পশ্চিমা সেবাদাসদের অটুট বিশ্বাস বেদীতে দাঁড়িয়ে হেজিমনিদের ইতিহাস বি-নির্মাণ

তৌহিদ শাকীল ::

ব্রিটেন ইউরোপ আমেরিকায় দাস বণিকদের মূর্তি ধ্বংসে আমাদের বুদ্ধিজীবীদের কারো কারো কণ্ঠে শুনতে পাই এক ধরণের প্রচ্ছন্ন হাহাকার। এই হাহাকার দুর্লভ নয়। পশ্চিমাদের ‘পান থেকে চুন খসলে’ও সহসাই এমন নজির হাজির হয়ে যায়।

অথচ প্রাচীন বিশ্ব ইতিহাসের মহামূল্যবান সাক্ষী, ‘সভ্যতার আঁতুড় ঘর’, মেসোপটেমিয়ার সবচেয়ে বিখ্যাত শহর ব্যাবিলন যখন ধ্বংস করে ফেলে এইসব দাসবণিকের ছদ্মবেশী লুটেরা বংশধরেরা, তখন আমাদের এই বুদ্ধিজীবীরাই বিস্ময়করভাবে থাকেন নির্বিকার! নিশ্চুপ!

পশ্চিমা হেজিমনিরা ইতিহাস বি-নির্মাণ করেন তাদের সেবাদাসদের অটুট বিশ্বাসের বেদীতে দাঁড়িয়ে। সে ইতিহাসে নিপীড়িতদের জায়গা হয় না। নিজেদের প্রয়োজনে এইসব ‘সাদা মন’-এর হেজিমনিরা নিজেদের উপযোগী আইন তৈরি করেন।

এসব দেখেও যারা বোঝেন না, তাদের জন্য মিশেল ফুকোর ‘ডিসকোর্স’-এর কথা স্মরণ করছি, যেটা পড়লে বোঝা যায়, আমাদের ভালো লাগার অনুভব থেকে শুরু করে সুন্দরের রং সবকিছু তৈরি করে এই পশ্চিমা হেজিমনিরা। নিজেদের এসব দুরভিসন্ধি বাস্তবায়নে তারা ব্যবহার করে নিজেদের মিডিয়া ও ক্ষমতা। নিজেদের ব্যবসার প্রয়োজনে তারা মাঝেমধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ নারীদেরও বিশ্বসুন্দরী হিসেবে নির্বাচিত করে। অর্থাৎ, চাইলেই ওরা সাদাকে অসুন্দর হিসেবেও উপস্থাপন কোরতে পারে। আজকের এই যারা সভ্য প্রতীম, ওরা কখনো সভ্যই ছিল না। সেদিনের এই দাসবণিক আর দস্যুবণিকেরা কালো ইতিহাসের সম্পদের উপর দাঁড়িয়ে আজও কেবল সভ্যতার মুখোশই পরে আছে। আর কূটাভাসে বিহবল আমরা, ওদের বর্ণিত ধারণাতেই, চিনে নেই আজকের সভ্যতা।

অথচ, পঞ্চম শতকে ভারতের বিহার রাজ্যে যখন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশুনা করছে, তখন পশ্চিমাদের দুয়েকটি দেশে সবেমাত্র ভাষিক বর্ণের জন্ম হয়েছে। ব্যাবিলনের সভ্যতার পথ ধরে সেমেটিক ধর্মের অংশ হিসেবেই ইসলাম ধর্মের আত্মপ্রকাশে যখন গোটা আরব বিশ্ব বিজ্ঞান, দর্শন, শিল্প-সাহিত্যে সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছে, আজকের সুপার পাওয়ার আমেরিকাকে তখন খুঁজেও পাওয়া যায়নি। অজ্ঞতার অন্ধকারে তখন তারা হাবুডুবু খাচ্ছে। হাজার বছর পরও ওরা ছিল অসভ্য বর্বর। কলম্বাসের ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে রয়েছে গণহত্যা, লুণ্ঠন, শোষণ ও নির্যাতনের রক্তমাখা আমেরিকা! অর্থ-সম্পদে আমেরিকা আর ইয়োরোপ একসময় সমৃদ্ধ হয়ে উঠেছিল আফ্রিকা থেকে গায়ের জোরে ধরে আনা কালো মানুষদের পরিশ্রমে; তাদের রক্তে, ঘামে; চোখের পানির দামে। আর এই কালো মানুষদের যারা ধরে এনেছিল তারা বর্তমান সুসভ্য, গণতান্ত্রিক, মানবাধিকারবাদী ইয়োরোপের শ্বেতাঙ্গ।

আজ সেই পশ্চিম শুধুমাত্র সামরিক শক্তি কব্জা করে পুরো ইতিহাস দিয়েছে উল্টে। ঔপনিবেশিক সেই পশ্চিম আজ পূর্বকে বলছে, ‘তুই আনসিভিলাইজড; তুই সন্ত্রাসী; তুই জঙ্গি।’

ফারদিনান্দ ম্যাগেলান আর ভাস্কো দ্য গামার উত্তরসূরিরা প্রাচ্যে গোড়াপত্তনের পর পশ্চিমা আনুকুল্য পাবার লোভে প্রাচ্যের এলিট গোষ্ঠী নিজেরাই ‘গোরা সাহেব’ হওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিল। প্রাচ্য এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বলি হয়েছে সেই কবে। অথচ আজও প্রাচ্য তাতে কতটা নিমজ্জিত, পুজিবাদীদের উতসবে মত্ত বর্তমানের আপাত নাস্তিক আর প্রগতিশীলদের দিকে তাকালে, সহজেই অনুমান করা যায়। উপনিবেশবাদী আগ্রাসন আর দাসানুদাসের মনোবৃত্তি কোন পর্যায়ে গেলে এমনটা হতে পারে সেটাও সহজে অনুমেয়!

এডওয়ার্ড সাঈদের ‘‘ওরিয়েন্টালিজম” শেকড় সুদ্ধ তুলে এনেছিল প্রাচ্য আর পশ্চিমা বাস্তবতার এই দেহরূপ। এরপরও ওরা আমাদের যেমন ভাবে ভাবাতে চায়, আমরাও অবলীলায় তেমন ভাবেই ভাবতে অভ্যস্থ হয়ে যাই!

বিশ্বব্যাপী এমন প্রশ্রয়েই, কালো ইতিহাসের কুৎসিত প্রাচুর্যের এইসব দাসবণিক, বর্ণবাদী ধনকুবের, শত শত বছর ধরে থেকেছে মহাত্মা রূপে মূর্তিমান। এরা প্রত্যেকে এক-একটা নৃশংস, জঘন্য, কুলাঙ্গার, শয়তান। এদের দাস প্রথার বলী, কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের ইতিহাস বড় করুণ, মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। মানুষকে তারা মানুষ নয়, গরু ছাগল কিম্বা কুকুর বেড়ালের মতো গণ্য করেছে। তাদের দাস বানিয়েছে। গলায়, পায়ে শিকল বেঁধে হাটে হাটে বিক্রি করেছে। তার আগে লোহা পুড়িয়ে টকটকে লাল করে সেটি দিয়ে গরু ও ঘোড়ার গায়ে যেভাবে দাগ দেয়া হয় ঠিক সেভাবেই দাগ বা চিহ্ন দিয়েছে। এরপর প্রতিদিন চাবুক দিয়ে পেটানো, খেতে না দিয়ে সারা দিন কাজ করানো এমনই সব পাশবিক আচরণ করেছে। ক্রীতদাসের করুণ কাহিনী সেই যে ১৬১৯ সাল থেকে শুরু, তারপর প্রায় আড়াইশ’ বছর ধরে কী অমানবিক সে ইতিহাস তা এখন কমবেশী সবাই জানেন! অ্যালেক্স হেলির বিখ্যাত উপন্যাস,‘রুটস দ্য সাগা অব অ্যান আমেরিকান ফ্যামিলি’, অবলম্বনে টেলিভিশন সিরিয়াল ‘রুটস’ যারা দেখেছেন তারা চোখের জলের বিনিময়ে সেই মর্মান্তিক কাহিনীর সামান্য কিছুটা হয়তো অনুভব করেছেন।

অথচ ভাইকিংইয়ের বংশধরেরা এইসব দাসবণিকদের দিয়েছে নাইট উপাধী! বানিয়েছে মহাত্মা-পুন্যাত্মা মূর্তি! এদের চাকচিক্যের মরীচিকায় আড়াল হয়ে আছে আদিম, বন্য, হিংস্র, নির্যাতকের ইতিহাস। সেই বর্বরতার, সেই নৃশংসতার কারণেই আফ্রিকার সবচেয়ে ছোট দেশ গাম্বিয়ার ইতিহাসের অনেকটা জায়গাজুড়ে আর টেইমসের নদীজলে আজও মিশে আছে দাসদের কান্না। নদীতীরে দাঁড়িয়ে আছে জঘন্য যত দাস শিকারীদের আবক্ষ কিম্বা পূর্ণাবয়ব মূর্তি।

মানবের সভ্যতায় কী আছে মূল্য এদের! এগুলো তো সব মানুষ রুপী তুচ্ছ প্রাণীর অহেতুক চিহ্ন, নগন্য দাস ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশী মূর্তি। প্রাচীন বিশ্ব ইতিহাসের মহামূল্যবান সাক্ষী ব্যাবিলনীয় সভ্যতার ধ্বংসাবশেষের তুলনায় তো এগুলোর ইতিহাস মূল্য নস্যি মাত্র! এসব মূর্তি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও তেমন কিছু কী আসে যায়! ব্যাবিলনীয় সভ্যতার তুলনায় তো এগুলো ধুলোর যোগ্যও নয়!

প্রাচীন বিশ্ব ইতিহাসের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে রয়েছে মেসোপটেমিয়া। আর ব্যাবিলনের উল্লেখ ছাড়া এ অঞ্চলের ইতিহাস কখনোই সম্পূর্ণ হবে না। তাই এ নগরীর ধ্বংসাবশেষের গুরুত্বও অপরিসীম। সেজন্য সাদ্দাম হুসেনের আমলে ইরাক সরকার ব্যাবিলনের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কার ও প্রাচীন এ নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ (যেমন- নেবুচাদনেজারের একটি প্রাসাদ) নতুন করে নির্মাণের কাজ হাতে নিয়েছিল।

কিন্তু ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরাক দখলের পর সে প্রচেষ্টায় আসে বড় ধরণের আঘাত। আগ্রাসী যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ব্যাবিলনের ধ্বংসাবশেষের উপরই তাদের একটি ঘাঁটি স্থাপন করে, যার ফলে প্রত্নতাত্ত্বিক এ নিদর্শনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ২০০৯ সালে অবশ্য দর্শনার্থীদের জন্য জায়গাটি আবারো উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে।

কিন্তু এই লুটেরাদের ভয়ংকর ছদ্মবেশী ‘হলি ওয়ার (!)’ এর অভিশাপে ব্যাবিলনের পুনরুদ্ধারযোগ্য অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ইতিহাসই চিরকালের জন্য বিলীন হয়ে গিয়েছে। তা না হলে কে জানে, ব্যাবিলন সম্পর্কে আরো অনেক চমকপ্রদ তথ্যই হয়তো এতদিনে আমাদের সামনে চলে আসত, যেগুলো আমরা কোনোদিন কল্পনাও করতে পারিনি।

অথচ এমন ব্যাপারে আমাদের তথাকথিত প্রগতিশীল, বুদ্ধিজীবীরা রহস্যজনকভাবে নীরবই থেকে যান। বর্ণবাদী ভাইরাসের প্রবল উপস্থিতির মধ্যেও বর্ণবাদসহ সব ধরণের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার এডওয়ার্ড সাঈদ কিম্বা নোয়াম চমস্কিও এইসব পশ্চিম-প্রেমীদের চোখ খুলে দিতে অক্ষম।

লেখক ::

তৌহিল শাকীল, চ্যানেল এস টেলিভিশন, লন্ডন