করোনার স্বর্গরাজ্য চট্টগ্রামে ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে ভাইরাসটি

বাংলাদেশ মেইল:: চট্টগ্রামের ৪০ ভাগ মানুষ ই এখন করোনা ভাইরাসে (কোভিড-১৯) আক্রান্ত চিকিৎসক ও  স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের মতে। অর্থাৎ  ৮০ লাখ মানুষের এই জনপদের প্রায় ৩২ লাখ মানুষ এখন করোনায় আক্রান্ত, যা গা শিউরে উঠার মতো হিসাব।

হলিক্রিসেন্ট হাসপাতালে গত ১৮ দিন ধরে চিকিৎসা নিচ্ছেন হাটহাজারীর জনৈক মীর রায়হান (ছদ্মনাম) ।  তাকে সেবা দিতে গিয়ে করোনায় আক্রান্ত  হয়েছেন তার স্ত্রীও৷ স্বামীর পজিটিভ রিপোর্ট চিকিৎসকদের কাছে দিলেও নিজেরটা গোপন রেখেছেন। তিনিই আবার স্বামীর খাবার-দাবার ঔষধ সংগ্রহে যাচ্ছেন নগরীর বিভিন্ন দোকানে।

চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের  সে হিসাব মানার কোন সুযোগ নেই। কারণ শনাক্ত হওয়া করোনা আক্রান্ত সরকারি  তথ্য বলছে ভিন্ন পরিসংখ্যানের কথা  । হিসাবটি তাই মনে মনেই পোষণ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ বিষয়ে চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের জিজ্ঞেস করলেই বলছেন,  ‘অফ দ্য রেকর্ড’।

করোনার উপসর্গ থাকা শর্তেও কোন ধরনের টেস্টের ঝামেলায় যাচ্ছেন এমন রোগী নগরীর ঘরে ঘরে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বরের ঔষধেই তারা সারছেন করোনার চিকিৎসা।

তবে  একটা বিষয় স্বীকার করেন চট্টগ্রামের চিকিৎসা সংশ্লিষ্টরা   । সেটা হল নমুনা পরীক্ষা কম। নমুনা পরীক্ষা বাড়লে আক্রান্ত শনাক্তও বাড়বে। কথাটি সবার আগে স্বীকার করেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন।

যিনি করোনা সংক্রমণের শুরু থেকে রাত-দিন নগরীর অলিগলি ঘুরে বেড়িয়েছেন। সংক্রমণ রোধে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা এবং লকডাউনে মানুষের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন।

নমুনা পরীক্ষা বাড়লে শনাক্তও বাড়বে এমনটা স্বীকার করেন চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বিও। একই কাতারে আছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর, বিআইটিআইডি ল্যাবের প্রধান ডা. শাকিল আহমেদসহ বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরাও।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, চট্টগ্রামে নমুনা পরীক্ষা যারা করছেন তাদের মধ্যে শতকরা ২৮.৩৮ শতাংশের করোনা শনাক্ত হচ্ছেন। এ হার দেশের গড় শনাক্তের হারের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষায় দেশে গড় শনাক্তের হার ছিল ১৮.৫৭ শতাংশ।

শুধু তাই নয়, মৃত্যুতেও এগিয়ে চট্টগ্রাম। যার হার ২.১৪ শতাংশ। অথচ দেশে গড় মৃত্যুর হার ২ জনেরও কম। আবার সুস্থ হয়ে উঠার হারও অনেক কম চট্টগ্রামে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রত্যক্ষ বাস্তবতার বাইরে সরকারি হিসাবেও করোনা ভাইরাসের তীর্থস্থান এখন চট্টগ্রাম।

চট্টগ্রাম মহানগরীর বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, চীনের উহান করোনা ভাইরাসের জন্মস্থান হলেও চট্টগ্রাম এখন তীর্থস্থান। চট্টগ্রামের ৪০ ভাগ মানুষ এখন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। চট্টগ্রামে দিনে সর্বোচ্চ ১ হাজার নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে। দশ হাজারেরও বেশি নমুনার জট পড়েছে। প্রতিদিন ২ হাজারেরও বেশি নমুনা সংগ্রহ হচ্ছে, যা মোটেও পর্যাপ্ত নয়।

তিনি বলেন, করোনা সংক্রমণের শুরুতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা পরিবারের সদস্য ও আত্নীয় স্বজনদের নমুনা পরীক্ষা করা হত। এখন সংস্পর্শে আসা কারো নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে না। তাদের নমুনা পরীক্ষা করা হলে চট্টগ্রামে দিনে ১০ হাজারেরও বেশি নমুনা পরীক্ষা করতে হবে।

এছাড়াও,  সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব না মানা, মাস্ক না পরা, বিনা কারণে বাইরে ঘোরাফেরা, আড্ডা দেয়া, গণপরিবহনসহ সবকিছু উন্মুক্ত হওয়া এবং সর্বোপরি সরকারি নির্দেশনা না মানার প্রবণতার কারণেই চট্টগ্রামের মানুষ করোনায় বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। তেমনি নমুনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার অভাবে করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে চট্টগ্রামে। এভাবে চলতে থাকলে আক্রান্তের হার আরো ঊর্ধ্বমুখী হবে ও বলেন তিনি।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত চট্টগ্রামে ২৬ হাজার ২২৯ জনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এরমধ্যে করোনা শনাক্ত হয়েছে ৭ হাজার ৪৪৬ জনের। শনাক্তের এই হার শতকরা ২৮.৩৮ শতাংশ। বিপরীতে দেশে গড় শনাক্তের হার ১৮.৫৭ শতাংশ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সারাদেশে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৬ লাখ ৮১ হাজার ৪৪৩ জনের। এরমধ্যে শনাক্ত হয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ৬০৬ জনের। শতকরা হিসেবে সনাক্তের এই হার ১৮.৫৭ শতাংশ। এছাড়া সারাদেশে মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ৬২১ জন। মৃত্যুর এ হার ১.২৮ শতাংশ। কিন্তু চট্টগ্রামে আক্রান্তদের মাঝে মৃত্যুর হার ২ শতাংশের বেশি।

২৫শে জুন পর্যন্ত চট্টগ্রামে মৃত্যু হয়েছে ১৬০ জনের। এটি মোট আক্রান্তের ২.১৪ শতাংশ। দেশের গড় মৃত্যুর হার ২ জনের কম। এদিকে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হারে এগিয়ে থাকলেও সুস্থতার হারে পিছিয়ে চট্টগ্রাম। দেশে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন ৫১ হাজার ৪৯৫ জন।