কিছুতেই ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না পুঁজিবাজার: নিয়ন্ত্রণ রাঘববোয়ালদের হাতেই

পুঁজিবাজার রিপোর্টঃ ক্রমাগত সূচক ও শেয়ারদরে পতন এখন পুঁজিবাজারের স্বাভাবিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি) বিনিয়োগ বাড়ালেও পতন ঠেকানো যাচ্ছে না পুঁজিবাজার থেকে। এর অংশহিসেবে আগের দুই সপ্তাহের ধারাবাহিকতায় সপ্তাহজুড়েই পুঁজিবাজারে দরপতন হয়েছে। সপ্তাহজুড়ে লেনদেন হওয়া ৫ কার্যদিবসের মধ্যে চার দিনই কমেছে সূচক। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলেন, সম্প্রতি বাজার স্থিতিশীল করার জন্যও বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে করপোরেট ট্যাক্স কমিয়ে আনা, বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশমুক্ত আয় ২৫ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকায় উন্নীত করা, নগদ লভ্যাংশের প্রতি উদ্যোক্তাদের মনোযোগ বাড়াতে বোনাস লভ্যাংশ ও রিটেইনড আর্নিংসের ওপর ১০ শতাংশ করারোপ অন্যতম। এছাড়া পুঁজিবাজারে প্রাইভেট প্লেসমেন্ট নিয়ে সৃষ্ট নৈরাজ্য দূরীকরণে নেওয়া পদক্ষেপসহ আরও কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির নেওয়া বিনিয়োগ শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ, বাজারে বৈচিত্র্য আনতে নতুন পণ্য হিসেবে স্মল ক্যাপিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু, ডেরিভেটিভস, শর্ট সেল ও ইনভেস্টমেন্ট আইন প্রণয়নের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। কিন্তু এসবের কোনো কিছুতেই ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না পুঁজিবাজার। মূলত দীর্ঘমেয়াদি পতন থাকায় পুঁজিবাজার নিয়ে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হচ্ছে। যে কারণে বাজারের প্রতি ক্রমেই আস্থা হারাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। এভাবে চলতে থাকলে পুঁজিবাজারের অস্তিত্বই না বিলীন হয়ে যায় এমনটাই আশঙ্কা বিনিয়োগকারীদের। বাজারে নিজস্ব গতিতে দেখা যাচ্ছে না। বাজারে এখনও কারসাজি বিরাজমান। আবার বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য অনেক প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না বাজারের পতন। তাই প্রণোদনা ও ব্যাংক খাতের কোম্পানি দিয়ে বাজার ভালো করা যাবে না। বাজার ভালো করতে হলে বহুজাতিক কোম্পানি আনতে হবে। পাঁচ বছর আগে সরকার ঘোষণা দিয়েছিলেন রাষ্ট্রায়ত্ত ২৭টি কোম্পানি বাজারে আনা হবে। এখন পর্যন্ত তার কোনো একটি কোম্পানি বাজারে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। আবার অনেক কোম্পানি আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বাজারে আসতে পারছে না। পুঁজিবাজারে একটি কোম্পানি তালিকাভুক্ত হতে পাঁচ থেকে ছয় বছর লেগে যায়। কেন পাঁচ থেকে ছয় বছর লাগবে। কারণ অদক্ষতা, অস্বচ্ছতা এবং নীতিপরায়নহীনতা। আর এ কারণেই বাজারে এমনটি ঘটছে বলেও মনে করছেন তারা।

তারা আরও বলছেন, পুঁজিবাজার প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৪ সালে। ১৯৯৬, ২০০৯ এবং ২০১০ সালে বাজারধস হয়। গত ১০ বছরে বাজার এখনও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ২০১০ সালে যাদের কারণে বাজার ধস হয়েছিল। এ বিষয়ে ইব্রাহিম খালেদ ওইসব ব্যক্তিদের তালিকা করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছিলেন। এখন পর্যন্ত তাদের কারও শাস্তি হয়নি। কিন্তু যারা ছিল তারা রাঘববোয়াল। তারাই এখন বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। দেশের জিডিপির আকার ঠিকই বাড়ছে। কিন্তু এখনও অনেক জায়গায় কারসাজির চেষ্টা চলছে। কীভাবে লুটপাট করা যায় সে বিষয়ে সর্বক্ষণ তৎপর থাকে। পুঁজিবাজারের কিছু হলেই প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানানো হয়। কিন্তু পুঁজিবাজার দেখভাল করার জন্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে যদি সব বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে হয়, তাহলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বানানো হয়েছে কেন?

এদিকে, সাপ্তাহিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সপ্তাহ শেষে ডিএসই ব্রড ইনডেক্স বা ডিএসইএক্স সূচক কমেছে ০.৮২ শতাংশ বা ৩৯.২২ পয়েন্ট। সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসই-৩০ কমেছে ১.৫০ শতাংশ বা ৫০.৭০ পয়েন্ট। অপরদিকে শরীয়াহ বা ডিএসইএস সূচক কমেছে ১.৫৬ শতাংশ বা ১৭.৩৩ পয়েন্ট। আর সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত মোট ৩৫৭টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দর বেড়েছে ১২৮টির কোম্পানির। আর দর কমেছে ২০৯টির, অপরিবর্তিত রয়েছে ১৮টির এবং লেনদেন হয়নি ২টির। এগুলোর ওপর ভর করে গত সপ্তাহে লেনদেন মোট ১ হাজার ৫৬৩ কোটি ৮৭ লাখ ১২ হাজার ৭১৮ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়। তবে এর আগের সপ্তাহে লেনদেন হয় ১ হাজার ২৭৬ কোটি ৮৭ লাখ ৮ হাজার ৩০৩ টাকার। সেই হিসাবে সমাপ্ত সপ্তাহে লেনদেন বেড়েছে ২৮৭ কোটি ৪ হাজার ৪১৫ টাকা বা ২২.৪৮ শতাংশ।

গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৩৩ কোটি টাকা। যা তার আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ছিল ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৪ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা। আর সমাপ্ত সপ্তাহে ‘এ’ ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৭৯.৪৫ শতাংশ। ‘বি’ ক্যাটাগরির কোম্পানির লেনদেন হয়েছে ১৫.৫৯ শতাংশ। ‘এন’ ক্যাটাগরির কোম্পানির লেনদেন হয়েছে ৩.৭২ শতাংশ। ‘জেড’ ক্যাটাগরির লেনদেন হয়েছে ১.২৪ শতাংশ।

অন্যদিকে, সপ্তাহশেষে চট্টগ্রাম স্টক এক্সেচঞ্জের (সিএসই) সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ১৪৮ পয়েন্ট বা ১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ৫০৭ পয়েন্টে। এছাড়া সিএসসিএক্স ৮৪ পয়েন্ট বা ০.৯৪ শতাংশ, সিএসই-৩০ সূচক ৫০ পয়েন্ট বা ০.৩৯ শতাংশ, সিএসই-৫০ সূচক ৫ পয়েন্ট বা ০.৪৫ শতাংশ এবং সিএসআই ১৫ বা ১.৬০ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ৮ হাজার ৮১৬, ১২ হাজার ৮৩৭, ১ হাজার ৭৪ ও ৯৪৪ পয়েন্টে। আর সপ্তাহজুড়ে সিএসইতে হাতবদল হওয়ার ২৯৯টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দর বেড়েছে ৯৪টি কোম্পানির। আর দর কমেছে ২৮৭টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ১৮টির। এগুলোর ওপর ভর করে বিদায়ী সপ্তাহে ৭৫ কোটি ৯ লাখ ৫৮ হাজার ৪৯২ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে।