জাহাজভাঙা শিল্প নয়;মরণফাঁদ-১

তানভিরুল মিরাজ রিপন : জাহাজভাঙা কারখানায় বিস্ফোরণ শিরোনামে আজকের প্রথম আলো এক সংবাদের তথ্য মতে মারা গেছে দুজন, পাঁচজন দগ্ধ,দুজনের শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। একজনের শরীর জলিলের ৪৫ শতাংশ, সোহেলের ১৮ শতাংশ, আল আমিনের ১৩ শতাংশ, মো. মাসুদের ৬ শতাংশ ও মামুনের ৩ শতাংশ পুড়ে গেছে।  বিশেষত দক্ষিন এশিয়ার সর্ব বৃহৎ জাহাজ ভাংগা শিল্প এলাকাটি চট্টগ্রামে । চট্টগ্রামে সীতাকুণ্ডের জাহাজভাংগার যে সকল কোম্পানী রয়েছে সেসব কোম্পানিগুলোকে আদৌ কারখানা বলা যাবে কি না এ নিয়ে যথেষ্ট যাচাই বাছাইয়ের দরকার আছে৷
সীতাকুণ্ডের ১০ কি.মি. দীর্ঘ উপকূল জুড়ে ২২টি ইয়ার্ড রয়েছে। যেগুলো গণমাধ্যম কর্মী বা সচেতনমহলের কোনো ব্যক্তির প্রবেশাধিকারে নিষেধাজ্ঞা আছে। নিষেধাজ্ঞা থাকাটা অস্বাভাবিক নয়, যেহেতু ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পত্তি। কিন্তু এই ব্যক্তি মালিকানাধীন সম্পত্তি গুলোকে শুদ্ধ এবং ব্যবসায়ীক ভাষায় ইয়ার্ড বললেও  ১০ কি.মি. এলাকার সব শীপ ব্রেকিং ইয়ার্ড জীবন্ত মানুষের কবরস্থান, যেখানে শ্রমিকেরা অনিরাপদ মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে কাজ করে।
সকল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে মোট ৩০ হাজার লোকের কর্ম সংস্থান।প্রতিদিন,প্রতিমাসে,প্রতি বছরে কোনো না কোনো তারিখে মৃত্যুপুরী চট্টগ্রামের জাহাজকাঁটা কারখানাগুলো দেশি বিদেশি গণমাধ্যমে খবরের উপাদান হয়। সরকারি নজরদারি কম থাকলেও শ্রমিক সংগঠনগুলো দাবি করছে গত দশ বছরে ১২৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। যদিওবা এই তথ্যগুলোতে একটু হেরফের থাকার সম্ভাবনা অনেকাংশে বেশি। স্থানীয়দের ধারনামতে আরো বেশি হতে পারে মৃতের সংখ্যা৷ স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, জাহাজ কাঁটা  কাজে স্থানীয়দের কেউই এসব কোম্পানিতে কাজ করে না, এখানে যারা কাজ করে তারা বেশির ভাগ নোয়াখালী,পঞ্চগড়,দিনাজপুর, বরিশালের । স্থানীয় না হওয়াতে এখানে হতাহতের ঘটনা ঘটলেও লোকজন এতো খোজ খবর নিতে আগ্রহী নয়,যদিওবা মানবিকতা প্রশ্নে তারাও অনড়। কিন্তু তারা জানায় এসব স্থানে বহিরাগতদের প্রবেশ যেহেতু নিষিদ্ধ সেহেতু তারা লাশের আত্মীয় স্বজনদের সাথে সমঝোতা করে, খবরহীন ভাবে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে তাদের ধারনা।
শিপ ব্রেকিং মালিকদের দাবি তারা যথেষ্ট শ্রমিক বান্ধব। শ্রমিকদের নিরাপত্তার ভেতরে রেখেই তবে কাজ সম্পন্ন করে। কিন্তু সরেজমিনে এই কথার কোনো ভিত্তি নাই বললে চলে এমন নয়,বরং নাই-ই। ১০ মার্চ আমি গিয়েছিলাম সীতাকুণ্ড বার আউলিয়া এলাকার  শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে, প্রবেশেই বাধা। কোনো ধরনের অপরিচিত লোককে প্রবেশাধিকার সীমিত, সাংবাদিক পরিচয়েতো আরো মহা মুশকিল। এরপরও আমার কোনোমতে প্রবেশ টিকিট, যদিওবা আমার সাংবাদিক পরিচয়ে নয়। কিন্তু আমাকে একটা শর্ত জুড়ে দেওয়া হলো সীমা ধরে দেওয়া হলো। শর্তমতে, আমাকে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হবে না,দ্বিতীয়ত আমি কোনো ধরনের রেকর্ডার, অথবা ক্যামেরা ব্যবহার করতে পারবো না।তাদের একজন লোক আমার সাথে দেওয়া হলো,পুরো খোলা আকাশের নীচে তাবৎ দুনিয়ার সব থেকে বড় শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড দেখার সৌভাগ্য দেখার অভিজ্ঞতা অর্জন করলেও দুর্ভাগ্য ও ভয়ংকর বিষয় হলো মৃত্যুপুরী দেখা। জাহাজকাঁটছে একদল শ্রমিক তাদের কোনো হেলমেট বা জ্যাকেট নাই। সম্পূর্ণ অনিয়ন্ত্রিত ও অসর্তকায় কাটা পাঁত গুলো তুলে দিচ্ছে ট্রেনে। শর্তের ভেতরে হাটতে হাটতে দুচারজন শ্রমিকের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়,তারা কেউই চট্টগ্রামের নয়। পরিবারের দারিদ্র্য দূরের জন্য এখানে কাজ করতে আসা। এখানে তারা দিনে ১২ অথবা ১৪ ঘন্টা  কাজ করে প্রতি ঘন্টা ২৫ টাকা অথবা ৩০ টাকা করে পান। দিনে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার ওপরে কারোরই আয় হয় না।অথচ জাহাজের কাঁটা পাত ট্রাকে তুলার আগেও হয়ে যায় কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন। শুধু মাত্র ২০০৮ সালেও ৮০ হাজার টন জাহাজ ভাংগা হয়েছে। ২০০৭-০৮ অর্থ বছরে ইস্পাত ভাঙা হয়েছে ১০ লাখ টন ইস্পাত৷ এখানকার ৩০ হাজার শ্রমিকদের বেশিরভাগ শ্রমিকের গড়পড়তা বয়স ১২-১৮ এর ভেতর যা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক শ্রম আইনে শিশু শ্রম হিসেবে চিহ্নিত।