মেয়েটিকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান। সোমবার ভোরে ঢামেকে চিকিৎসাধিন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

কমলনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি/তদন্ত) আলমগীর হোসেন বলেন, ওই তরুণীর ব্যাগ থেকে কেরোসিনের গন্ধ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের কাছ থেকেও যা তথ্য পেয়েছি এবং মেয়েটির কতাবার্তায় ঘটনার মুল রহস্য লুকিয়ে আছে। অভিযুক্ত স্বামী বর্তমানে পলাতক রয়েছে জানিয়ে তাকে গ্রেফতার পরবর্তীতে ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পুলিশের তদন্ত চলছে জানান ওসি তদন্ত।

প্রসঙ্গত, এর আগে গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী সিনিয়র দাখিল মাদ্রাসার ছাত্রী আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেয় মুখোশধারী কয়েকজন তরুণ-তরুণী। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

বিএম/রাজীব সেন প্রিন্স…