দিনের বেলায় দোকান রেকি, রাতে লুট : সাংকেতিক শব্দের ব্যবহার
    শার্টার ভাঙ্গা ৯ গ্রুপে সক্রিয় অর্ধশত সদস্য : গ্রেফতার ১১

    চট্টগ্রাম মেইল : কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার থানার বরকান্দা জয়পুর এলাকার ডেঙ্গুর বাড়ির বাসিন্দা মো. শহিদুর রহমানের ছেলে মো. হানিফ বয়স ৪০। বর্তমানে নগরীর হালিশহর থানার নয়াবাজার ধোপাপাড়া এলাকার মাহফুজের বাড়ী বসবাস করার পাশাপাশি গড়ে তুলেছে সংঘবদ্ধ একটি চোরচক্র।

    দোকানের শার্টার ভাঙ্গা চোর চক্রের দলনেতা হলেও হানিফের এক হাত বিকলাঙ্গ থাকায় সাধারণ মানুষের সন্দেহের বাইরে থাকে এবং খুব সহজেই দুর্ধর্ষ চুরির কাজটি সম্পন্ন করে।

    হানিফের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ চোর চক্রের সদস্যরা দিনের বেলায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। তারা এসব এলাকার বিভিন্ন শো-রুম, বড় কাপড়ের দোকান, বড় মুদির দোকান, সিগারেট বা বিভিন্ন ডিস্ট্রিবিউটরের অফিস, বিকাশের দোকানসহ যেসব দোকানে বেশি টাকা পয়সা লেনদেন হয় অথবা রাতের বেলায় ক্যাশে বেশি পরিমান টাকা থাকে এমন সব দোকান পর্যবেক্ষন করে টার্গেট করে নেন।

    পরে রাতের যে কোন সময় সুযোগ বুঝে ওই প্রতিষ্ঠানের দোকানের শার্টার কৌশলে ফাঁকা করে প্রবেশ করে সব লুট করে নেন।

    গত কয়েক মাসে কোতোয়ালী থানা এলাকায় এমন পাঁচটি চুরির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় মামলা দায়ের হয় থানায়। তদন্তে নামে পুলিশ। সম্প্রতি একটি চুরির ঘটনায় গ্রেফতার করা হয় মালিঙ্গা নামে এক চোর। পরে তার দেয়া বিভিন্ন তথ্যে আন্তঃজেলা চোর চক্রের সন্ধান মেলে।

    শনিবার (২৪ আগস্ট) দিবাগত রাতে লালদীঘির পাড়ের হোটেল তুনাজ্জিনে অভিযান চালিয়ে আন্তঃজেলা চোর চক্রের ১১ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে দুইটি এলজি, একটি লোহার কাটার, একটি লোহার রড ও চারটি কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে।

    গ্রেফতারকৃতরা হলেন, মো. লিয়াকত হোসেন (২৪), মো. আকরাম প্রকাশ আরমান প্রকাশ সাগর (২৩), মো. হানিফ (৪০), মো. তৌফিক (২৬), মো. মাসুম (২৬), নয়ন মল্লিক (২২), মো. মিলন (২৫), মো. কামাল হোসেন (২৮), জামাল উদ্দিন (৩০), মো. কামাল প্রকাশ ভুসি কামাল (৩২) ও মো. মিজান (২৫)।

    গ্রেফতারের পর সংবাদ সম্মেলন করে এসব তথ্য জানিয়েছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এসএম মেহেদী হাসান। তিনি বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চোর চক্র জানিয়েছে, তাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড মো. কামাল প্রকাশ ভুসি কামাল (৩২) দলনেতা হানিফের দেয়া তথ্যমতে দোকান চুরি করার পূর্বে পুনরায় দোকানটি রেকি করেন।

    দোকানে কি পরিমান টাকা পয়সা থাকে, কিভাবে চুরি করলে সহজ হয়, কি কি সরঞ্জাম লাগবে, চুরি করার পর দ্রুত পালানোর পথ এবং এতে কি পরিমাণ জনবল প্রয়োজন হবে সেসব ঠিক করে নেন। তার পর্যবেক্ষন শেষে গ্রীণ সিগনেল পেলে সংঘবদ্ধ চক্রের অন্যান্য সদস্যরা চুরির কাজে নেমে পড়ে।

    এরপর রাতের বেলায় মার্কেটের দোকানের শার্টারের প্রস্থ ছোট হলে শার্টারে লাগানো তালা কেটে প্রবেশ করে চোরের দল। আবার শার্টারের প্রস্থ বড় হলে শার্টারের মাঝে দুপাশে টেনে ফাঁকা করে ১ জন বা প্রয়োজনে ২ জন ভিতরে প্রবেশ করে। এসময় মার্কেটের সিকিউরিটি কিংবা অন্যান্য পথচারীর দৃষ্টি আড়াল করতে দোকানের সামনে পর্দা, লুঙ্গি, বিছানার চাঁদর ও ছাতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। এছাড়াও দুএকজন চোর সদস্য কৌশলে নানা অঙ্গভঙ্গি প্রদান করে তালাকেটে দোকানে প্রবেশ করে।

    সর্বোচ্চ সংখ্যক ২ থেকে ৩ মিনিটের মধ্যে দোকানের ভিতরে প্রবেশ করে প্রথমে স্ক্রু ড্রাইভার, ছোট কোরাবারীর মাধ্যমে কৌশলে ক্যাশবাক্স লকার ভেঙ্গে নগদ টাকা হাতিয়ে নেন। এরপর দোকানের ভিতরে থাকা বহনযোগ্য মূল্যবান জিনিসপত্র, মোবাইল, ল্যাপটপ ও টাকা চুরি করে দ্রুত সটকে পড়ে। তবে সেক্ষেত্রে কেউ বাঁধা দিতে আসলে আসামীরা তাদের হেফাজতে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার করেন।

    চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) উপ-কমিশনার (দক্ষিণ) এসএম মেহেদী হাসান বলেন, গ্রেফতারকৃতরা বিগত এক যুগ ধরে হানিফের নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৪৫ জন সদস্যের ছোট ছোট ৯টি গ্রুপ বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চুরি করে আসছে। তাদের সকলের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা জেলায় হলেও তারা সংঘবদ্ধভাবে ঢাকার গুলশান, মহাখালী, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার সদর থানাধীন এলাকা, কুমিল্লা কোতোয়ালী, সিলেট কোতোয়ালী, মৌলভীবাজার, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম শহরের বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোই থাকে প্রধান টার্গেট।

    বড় কাজ হলে হানিফ (৩৮) একাধিক ছোট ছোট গ্রুপকে একত্রিত করে চুরি কাজটি সংঘটিত করে। হানিফের গ্রুপে কোন সদস্য পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলে তার মামলা থেকে শুরু করে সংসার খরচ পর্যন্ত বহন করে গ্রুপের অন্য সদস্যরা। ফলে যে কোন চুরির কাজ সংঘঠিত হওয়ার পর হানিফ প্রাপ্ত অর্থের এক ভাগ নিয়ে বাকি ২ ভাগ অন্যান্য সদস্যদের কাছে বন্টন করে দেন। তবে সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কামাল অন্যান্য সদস্যদের চাইতে ২০ শতাংশ বেশি টাকা পায়।

    চোরদের সাংকেতিক শব্দ : চুরির কাজ সংঘঠিত করতে গেলে চোরেরা তাদের নিজেদের মধ্যে কথা বার্তায় ব্যবহার করে বিশেষ সাংকেতিক শব্দ। এরমধ্যে চোরেরা দোকানকে বলে অফিস, তালাকে বলে আম, কার্টারকে বলে গাড়ী, চাঁদরকে বলে ঠোঙ্গা। চোর চক্রের যে সদস্য চুরি করতে দোকানে প্রবেশ করে তারা তাকে অফিসম্যান হিসেবেই ডাকে।

    এসময় আশে পাশে কোন পুলিশ সদস্যকে দেখলে তারা তেলাচোরা বা তেইল্লাচোরা নামেই সম্বোধন করে। এছাড়া সংবাদদাতাকে লাইনম্যান হিসেবে এবং চুরি করাকে ডিউটি, চুরির টাকা পয়সাকে ব্যবসা এবং চুরি করা টাকা ভাগ বাটোয়ারার সময় প্রতি এক লক্ষ টাকার হিসেবকে তারা ১ টাকা হিসেবেই মোবাইলে এবং কথাবার্তায় এসব সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করে থাকে।

    এক্ষেত্রে সংবাদদাতা (লাইনম্যান) হচ্ছে হানিফ (৩৮), দোকানের (অফিস) ভিতর প্রবেশকারী (অফিসম্যান) হচ্ছে মো. লিয়াকত হোসেন (২৪) ও মো. তৌফিক (২৬)। তালা (আম) কার্টার (গাড়ী) দিয়ে কাটা ব্যক্তি হচ্ছে মো. কামাল হোসেন (২৮), মো. মিজান (২৫), মো. কামাল প্রকাশ ভুসি কামাল @ জসিম (৩২)।

    নগরীর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মোহাম্মদ মোহসিন জানান, গত ২৭ জুন নন্দনকানন গোলাপ সিংহ লেইন’ নিউ লাকি ইলেকট্রিক কোম্পানী নামক একটি দোকানের শার্টার ফাঁকা করে নগদ পৌনে ২ লাখ টাকা চুরি করে চোরের দল। এ ঘটনায় গত ২৯ জুন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়।

    এছাড়া চলতি বছরের গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে জুবিলী রোডস্থ আমতল সিডিএ মার্কেট রয়েল প্লাজার ৩য় তলায় দুর্ধর্ষ চুরি হয় কাজী কম্পিউটারস নামক একটি প্রতিষ্ঠানে। চোরের দল দোকানের শার্টারের তালা কেটে ১২টি ল্যাপটপ, ৫শ ২৫ পিস পেনড্রাইভ, ৪শ ৫০ পিস মেমোরি কার্ডসহ ১২ লাখ টাকার মালামাল চুরি করে নিয়ে যায়। ২৩ ফেব্রুয়ারি এ সংক্রান্ত একটি মামলা রেকর্ড হয় কোতোয়ালি থানায়।

    এ দুটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে আন্তঃজেলা চোর চক্রের তথ্য আসে। শনিবার গোপন তথ্যে খবর পেয়ে নগরীর লালদিঘীর পাড় জেলা পরিষদ সুপার মার্কেটের ৩য় তলায় অবস্থিত হোটেল তুনাজ্জিনের একটি কক্ষে অভিযান চালিয়ে ডাকাতির সরঞ্জামাদি এবং অস্ত্রশস্ত্রসহ এ চক্রের মুল হোতাসহ ১১ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

    গ্রেফতারকৃতদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে এ চক্রের বাকি সদস্যদেরও গ্রেফতারে পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত আছে বলে জানান ওসি মোহসিন।

    বিএম/রাজীব সেন..