এগিয়ে চলেছে অদম্য সাইকেল বালিকারা

বিএম ডেস্ক : চৈত্রের রোদ কিংবা শ্রাবণের ঝড়বৃষ্টি কিছুই দমিয়ে রাখতে পারে না ঠাকুরগাঁওয়ের সাইকেল বালিকাদের। নিজেদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে স্কুলে যেতে প্রতিদিন সাইকেল নিয়ে ছুটে চলেছে মাইলের পর মাইল।

ঠাকুরগাঁওয়ের প্রত্যান্ত অঞ্চলের মেয়েরা অনেকেই বাইসাইকেলে করে স্কুলে যাওয়া আসা করছে নিয়মিত। এরা সবাই সাইকেল বালিকা নামে পরিচিত সবার কাছে। তাদের সাইকেলের বহর যখন চলতে শুরু করে, পথচারীরা সেই দৃশ্য গভীর মনোযোগের সঙ্গে অবলোকন করে। অনেকে এই দৃশ্যের মাঝে ফিরে পান নিজের ছোট বেলাকে।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার প্রতিটি বিদ্যালয়ের ক্লাস শুরু কিংবা শেষ হলে এমন মনোরম দৃশ্য চোখে পড়ে। বিশেষ করে গিলাবাড়ী, জামালপুর, ভাউলার হাট, সালন্দর, আকঁচা, খোচাবাড়ি, চিলারং, আউলিয়াপুর ইউনিয়ন থেকেও বাইসাইকেলে স্কুল-কলেজে আসে মেয়েরা।

তবে এসব কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পেছনের কাহিনী সুখকর নয়। শুধু শিক্ষার আলো পেতে প্রতিদিন এত দূরের পথ পাড়ি দিচ্ছে তারা। ওরা কেউই ধনী পরিবারের সন্তান নয়। তাদের বাবা-মার কেউ শ্রমিক, কেউ দিনমজুর। আবার কারও অভিভাবক স্থানীয় সঞ্চয় সমিতি থেকে কিস্তিতে টাকা নিয়ে মেয়েদের পড়াশোনার জন্য বাইসাইকেল কিনে দিয়েছেন।

আসমা ঠাকুরগাঁওয়ের সাইকেল বালিকাদের একজন। বাড়ি থেকে স্কুল পাঁচ কিলোমিটার দূরের হওয়ায় অনেক সময় স্কুলে যেতে পারত না। তবে সাইকেল কেনার পর সে সমস্যা মিটে গেছে বলে জানায় সে। এখন নিয়মিত সাইকেল চালিয়ে স্কুল, কোচিং এ যাতায়াত করে আসমা।

আসমা বলেন, “অনেকেই বিভিন্ন ধরনের কথা বলেছে। কিন্তু সাইকেল আমার সময় বাঁচিয়ে দিয়েছে। আমি এখন অনেক দ্রুত স্কুলে আসতে পারি।”

আসমার মতো ঠাকুরগাঁওয়ের অনেক মেয়েই স্কুলে যাওয়ার বাহন হিসেবে বেছে নিয়েছে স্কুলকে। এদের কেউ কেউ দুই কিলোমিটার, কেউ পাঁচ আবার কেউ ১০ কিঃমিঃ পথ অতিক্রম করে স্কুলে আসছে সাইকেল চালিয়ে।

তাদের মধ্যে আর একজন মাইসা। সেও রোজ সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যায়। সে জানায়, ওর বাবা কৃষক। চার ভাই বোনের মধ্যে ও বড়।

মাইসা জানান, “বাবা গত বছর সাইকেল কিনে দিয়েছেন। প্রথম প্রথম অনেক বখাটে ছেলে রাস্তায় বিরক্ত করত। এখন অনেকটাই কমে গেছে।”

রুবিনা নামের আরেক শিক্ষার্থীর বাবা বলেন, “সাইকেল দেওয়ার আগে আমার মেয়েটার ইচ্ছে থাকলেও প্রত্যেকদিন স্কুলে যেতে পারত না।”

মেয়েদের এমন সাহসী পদক্ষেপে খুশি স্কুলের প্রধান শিক্ষক মশিউর রহমান হিরু।

তিনি বলেন, “অনেকে অনেক কথা বলতো বলে মেয়েরা সাইকেল চালাতে সংকোচ বোধ করত। কিন্তু এখন তারা স্বাচ্ছন্দ্য।”

তবে গ্রামের অনেক শিশুর পরিবার সাইকেল কিনতে অপারগ। তবে সরকার মেয়েদের উন্নয়নে এ বিষয়ে সাহায্য করলে এ চিত্র পাল্টে যাবে বলে মনে করেন তিনি।

সদর উপজেলার গিলাবাড়ী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী আশরাফি ফাইমদা জানায়, পড়াশোনার অনেক খরচ। তবু তাদের পড়াশোনা করে অনেক বড় হতে হবে। তাদের এলাকা থেকে স্কুলে আসতে গাড়ি কিংবা রিকশা পাওয়া যায় না। পেলেও আসতে যেতে প্রতিদিন ৪০-৫০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। তাই বাইসাকেল কিনে দিয়েছেন তার বাবা-মা।

একই বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী সামিয়া আক্তার বলে, বিদ্যালয়ে আসতে যেতে প্রথম প্রথম বখাটে ছেলেদের উৎপাতসহ ছোট খাটো অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটতো। বিশেষ করে কাঁচা রাস্তা থাকায় বর্ষা মৌসুমে ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। তবে এখন সবই সয়ে গেছে।

নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী উর্মী কুন্ডু বলে, আগে সাইকেল চালালে গ্রামের মানুষ বিভিন্ন কথা বলতো। এখন আর কেউ কিছু বলে না। কম সময়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া আসা করতে পারায় বাকি সময়টা পড়ার টেবিলে দিতে পারি।

সদর উপজেলার গিলাবাড়ী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহজাহান-ই-হাবিব বলেন, গ্রামঞ্চলের মেয়ের আর পিছিয়ে নেই। তারাও এখন শিক্ষায় এগিয়ে গেছে। তারা সাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে আসে। নানা রকম সামাজিক কাজে অংশগ্রহণ করছে। স্কুল শেষে পবিরারের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করছে।

তিনি বলেন, মেয়েরা সাইকেল চালিয়ে বিদ্যালয়ে আসা শুরুর প্রথম দিকে রাস্তায় বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিত, মানুষ হাসাহাসি করত। এখন আর কোন সমস্যা হয় না। মেয়েরা যখন দলবদ্ধ হয়ে আসা-যাওয়া করে, তখন পথচারীরা রাস্তা ছেড়ে দাঁড়ায়।

ঠাকুরগাঁও সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ প্রফেসর লায়লা আরজুমান্দ বানু বলেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে এখন গ্রামাঞ্চলের মেয়েরা অনেক এগিয়ে। তারা বাইসাইকেল চালিয়ে স্কুল কলেজে যাওয়া-আসা করছে। এতে শিক্ষার্থীদের সময় নষ্ট হচ্ছে না। পাশাপাশি বখাটেদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে। তবে বাইসাইকেল চালক শিক্ষার্থীদের বেশি করে পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে, তাদের পুষ্টির অভাব না হয়।

বিএম/রনী/রাজীব