পারলে ‘সমান’ প্রতিশোধ নাও : ইরানকে যুক্তরাষ্ট্র

সোলাইমানি

মার্কিন হামলায় নিহত ইরানের শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলাইমানির কফিন নিয়ে ইরাকে যখন লাখো মানুষের শোকযাত্রা চলছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যে আরো সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। সঙ্গে দাবি করেছেন, যুদ্ধ বাধাতে নয়; মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থামাতেই তিনি সোলাইমানিকে হত্যা করেছেন। অন্যদিকে ইরান গতকাল শনিবার অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের উসকানি দিয়ে বলেছে যে তেহরান যেন পারলে ‘সমান’ প্রতিশোধ নেয়!

এদিকে গতকাল সকালে ইরাকের বাগদাদে নতুন করে বিমান হামলার কথা শোনা গেলেও পরে তা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। কোনো কোনো গণমাধ্যমে বলা হয়, মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর ওই হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্র হামলার কথা স্বীকার করেনি।

গত শুক্রবার বাগদাদ বিমানবন্দর এলাকায় মার্কিন বিমান হামলায় নিহত হন ইরানের কুদস বাহিনীর প্রধান জেনারেল সোলাইমানিসহ ১০ জন। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পর দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি ধরা হতো সোলাইমানিকে। তাঁর মৃত্যুতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে চরম অস্থিরতা। খামেনি প্রতিজ্ঞা করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ‘চরম প্রতিশোধ’ নেওয়া হবে।

শুক্রবারের মার্কিন হামলায় নিহতদের মধ্যে ছিলেন ইরাকের আধাসামরিক বাহিনী—পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সের (পিএমএফ) দ্বিতীয় শীর্ষ কমান্ডার আবু মাহদি আল-মুহান্দিসও। গতকাল সোলাইমানি ও মুহান্দিসসহ ১০ জনের কফিন নিয়ে বাগদাদে শোকযাত্রা করে হাজার হাজার মানুষ। এদের মধ্যে নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে সব বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষই ছিল। অংশ নেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদেল মাহদিও। শোকযাত্রাটি বাগদাদের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সড়কের পাশাপাশি কূটনৈতিক এলাকাও প্রদক্ষিণ করে, যেখানে মার্কিন দূতাবাসও রয়েছে। শোকযাত্রায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই ‘যুক্তরাষ্ট্র নিপাত যাক’ বলে স্লোগান দেয়। কারো কারো হাতে ছিল খামেনি এবং সোলাইমানির ছবি।

গতকাল রাতে এক দফা জানাজা শেষে সোলাইমানিসহ ইরানি সেনাদের লাশ তেহরানে পৌঁছার কথা। সোলাইমানির লাশ দাফনের কথা রয়েছে আগামী মঙ্গলবার, তাঁর নিজ শহর কারমানে।

সোলাইমানিকে হত্যার ‘যুক্তি’ দেখাতে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা শুক্রবারের (সোলাইমানিকে হত্যার) অভিযান চালিয়েছি যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে; যুদ্ধ বাধানোর জন্য নয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘ইরানে সরকারের পরিবর্তন ঘটানোও আমাদের উদ্দেশ্য নয়।’ ট্রাম্প অভিযোগ করেন, ইরাকে অবস্থানরত মার্কিন কূটনীতিক ও সেনাদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন সোলাইমানি। সেই পরিকল্পনা নস্যাৎ করতেই তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। ‘আরো আগেই সোলাইমানিকে হত্যা করা উচিত ছিল’ বলেও মন্তব্য করেন ট্রাম্প।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে সেখানে নতুন করে সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর—পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার সেনা পাঠানো হবে। তাদের মোতায়েন করা হবে ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় কুয়েত সীমান্তে।

এদিকে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডসের ডেপুটি কমান্ডার রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী ফাদাবি বলেছেন, ‘ঘটনার দিনই (শুক্রবার) যুক্তরাষ্ট্র বার্তা পাঠিয়েছে। তারা এও বলেছে যে প্রতিশোধ যদি নিতে চাই, তাহলে তারা যেটা করেছে, আমরা যেন সেটা করে দেখাই।’

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ইরানে অবস্থিত সুইস দূতাবাসের মাধ্যমে দুই দেশের তথ্য আদান-প্রদান হয়ে থাকে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের বার্তা কিভাবে পেলেন, ফাদাবি তা নিশ্চিত করেননি। তিনি বলেছেন, ‘আমরা কী পদক্ষেপ নেব, তা যুক্তরাষ্ট্রকে বলে দিতে হবে না। যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অবশ্যই চরম প্রতিশোধ অপেক্ষা করছে। আর এই প্রতিশোধ কেবল ইরানে সীমাবদ্ধ থাকবে না।’

শুক্রবার রাতে অবশ্য ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাবেদ জারিফ টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে বলেন, ‘সুইস কর্মকর্তাকে তলব করা হয়েছিল। তাঁর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের দুঃসাহসকি চিঠির জবাব দেওয়া হয়েছে।’

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও অভিযোগ করেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আমরা ইউরোপের মিত্র রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে আশানুরূপ সহযোগিতা পাচ্ছি না। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স কিংবা জার্মানিসহ সবাইকে বুঝতে হবে, আমরা করছি, আমেরিকানরা কী করছে। আমরা কিন্তু ইউরোপকেও সুরক্ষা দিচ্ছি।’

পম্পেওর এমন অভিযোগের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসেফ বোরেল এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘ইরাকে যে অস্থিরতা চলছে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আগেই বন্ধ করতে হবে। আমরা বিবদমান সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’

ইরাকের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক খবরে বলা হয়েছে, গতকাল সকালে বাগদাদের উত্তরে পিএমএফের গাড়িবহরে বিমান হামলা চালিয়েছেন মার্কিন সেনারা। তাতে আহত হয়েছেন অন্তত ছয়জন। তবে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর মুখপাত্র মাইলেস ক্যাগিনস দাবি করেছেন, গতকাল ওই অঞ্চলে তাঁরা কোনো ধরনের হামলা চালাননি। অন্যদিকে পিএমএফ প্রথম হামলার কথা জানিয়ে বিবৃতি দিলেও পরে তা প্রত্যাহার করে নেয়। শুরুতে হামলার কথা বলে পরে তা প্রত্যাহার করে নেয় ইরাকের সামরিক বাহিনীও।

ন্যাটো জানিয়েছে, বিরাজমান পরিস্থিতিতে ইরাকে তাদের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। ইরাকে সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে জর্দানের ‘রয়াল জর্দানিয়ান’ ও বাহরাইনের ‘গালফ এয়ার’। ব্রিটিশদের ইরাক ও ইরান সফর থেকে বিরত থাকতে বলেছে যুক্তরাজ্য। সূত্র : বিবিসি, এএফপি।