পৃথিবীব্যাপী করোনাক্রান্তি রেখা বিশ্ব সমাজ বদলে দেবে

সৌরভ প্রিয় পাল ::

এক. করোনা। রুপক অর্থে যদি বলি কিছু না করতে বলছে করোনা! যেমন পাপ করোনা! যুদ্ধ-হানাহানি করোনা! এইরকম অনেক নেগেটিভ কিছু করোনা। এই ধরিত্রী আর সহ্য করতে পারছে না। তাই করোনা দিয়ে আমাদের বদলে দিতে চাইছে! এই কথাগুলোর বিজ্ঞান ভিত্তিক কোন ভিত্তি নেই। তবুও ধর্মভীরু বা, ধর্মান্ধদের কথার কথা হতে পারে। এসবের ভিত্তি থাকুক আর নাই বা থাকুক এই করোনা আমাদের সত্যিই বদলে দিয়েছে। সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে। সমাজ, পরিবার-পরিজন বিপদে কিভাবে দূরে সরে যাচ্ছে বা কাছে দাঁড়িয়েছে তার চিনিয়েছে। মাতাপিতা ও সন্তানের সম্পর্ক নতুন করে বদলে দিয়েছে। করোনা আক্রান্ত মাতাপিতাকে সন্তান এবং করোনা আক্রান্ত সন্তানকে মাতাপিতা কিভাবে রাস্তায় বা, জঙ্গলে ফেলে আসে তা দেখিয়েছে। করোনা আক্রান্ত বা, করোনা সিনড্রোম নিয়ে মৃত ব্যক্তির লাশের জন্য কবরকুড়া বা সৎকার তো দুরের কথা লাশ বহনে খাটিয়া পর্যন্ত দেয়নি এ সমাজ। অনেকেই তো এলাকায় কবর দিতেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আক্রান্ত পরিবার সহ হাসপাতালে সেবা প্রদানকারী হেলথ ওয়ার্কারদের এলাকায় কতোভাবে নিগৃহীত করেছে, হেয় প্রতিপন্ন করেছে এমনকি আক্রমণও করেছে এ সমাজ। তাই সমাজ নিচে নতুনভাবে ভাবার সময় এসেছে।

দুই. এই গেলো সমাজ। এবার আসুন রাষ্ট্র। রাষ্ট্র চিকিৎসা সেবা, সংক্রমণ ঠেকানো ও নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। করোনা পরীক্ষা ও করোনা চিকিৎসা দুটোই ঠিকভাবে করতে পারছে না সরকার। সেজন্য দেশে করোনার সঠিক পরিসংখ্যান অজানাই থেকে যাবে। তাছাড়া ভঙ্গুর স্বাস্থ্যখাতে লাগামহীন দুর্নীতি জনসমক্ষে ভেসে ওঠেছে। চিকিৎসার অভাবে হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে ঘুরে মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে মারা গেছে কতো নাগরিক। ডাক্তাররা প্রাইভেট চেম্বার সহ রোগীদেখা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। আবার বেসরকারি হাসপাতালে করোনাকালে গলাকাটা বিলও নিতে দেখেছি। সরকারি হাসপাতালগুলোতেও ডাক্তার দেখাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে নাগরিকদের। কিছু সময়ের জন্য ধনী-গরিব ব্যবধান কমিয়ে এনেছিলো করোনা। তবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভিআইপিদের জন্য আলাদা চিকিৎসাসেবা চালু করায় এটা অত্যান্ত গর্হিত পাপ করেছে সরকার। অন্যদিকে লকডাউনের দরুন দেশের অর্থনীতির দৈন্যদশা। জিডিপি ৩ ভাগের নিচে নেমে আসতে পারে। প্রবৃদ্ধির হার ৬০/৭০ শতাংশ কমে যেতে পারে। রাজনীতিও বদলে গেছে বা, যাচ্ছে। কিছুটা হলেও সহনশীলতা এসেছে রাজনীতিতে। পুলিশ ও প্রশাসনের ভুমিকা অনস্বীকার্য এই করোনায়। তাদের ভাবমূর্তি অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে এই করোনা কালে। শিক্ষা ব্যবস্থার পঞ্জিকাও পাল্টে যাবে। সাধারন মানুষের দৈনন্দিন জীবিকার উপরে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। দেশে বিশেষভাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণী সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হতে যাচ্ছে।

তিন. এশিয়া। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চীনে জন্ম নেওয়া ভাইরাসটি বিশ্ব বদলে দিবে অথচ এশিয়ার পরিবর্তন করবে না তা হয় না! দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা পুরো এশিয়ার একক নেতৃত্ব হয়তো চীনের হাতে চলে যাবে। এশিয়ার দুই পরাশক্তির দেশ চীন-ভারত। ইতোমধ্যে ভারতকে সবদিক দিয়ে ঘিরে রেখেছে চীন। যেমন, ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো হলো, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, ভুটান, চীন, বার্মা ও বাংলাদেশ। এরমধ্যে একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া বাকি দেশগুলোতে সবক্ষেত্রেই চীনের প্রভাব অপরিসীম। সবাই চীনের অর্থনীতির কাছে জিম্মি। ভারতের আমদানি বাণিজ্যে চীনের ভুমিকা অপরিসীম। ভারতের জিডিপি অনেকটা নির্ভর করে চায়নার কাচামালের উপর। এখন বাংলাদেশও হাত দিয়েছে চায়না। চীন সব ধরনের সহায়তার হাত বাড়িয়েছে বাংলাদেশে। যেমন, অর্থনৈতিক, কারিগরি-প্রযুক্তি, চিকিৎসা সহ নানা দিকে। চীনের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের লোন ও অর্থনৈতিক সুবিধার লোভে চাপা পড়ছে বাংলাদেশ। সুতরাং অদুর ভবিষৎএ হয়তো চীনের দিকেই ঝুঁকতে পারে বাংলাদেশ। সেই পরিপেক্ষিতে ভারত একঘরে হতে পারে অনেকটা। বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে ভারতের সহযোগিতা কিছুটা হলেও ভুলে যাতে পারে। এর কারণ হিসেবে ভারতীয় একগুঁয়েমি এবং বড়ভাইনীতি দায়ী হতে পারে। বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট সহ সকল ধরনের সুযোগ সুবিধা দিলেও ভারত তেমন কিছু দেয়নি বাংলাদেশকে। শুধু কাগজে বা মুখে বন্ধুপ্রতীম হলে তো একটা রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা কষ্টকর। দীর্ঘদিন ধরে তিস্তাচুক্তি ও সীমান্তহত্যা সহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঝুলিয়ে রেখেছে ভারত। চট্টগ্রাম বন্দরের সুবিধা ভারত পেলেও, তা চায়নার হাতে বন্দরের মূল নিয়ন্ত্রণ চলে যেতে পারে। গভীর সমুদ্রবন্দর তাই আভাস দিচ্ছে। পাকিস্তান, ভারত আর চীন পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হলেও শুধুমাত্র চীন উচ্চ অর্থনীতির দেশ হওয়ায়, এশিয়ার একমাত্র পরাশক্তি হতে যাচ্ছে চায়না এটা অনস্বীকার্য।

চার. বিশ্বও বদলে দিয়েছে করোনা। বিশ্বজুড়ে প্রায় কোটি মানুষকে আক্রান্ত করে সাড়ে চার লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নিলো করোনা। তবে সঠিক পরিসংখ্যান অজানাই থেকে যাবে। আধুনিক বিশ্বে ও তাদের প্রযুক্তি করোনার নিকট কতোটা অসহায় এটাই তার প্রতিচ্ছবি। ইউরোপ আমেরিকাকে সবাই এত উন্নত মনে করতো, অথচ তাদের দেশগুলোতে মৃত্যু হয়েছে সবচেয়ে বেশি! চিকিৎসা দিতে হিমসিম খাচ্ছে তারা। বিশ্বের অর্থনীতিও টালমাটাল করে দিয়েছে করোনা। প্রথম সারির দেশগুলো বিশেষ করে আমেরিকার ও চায়নার অবস্থানও বদলে যাবার আভাস মিলেছে। হয়তো পৃথিবীব্যাপী যুদ্ধ ও হামলাগুলো কিছুদিন ধরে জিরিয়ে নিচ্ছে। গত চারমাস যাবৎ কোন দেশে জঙ্গি হামলার শিকার হয়নি। কিন্তু তবুও পরাশক্তির দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও চীন বসে নেই। চীন যদি সত্যি সত্যি করোনা ভাইরাস ইচ্ছেকৃত ছড়িয়ে দিয়ে থাকে, তাহলে আগামীতে চীনই রাজত্ব করবে এই পৃথিবীতে। কারণ এ-র কোন প্রমাণ নেই। সুতরাং এরা ছড়িয়ে থাকলে, এরা ঔষধও আবিষ্কার করে ফেলেছে ইতোমধ্যে। হয়তো ওরাই সর্বপ্রথম ঔষধ রপ্তানি করবে পুরো পৃথিবীতে। এক্ষেত্রে চীন অর্থনীতিতে এক নাম্বার পজিশনে চলে আসবে। আর যদি করোনা চীনের জৈব কারখানায় সৃষ্টি না হলেও চীন আমেরিকার উপর নিশ্বাস ফেলবে। কারণ এই করোনা কালেও তাদের উৎপাদন ও অর্থনীতি একদিনের জন্যও বসে নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও আজ চীনের হাতের মুঠোয়। আর পুরো পৃথিবীর দুশো দেশই who এর নির্দেশে চলছে। যুদ্ধবাজ আমেরিকার অস্ত্রের বাজারের বৃহৎ একটি অংশও চীন ও রাশিয়ার হাতে চলে যাবে। এতে আমেরিকার সামরিক শক্তিতে চীনও প্রতিদ্বন্দ্বী করবে আরো বেশি। রাশিয়া কিছু কিছু ক্ষেত্রে চীনকে শতভাগ সাপোর্ট দিবে। শুধুমাত্র আমেরিকাকে ধরাশায়ী করার জন্য। সেক্ষেত্রে রাশিয়াও কিছুটা চায়না নির্ভর হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার শক্ত অবস্থান নাড়িয়ে দিতে পারে চীন। তেল বাণিজ্যে বড়ভাগ বসাতে পারে চীন। ক্রীড়াতেও ইউরোপের উপর মারাত্মক প্রভাব পড়েতে যাচ্ছে। সর্বপরি পৃথিবীর বাণিজ্যে এখন যা আছে, তারচেয়ে বড় একটা অংশ একক আধিপত্যে নিবে চীন এটা অনস্বীকার্য। তাই পৃথিবীতে আমেরিকার রাজত্বে কিছুটা ভাটা পড়তে যাচ্ছে এটা সুনিশ্চিত। আর পৃথিবীব্যাপী চীনের বাণিজ্য ও ঋণের বোঝা সবাইকে ভোগাবে।

তবুও সুন্দর একটা সকালের চিন্তা করে পৃথিবী। এই করোনার বদলে যাওয়া থেকে শিক্ষা নিতে চায় পৃথিবী। প্রানখুলে নিঃস্বাস নিতে চায় পৃথিবী। মৃত্যুপুরি থেকে মুক্তি চায় পৃথিবী। সেটা আমেরিকা-চায়না বা, যে কেউই দিক না কেন, মানুষই হাতেই থাকবে সেই চাবি।

লেখক :
সৌরভ প্রিয় পাল,
ছাত্রনেতা।
২৩/০৬/২০২০ ইং