সর্বজনীন নাকি সার্বজনীন মানবাধিকার

বাংলাদেশ মেইল ::  

We Fight, Human Rights কিন্তু বাস্তবে তা কতটুকু।Human Rihgts শব্দটা প্রচুর আলোচিত শব্দ! চারিদিকে শুধু মানবাধিকারের জন্য চিৎকার। কেউ সুবিধাভোগী, কেউ শোষিত,কেউ ব্যবসায়ী এর মধ্যে ঘুরছে মানবাধিকার।কথা কিন্তু একটাই,  মানবাধিকারের সংগ্রাম চলছে,চলবে।কাগজে কলমে অর্থ ঠিক থাকলে প্রয়োগে যেন বিশাল বৈষম্য। অথচ আমার কেমন অধিকার চা?সর্বজনীন নাকি আত্মকেন্দ্রিক ! একটু আলোকপাত করা যাক।
মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক প্রতীক হলো
মানব পরিবারের সকল সদস্যের জন্য সর্বজনীন, সহজাত, অহস্তান্তরযোগ্য এবং অলঙ্ঘনীয় অধিকার। মানবাধিকার জন্মগত ও অবিচ্ছেদ্য বটে তবে চর্চা করতে গিয়ে অন্যের ক্ষতিসাধন ও প্রশান্তি বিনষ্টের কারন হওয়া যাবেনা।এই অধিকার সমানভাবে প্রযোজ্য সবার ক্ষেত্রে। স্থানীয়, জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম দায়িত্ব হল এসব অধিকার রক্ষণাবেক্ষণ করা।যদিও অধিকার বলতে প্রকৃতপক্ষে কি বোঝানো হয় তা এখন পর্যন্ত একটি দর্শনগত বিতর্কের বিষয়। কারন প্রতিনিয়ত বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার চরমভাবে উপেক্ষিত ও লংঘিত।পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রযন্ত্র যদি অধিকার রক্ষায় সোচ্চার না হয়,তাহলে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কি বা আশা করবেন।শুধু সংজ্ঞার পর সংজ্ঞা ছাড়া!?
মানবাধিকারের সংজ্ঞায় দেখা যায়,
কতগুলো সংবিধিবদ্ধ আইন বা নিয়মের সমষ্টি, যা মানবের আচার আচরণ ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যকে বুঝায় এবং যা স্থানীয় ও আর্ন্তজাতিক আইন সমষ্টি দ্বারা সুরক্ষিত যা মৌলিক অধিকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ বিষয় হিসেবে ধর্তব্য।অন্যদিকে,,,,
জাতিসংঘে Universal Declaration of Human Rights এর ১ম অনুচ্ছেদে লেখা রয়েছে যে,
All human beings are born free and equal in dignity and rights.
অর্থাৎ ‘জন্মগতভাবে সকল মানুষ স্বাধীন এবং সমান সম্মান ও মর্যাদা অধিকারের কথাটা মুখ্য হলেও দুর্বল জাতিগুলোর ক্ষমতাধরদের আচরণ আজকাল মানবাধিকারকে একটি উপহাসের বস্তুতে পরিণত করেছেও বটে। তবে ক্রমবিকাশ থেমে থাকেনি।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে ৪৭ টি অনুচ্ছেদ নিয়ে হয়রত মুহাম্মদ মোস্তফা(সঃ) মদিনা সনদ এর মাধ্যমে প্রথম মানবাধিকারের ভিত্তি প্রতিষ্টা করেছিলেন। যেই সনদকে পৃথিবীর প্রথম পূর্ণাঙ্গ Written Constitution বা লিখিত সংবিধান হিসাবেই ধরা হয়।যেখানে সুস্পষ্টভাবে জাতি গঠন,সব সম্প্রদায়ের সমান অধিকার,পূর্নাঙ্গ ধর্মীয় অধিকার,খুন ধর্ষন রাহাজানি বন্ধ,ব্যাক্তিগত অপরাধকে জাতিগত না নেওয়া,আইনের সমান প্রয়োগসহ পূর্ণ রাষ্ট্রীয় সার্বজনীন নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে।যার ৪৭ অনুচ্ছেদ এর মাধ্যমে পূর্নাঙ্গ মানবাধিকারকে প্রতিষ্টিত করার যে রুপরেখা তা এখনও বিরল।যদিও সভ্যতার ক্রমবিকাশে আরও অনেক ধরনের সম্পাদনার মাধ্যমে মানবাধিকারকে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল।তার মধ্যে অন্যতম ছিল ৫৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে”সাইরাস সিল্ডিডার সম্পাদনা” পারস্যের রাজা দ্বিতীয় সাইরাস যিনি সাইরাস দ্য গ্রেট’নামে সমধিক পরিচিত। ব্যাবিলন আক্রমণের মধ্য দিয়ে ব্যাবিলনীয়দের দ্বারা নির্যাতিত দাস জনগোষ্ঠীকে মুক্ত ও নিজ নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনেরও ব্যবস্থা করে দেন। অতঃপর তার নির্দেশে একটি সিলিন্ডার তৈরি করা হয়। যা সাইরাস সিলিন্ডার নামে অভিহিত। এতে সাম্রাজ্যজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সহিষ্ণুতা ও মানবাধিকার বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।কিছু বিশেষজ্ঞদের দাবি, এটিই বিশ্বের প্রথম মানবাধিকার সনদ।ক্রমান্বয়ে ম্যাগনা কার্টা সম্পাদনের মাধ্যমেও মানবাধিকার রক্ষায় একটি মাইলফলক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।এটি ছিলো মূলতঃ ইংল্যান্ডের রাজা জন ও ধনী বিত্তশালী ব্যারনদের মধ্যে ১২১৫ সালে সম্পাদিত একটি চুক্তি,যেখানে বলা হয়েছে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাউন্সিলের পূর্ব অনুমতি ব্যতিরেকে খামখেয়ালীভাবে জনগণের উপর কর আরোপ করা যাবেনা।

রাজকর্মকর্তাদের জোর করে ভূ-সম্পত্তি অধিগ্রহণে নিবারণ,ব্যাবসায়ীদের ইচ্ছেমত বিচরণ,ইচ্ছেমত গ্রেপ্তার, কারারুদ্ধকরণ, সম্পত্তিচ্যুত, দীপান্তরিত বা নির্বাসিত কিংবা হয়রানির শিকার করা যাবে না।এর মাধ্যমে সংসদীয় গনতান্ত্রিক পথেরও সুচনা হয়েছিল, সার্বজনীন অধিকার নিশ্চিত কল্পে।

অপরদিকে ১৬শ শতকে বৃটিশ জনগনের আন্দোলনের ফলে পিটিশন অব রাইটস সম্পাদনাও ছিল একটি অনন্য দলিল,যা অনেক ক্ষেত্রে জনগনকে সুরক্ষা প্রদান করেছিল।।এছাড়া ১৬৮৯ সালে মানবাধিকার রক্ষায় বিল অব রাইটস ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গৃহীত হয় যা মৌলিক অধিকার আদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

এভাবে মানবাধিকার প্রতিষ্টায় ধাপে ধাপে বিভিন্ন দেশ, গোষ্টি তাদের স্ব স্ব নীতি গ্রহন করলেও বিশ্বের অন্যান্য জাতির মত আমরা বাংঙ্গালী জাতি ছিলাম চরম অবহেলিত নিষ্পেষিত, শোষিত,নির্যাতিত। বৃটিশের শাসন,পাকিস্তানের শোষণে এক সময় আমরা চরম অমানবিক মানবাধিকারে জর্জরিত।অধিকার আদায় করতে গিয়ে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন,পাকিস্হানের বিরুদ্ধে স্বাধিকারের আন্দোলন করা ছাড়া কোন বিকল্প ছিল না।আমরা এমন একটা জাতি যাঁদেরকে নিজের ভাষার অধিকারের জন্য ৫২ এর ভাষা আন্দোলন করতে হয়েছে।সালাম,রফিক,জব্বার,বরকত এর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত অধিকারে মহান ২১ শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসাবে স্বীকৃত ।

এরপর শুরু করতে হল স্বাধীনতার অধিকারের আন্দোলন।১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর সমস্ত অধিকার ভোগের মার্যাদা প্রতিষ্টায় পায় বাংঙ্গালী জাতির।সেই অধিকারকে পূর্ণাঙ্গ রুপ দিতে প্রিয় বাংলাদেশ  ১৯৭২ সালে সংবিধান রচনার মাধ্যমে সংবিধানের ৩য় ধাপে মানবাধিকারকে স্বীকৃতি দিয়ে কালজয়ী অধ্যায় রচিত হলেও প্রকৃতপক্ষে মানবাধিকার নিয়ে অনেক প্রশ্ন,বির্তক আছে।কথিত মতে এদেশে মানবাধিকার চর্চা,প্রয়োগ করা হয় ব্যাক্তি,পরিবার, গোষ্টী কিংবা রাজনৈতিক মতার্দশ অথবা নানা দৃষ্টিকোণ এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে!যা নিয়ে আর্ন্তজাতিকভাবে অনেক বিবৃতির মাধ্যমেও বলা হয়ে থাকে,তারপরও যে সরকার আসুক না কেন তারা নিজেদের পক্ষে সাফাই গেয়ে যায় অনবরত,যেন মানবাধিকার রক্ষায় তারা যথেষ্ট তৎপর,তা কাগজে কলামে সীমাবদ্ধ এবং বিভিন্ন ম্যারপ্যাঁচে।

একেক সময় একেক সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যাকৃত বর্ণিত ও প্রনীত তথা প্রকাশিত।কতটা আমরা স্বাধ কতটা আমরা স্বাধীনতাভাবে মত প্রকাশ করতে পারি,কতটা তা গ্রহনযোগ্য সেটা সব সময় প্রশ্নবিদ্ধ।তারপরেও আমাদের রয়েছে মানবাধিকার কমিশন,সেটাও কম কিসে।

অন্যদিকে স্ব স্ব ধর্মে মানবাধিকার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।প্রতিটি ধর্মের মুল কথা হলো আমার মতে মানবতা,মানবিকতা,মুনষ্যত্ববোধে মুল্যবোধকে প্রতিষ্টা করা যেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং হিংসাকে নির্মুল করার কথা দৃঢভাবেও বলা আছে অথচ আমরা কি সেই অধিকার ভোগ করতে পারছি!বেশীদুর যেতে হয়না,আশে পাশের রাষ্ট ও তার সরকারের চরিত্রকে বিবেকবোধ থেকে উপলদ্বী করলে বুঝা যায়,জাতিগত ও ধর্মীয়ভাবেও কতটা নির্যাতিত,সেই দিকে আমাদের প্রিয় ভুমি বাংলাদেশ সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে।মহামানব হযরত মুহাম্মদ(সঃ)এর বিদায় হজ্জ্বের ভাষণকে মানবাধিকার রক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় দৃষ্টান্ত হিসাবে এখনও বলা হয়।অন্য ধর্মের না জানলেও তাদের ধর্মের কথাকে আমি ছোট করে কিংবা অস্মান করে দেখিনা।কারও মতবাদ আমার মতবাদের সাথে না মিলতে পারে কিংবা অন্যের মতবাদকে অসম্মান করার শিক্ষা আমার ধর্মে নেই।এটাই বড় অধিকার।

মুলকথা হলো”সর্বজননী নাকি সার্বজনীন মানবাধিকার!তবে আমরা সর্বজনীন এবং সার্বজনীনকে গুলিয়ে ফেলি।সর্বজনীন এবং সার্বজনীন দুটিই শুদ্ধ শব্দ, তবে অর্থ ভিন্ন বিধায় অভিন্ন অর্থে ব্যবহার করাটা সমীচীন নহে। সর্বজনীনকে সার্বজনীন হিসাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই।দুটি শব্দের আভিধানিক অর্থের দিকে তাকালে দেয়া যায়”সর্বজননী শব্দ টা সকলের মঙ্গল হিতকরণ কিংবা সকলের তরে সকলে আমরা,প্রত্যেকে মোরা পরের তরে বুঝায়।সেই ক্ষেত্রে মানবাধিকার সর্বজননী অধিকার হিসাবে স্বীকৃত।অন্যদিকে”সার্বজনীন বলতে বুঝানো হয় সবার মধ্যে প্রবীন বা সবার মধ্যে শ্রেষ্ঠ।

যেমন”নেলসন মেন্ডেলা! তিনি দক্ষিণ আফ্রিকারতো বটেই বিশ্বের মধ্যে প্রবীন ও অন্যতম একজন নেতা। সার্বজনীন ইতিহাস বর্ণনা করলে তাঁর ইতিহাস ব্যাক্তিক্রম শ্রেষ্টত্বের বর্ণনা পাওয়া যায়। অন্যদিকে আমাদের হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাসীরা”দূর্গাপুঁজার ক্ষেত্রে”সার্বজনীন দূর্গাপুঁজায়”আপনাকে স্বাগতম জানায়।তারা বুঝাতে চায় তাদের পুঁজার মধ্যে শ্রেষ্ট হল দূর্গাপুঁজা।

সুতরাং সবার হিতের জন্যে অর্থে সবার মধ্যে শ্রেষ্টকে বা প্রবীনকে শ্রেষ্ট বলা বিধেয় নয়।সর্বজনীন অর্থে সার্বজনীনকে গুলিয়ে ফেলার ফলে আমরা দিন দিন মানবাধিকারকে পদদলিত করছি।আমাকে শ্রেষ্ট হিসাবে গন্য করতে আমার আমিত্বকে জাহির করতে নিজেকে সার্বজনীন মনে করলে তিনি কখনো সর্বজননী মঙ্গলে নিজেকে মেলে ধরতে পারবেনা। মনে রাখতে হবে আপনি তখনই সার্বজনীন একজন হবেন যখন আপনার কর্মগুনে সর্বজননী অধিকার নিশ্চিত করার কাজ করবেন।সর্বজননী অধিকার নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে জনগনই আপনাকে সার্বজনীন হিসাবে স্বীকৃত দিবে, যা কোন দলীয় লেজুড়বৃত্তি রাজনীতির চামচামির ভাষা দিয়ে নয়,সত্যিকারের ভালবাসায়।আসুন সর্বজননী অধিকারে কাজ করি, মানবাধিকারকে নিশ্চিত করি,সার্বজনীন প্রমানে নিজের শ্রেষ্ট মুল্যবোধের মাধ্যমে,যা মৌলিক অধিকারকে সম্মুত রাখবে,তবেই সত্যিকারের মানবাধিকারে সুফল পাবে দেশ তো বটেই,সমগ্র বিশ্ব।

লেখক : এডভোকেট জেড. এম. হাসান দ্দৌলা মিনার