বৈরুত বিস্ফোরণের জন্য দায়ী অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট আসলে কী?

বাংলাদেশ মেইল ::

মঙ্গলবার লেবাননের রাজধানী বৈরুত যেই শক্তিশালী বিস্ফোরণে কেঁপে উঠলো, তার জন্য বন্দরে সংরক্ষিত কয়েক হাজার টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটকে দায়ী করছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা। এখন পর্যন্ত ওই বিস্ফোরণের কারণে ১৩০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহত হয়েছেন ৪ হাজার জন। প্রায় ৩ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মূলত কৃষি জমিতে সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া খনিতে এই রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় পাথর ভাঙ্গতে। এছাড়া এর সামরিক ব্যবহারও আছে কিছু।
এর আগেও বহু শিল্প দুর্ঘটনার কারণ ছিল অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট। সন্ত্রাসবাদেও ব্যবহৃত হয়েছে। ১৯৯৫ সালে ওকলাহোমা সিটির আলফ্রেড পি. মুরে ফেডারেল বিল্ডিং উড়িয়ে দিতে এই রাসায়নিক ব্যবহার করেছিল শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদীরা।
৪ঠা আগস্ট বৈরুতের ওই বিস্ফোরণের বেশ কয়েকটি ভিডিও অনলাইনে এসেছে।

এতে দেখা গেছে ভয়ানক গতির এক বিস্ফোরণ। গুদাম থেকে সাদা ধোয়া হঠাৎ করেই কালো-লাল বিস্ফোরণের সৃষ্টি করে। তার চেয়েও বড় আকারে পানির বাস্প ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। কেঁপে উঠে পুরো শহর। তীব্র বাতাসের ঝটকায় বহু দূরের বাড়িঘরের কাঁচ ভেঙ্গে যায়। এমনকি ভিডিও ক্যামেরা পর্যন্ত মানুষের হাত থেকে পড়ে যেতে দেখা গেছে।
লেবানিজ সরকার বলছে বৈরুতের উপকূলে এক গুদামে ২৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট সার রাখা ছিল। সেখানেই আগুণ ধরে যায়, যা পরে বিস্ফোরিত হয়। প্রায় ৬ বছর আগে রাশিয়ান মালিকানাধীন একটি কার্গো জাহাজে করে এসেছিল এই সার। বন্দর কর্মকর্তারা বলেন, তারা অনেকদিন ধরেই আদালতে আবেদন করেছেন যেন এই মজুত সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে এতদিন কেউই ব্যবস্থা নেয়নি।
অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট নিজে তেমন ক্ষতিকর কিছু নয়। কিন্তু যদি আগুণের সংস্পর্শে আসে বা প্রচণ্ড তাপ ও চাপের মধ্যে থাকে, তাহলে এটি বিস্ফোরিত হতে পারে। বৈরুতের ক্ষেত্রে ঠিক কী হয়েছিল তা এখনও সম্পূর্ণ জানা না গেলেও, এটি বোঝা যায় সেখানে এত বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক এমনিতেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। এই পরিমাণ সারে যদি আগুণ লাগে, আর তা যদি রাখা থাকে গুদামের মতো নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে, তাহলে বিস্ফোরণের সম্ভাবনা বেশ জোরালো।

আগেও বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এমনটা ঘটেছে। ১৯৪৭ সালে টেক্সাস সিটিতে অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট বহনকারী দু’টি কার্গো জাহাজে আগুণ লাগলে ৫৮১ জন নিহত হয়, আহত হয় ৩৫০০ জন। ২০১৩ সালে টেক্সাসের একটি সার কারখানায় আগুণ লাগলে বিস্ফোরিত হয়। নিহত হয় ১৫ জন। ২০১৫ সালে চীনের তিয়ানজিনে এক সার বিস্ফোরণে একটি ব্যস্ত সমুদ্র বন্দরে ১৬৫ জন মানুষ নিহত হয়।
আমেরিকায় বহু মানুষ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের ভয়াবহতার সঙ্গে পরিচিত হয় ১৯৯৫ সালে। সেই বছর ওকলাহোমা সিটির আলফ্রেড পি মুরাহ ফেডারেল বিল্ডিং উড়িয়ে দিতে এই রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা। এই ২ টন অ্যামোনিয়া নাইট্রেটের সঙ্গে ডিজেল মিশিয়ে বোমা তৈরি করে ভাড়া করা ট্রাক রেখে আসা হয় ভবনের মুখে।
বৈরুতের এই বিস্ফোরণ সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অপারমানবিক বিস্ফোরণ। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ক্রাইসিস রেসপন্স টিমের প্রধান বিস্ফোরণ তদন্তকারী ব্রায়ান কাস্টনার বলেন, “কয়েক দশকের মধ্যে শহুরে এলাকায় এর চেয়ে বড় বিস্ফোরণের ঘটনা কখনও কোথাও ঘটেনি। কয়েক ডজন কিলোমিটার দূরেও মানুষ এই বিস্ফোরণ টের পেয়েছে।”
আমেরিকার সামরিক বাহিনী বিস্ফোরণের তীব্রতা মাপতে একটি সূত্র ব্যবহার করে। সেই সূত্র অনুযায়ী, ২৭৫০ টন সার মূলত ১১৫৫ টন টিএনটি’র সমান, যা ৮০০ ফিটের মধ্যে বেশিরভাগ ভবন ধ্বংস করার মতো শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটাতে সক্ষম। এই ধরণের বিস্ফোরণে ১.২৫ মাইলের মধ্যে সকল গ্লাস ভেঙ্গে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছে থাকা সবচেয়ে আকাশ থেকে নিক্ষেপযোগ্য যেকোনো বোমার চেয়েও এই বিস্ফোরণ অনেক বেশি শক্তিশালী। এই বোমার নাম জিবিইউ ৪৩ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট। এটি ২০১৭ সালে প্রথম ব্যবহৃত হয়। এই বোমা হলো মাত্র ৯.৩৫ টন টিএনটির সমান, যেখানে বৈরুতের বিস্ফোরণের মাত্রা আনুমানিক ১১৫৫ টন। আবার এই বিস্ফোরণ সবচেয়ে ছোট পারমাণবিক বোমার তুলনায়ও কিছু নয়। কোনো যুদ্ধে ব্যবহৃত সবচেয়ে ছোট পারমাণবিক বোমাটি ৭৫ বছর আগে হিরোশিমায় নিক্ষেপ করা হয়। সেটির মাত্রা ছিল ১৫০০০ টন টিএনটি।