‘আলোর নিলে কালোর গল্প’!

মো. সিফাত উল্লাহ (তুহিন) : গত কয়েক দশক যাবতই মালেয়েশিয়া বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য অন্যতম একটি কর্মক্ষেত্র। মালেয়েশিয়া সরকারের সূত্রমতে ২০ লাখ প্রবাসী-শ্রমিক এখানে কর্মরত। যদিও বাংলাদেশিদের সংখ্যা কত এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান কোথাও পাওয়া যায়নি। তবে সংখ্যাটা যে মোটেও কম হবেনা তা অনায়াসেই বলা যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অবৈধ প্রবাসী মালয়েশিয়ান শ্রমিক সংক্রান্ত কোনো না কোনো নিউজ প্রতিদিন-ই চোখের সামনে ভেসে আসে।

একজন প্রবাসী শ্রমিক যখন অবৈধ হয়ে যায় তার চেয়ে দুঃখের জীবন আর কারো হতে পারে না, সর্বদাতাকে পালিয়ে বেড়াতে হয় এখান থেকে ওখানে। এ যেন এক দুর্বিষহ জীবন। নুন্যতম সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন তারা। এমন কি প্রবাসে মৃত্যুবরণ করলেও সব রকম সাহায্য সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত হন। অনেক সময় পরিচয় সংকটে ভোগে মৃত লাশটিও। নুন্যতম মানবাধিকার এখানে নিভৃতে কাঁদে।

শুধু তাই নয় অবৈধ প্রবাসীদের দুঃখের কথা লিখতে গেলে হয়তো পৃষ্ঠা শেষ হবে, কলমের পর কলম শেষ হবে, তবু লিখে শেষ করা যাবে না। আমার আজকের লেখার উদ্দেশ্য দুঃখ-কষ্টের কথা বলা নয়, এতো কিছুর পরও কেন একজন প্রবাসী অবৈধ থাকেন সেই গল্প বলা-ই আমার আজকের উদ্দেশ্য। মালয়েশিয়ায় কর্মরত অবৈধ প্রবাসীদের সাথে কথা বলে বিভিন্ন কারন এবং অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি, সেখান থেকে কয়েকটি মুখ্য কারন তুলে ধরবো।

একজন বাংলাদেশী শ্রমিক যখন মালয়েশিয়া আসেন তার নুন্যতম খরচ হয় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা। ধরে নেওয়া যাক খরচ তিন লাখ টাকা, যা মালয়েশিয়ার কারেন্সিতে দাড়ায় প্রায় ১৫ হাজার রিঙ্গিত। অপর দিকেমালয়েশিয়ায় একজন বিদেশী শ্রমিকের প্রাথমিক মুজুরি এক হাজার থেকে ১২শ রিঙ্গিত।

মালয়েশিয়াতে নুন্যতম লিভিং কস্ট ৪০০-৫০০ রিঙ্গিত। তার মানে একজন শ্রমিকের মাসিক আয় ৭০০-৮০০ রিঙ্গিত এবং বছর শেষে তা আট থেকে নয় হাজার রিঙ্গিতে দাঁড়ায়। তাছাড়া এক বছর পর একজন শ্রমিকের ভিসা খরচ এজেন্ট ফি সহ সব মিলিয়ে পাঁচ-ছয় হাজার রিঙ্গিত। তাহলে একজন শ্রমিক ১২ মাস গাধার খাটুনি খেটে পকেটে থাকলো ৩-৪ হাজার রিঙ্গিত! কি, আশ্চর্য হয়েছেন? না, আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই এটাই সত্য। একজন বাংলাদেশী শ্রমিক তিন লক্ষ টাকা খরচ করে মালয়েশিয়ায় এসে এক বছর গাধার খাটুনি খেটে ইনকাম করেন ৬০-৮০ হাজার টাকা। আর যদি ভিসারি-নিউ না করেন তাহলে পুরো টাকাটা-ই তার পকেটে থাকে। এই ব্যাপারটাই প্রধানত একজন শ্রমিকের অবৈধ হওয়ার পিছনের উৎসাহ হিসেবে কাজ করে।

আমাদের মনে রাখা দরকার যে, বাংলাদেশ থেকে যে সকল শ্রমিক মালয়েশিয়ায় আসে তারা টাকা ইনকাম করার জন্যই আসে। বেশীর ভাগ সময়ই তারা ঋণ নিয়ে ধার-দেনা করে প্রবাসে পাড়ি জমায় একটু সুখের আসায়। তাদের জন্য জীবনের ঝুঁকির চেয়ে টাকাটা-ই মূল লক্ষ্য হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, অন্যতম কারন হচ্ছে মালয়েশিয়া পুলিশের দুর্নীতি পরায়নতা। বাংলাদেশী প্রবাসীদের কাছ থেকে মালয়েশিয়া পুলিশের উৎকোচ নেওয়া প্রায় স্বীকৃত পন্থাই বলা চলে। মাঝে মাঝে এমনও শোনা যায় যে “বাকিতে ঘুষ”নিয়ে থাকেন তারা। বাকিতে ঘুষ কিভাবে নেয় সেটা যদি কেউ বুজতে না পারেন তাহলে এই বিষয়ে অন্য একদিন কথা বলবো।

দেখা যাচ্ছে, যে সকল শ্রমিকরা অনেক বছর ধরে অবৈধভাবে আছেন তারা বিভিন্ন সময়ে পুলিশের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে ছাড়া পেয়ে গেছেন, তাদের এই গল্পও অন্যদের উৎসাহ দান করে যে এখানে অবৈধ থাকলে কিছু হবেনা। পুলিশকে টাকা দিলে ইহবে। তবে এটা কোনো সমাধান নয় ।

প্রবাসীদের অবৈধ থাকার মুল কারন যেহেতু অর্থনৈতিক, সেখানে প্রশ্ন তোলাই যেতে পারে যে, ভারত নেপাল থেকে যদি এক লাখ টাকারও কমে মালয়েশিয়ায় যাওয়া যায় তবে বাংলাদেশ থেকে কেনো তিনলাখ টাকারও বেশী লাগে !! কোনো দেশেই ১০০% অবৈধ প্রবাসী রোধ করা সম্ভব নয়, তবে এই বিষয়টি অবশ্যই আলোচনার দাবী রাখে যে কিভাবে অবৈধ থাকার প্রবনতা কমানো যায় বা কিভাবে শ্রমিকদেরকে অবৈধ হওয়ার প্রতিনিরুৎসাহিত করা যায়ঃ

* প্রাথমিক পর্যায়ের খরচ কমিয়ে আনতে হবে। নেপাল-ভারত পারলে আমাদের শ্রমিকরা কেনো এতো টাকার একটা বোঝা বহন করবে ।
* বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার সরকার আলোচনার মাধ্যমে দ্বিতীয় বছরের ভিসা ফি কমিয়ে আনতে হবে। আমার মতে এটা মিনিমাম হওয়া উচিৎ, কারন আমাদের যেমন বৈদেশিক অর্থ দরকার তেমনি মালয়েশিয়ারও বৈদেশিক শ্রমিক দরকার। আর আমাদের শ্রমিকরা মালয়েশিয়ার উন্নয়নে অনস্বীকার্য অবদান রাখছেন। সেখানে আমাদের সরকার তাদের সাথে এই বিষয়ে নেগোশিয়েশন আসা উচিৎ।
* বেতন এবং ভিসা ফি এরমধ্যে সামঞ্জস্যতা আনতে হবে।
* শ্রমিক এবং কোম্পানির মাঝে মধ্যসত্তভোগী দালালদের দৌরাত্ম বন্ধ করতে হবে।
* প্রবাসী শ্রমিকদের সাথে মালয়েশিয়ান পুলিশের ব্যবহার এবং তাদের অবৈধ উৎকোচ প্রতিরোধে দুই দেশের সরকারের বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। অবৈধ শ্রমিক যে কোনো দেশের নিরাপত্তার জন্যই ক্ষতিকারক।

মালয়েশিয়ার সরকার যেমন চায়না তার দেশে অবৈধ শ্রমিক থাকুক, তেমনি আমরা বাংলাদেশীরাও মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে থাকতে চাইনা। মালয়েশিয়ান সরকারের ধর-পাকড় নীতি কখনোই অবৈধ অভিবাসী রুখতে কার্যকর পদক্ষেপ নয়, বরং অনেক গুলো পদক্ষেপের মধ্যে একটি মাত্র। হয়তো সাময়িক ভাবে এটা কিছুটা স্বস্তি দেয় কিন্তু এটাই চূড়ান্ত সমাধান নয়।

ধর পাকড়ে একজন শ্রমিক ক্ষতি গ্রস্থ হয়, ক্ষতিগ্রস্থ হয় তার পরিবার। কিন্তু এটা কখনোই শ্রমিকদের অবৈধ হওয়া থেকে বিরত রাখার কার্যকরী পথ হতে পারে না। শ্রমিকদের অবৈধ হওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সরকারের উচিৎ ঢালাওভাবে শ্রমিকদের ক্ষতিগ্রস্থ না করে তাদের অবৈধ হওয়ার পিছনের কারনগুলো বের করে সেগুলোর সমাধান করা। তাহলেই হয়তো অবৈধ হওয়ার প্রতি শ্রমিকদের প্রকৃত অর্থে নিরুৎসাহিত করা যাবে।

লেখক : মোঃ সিফাত উল্লাহ (তুহিন) অধ্যয়নরত, ইউনিভার্সিটি মালয়েশিয়া সারাওয়াক (ইউনিমাস)