মধ্যপ্রাচ্যকে পাল্টে দিয়েছে ইসরাইল-আমিরাত চুক্তি

বাংলাদেশ মেইল ::

গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজ এক ঘোষণায় জানায়, ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ঐতিহাসিক এক চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। চুক্তি অনুসারে, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে তোলার ঘোষণা দিয়েছে ফিলিস্তিনিদের দীর্ঘদিনের মিত্র আরব আমিরাত। খুব শিগগিরই হোয়াইট হাউজে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আওতায়, ইসরাইল ও আমিরাতের মধ্যে দূতাবাস স্থাপন; বাণিজ্য ও প্রযুক্তি বিনিময়; সরাসরি ফ্লাইট চালু; পর্যটন চালু; জ্বালানি, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়সহ কূটনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে চলেছে। পুরো বিশ্বের জন্যই চুক্তির ঘোষণাটি বিস্ময়কর ছিল। এই চুক্তির মধ্যস্ততা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প।

চুক্তির ঘোষণার পরপরই তেল আবিবে ইসরাইল ও আরব আমিরাতের পতাকা পাশাপাশি উত্থিত হয়। আবু ধাবির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদকে ইসরাইলে সফরের আমন্ত্রণ জানান ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট রয়ভেন রিভলিন।
চুক্তিটি ঘিরে সব তথ্য এখনো পরিষ্কার নয়। হোয়াইট হাউজ চুক্তিটিকে ‘আল আকসা মসজিদের শান্তিতে নামাজ আদায়ে ইচ্ছুক মুসলিমদের জন্য এক বড় সাফল্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

কারণ, তারা এখন আবু ধাবি থেকে সরাসরি তেল আবিবে যাতায়াত করতে পারবে। হোয়াইট হাউজ আরো দাবি করে, সেখানে তাদের সাদরে স্বাগতম জানানো হবে। কিন্তু ইসরাইল তাদের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলোর মুসলিমদের বিশাল সংখ্যায় ভিসা দেবে এমনটা ভাবা নিছকই দিবাস্বপ্নের মতো। সাংবাদিকদের দেওয়া এক বক্তব্যে ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জারেড কুশনার প্রত্যাশা প্রকাশ করেন, ইসরাইল-আমিরাত ফলে জিহাদি চরমপন্থাও কমবে। তবে আদতে তা ঘটার সম্ভাবনা কম।

ইসরাইল-আমিরাত চুক্তিটিকে ডাকা হচ্ছে ‘আব্রাহাম একর্ডস’ নামে। এই চুক্তির মাধ্যমে, আমিরাতের কাছ থেকে স্বীকৃতি পেল ইসরাইল। ২১টি আরব রাষ্ট্রের মধ্যে তৃতীয় দেশ হিসেবে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিয়েছে আমিরাত। এর আগে ১৯৭৯ সালে মিসরের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে ইসরাইল। দ্বিতীয় চুক্তিটি হয়েছিল জর্ডানের সঙ্গে, ১৯৯৪ সালে। আমিরাতের সঙ্গে সাম্প্রতিক চুক্তিটি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য এক বড় কূটনৈতিক সাফল্য। দুজনই নিজদেশে ব্যাপক কঠিন সময় পার করছেন। নেতানিয়াহু দুর্নীতি মামলার সম্মুখীন ও ট্রাম্প করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯)-সহ নানা ইস্যু সামলানোয় ব্যর্থতার। যুক্তরাষ্ট্রে চুক্তিটি বিরোধীদের কাছ থেকেও প্রশংসিত হয়েছে। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পের ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেন বলেছেন, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে বিভাজন দূর করার পথে ঐতিহাসিক এক পদক্ষেপ। তিনি চুক্তিটি করার জন্য আমিরাতেরও প্রশংসা করেন।

কিন্তু চুক্তিটি ফিলিস্তিনিদের দাবির প্রতি কোনো সম্মান প্রদর্শন করে না। অসলো চুক্তির পর ২৫ বছরের বেশি সময় পার হয়ে গেছে, তবু আজ অবধি ফিলিস্তিনিরা সে চুক্তির ফল হাতে পায়নি। তাদের প্রত্যাশিত রাষ্ট্র বা শান্তি দুটোই তাদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত দূরে সরে যাচ্ছে। বহুবছর মধ্যপ্রাচ্যের নীতিমালা নির্ধারণ করে এসেছে ফিলিস্তিনিদের দাবি। কিন্তু এখন, তাদের দাবি আর অগ্রাধিকার পাচ্ছে না। অঞ্চলটির নতুন রাজনৈতিক স্রোতে তারা দিনদিন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে যেন। তাদের মিত্ররা তাদের পাশ থেকে সরে যাচ্ছে। ব্রুকিং ইন্সটিটিউশনের সেন্টার ফর মিডল ইস্ট পলিসি’র পরিচালক নাটান সাক্স বলেন, ইসরাইলি-ফিলিস্তিনি সংঘাত এখন অঞ্চলটির নেতাদের কাছে গুরুত্ব হারাচ্ছে। এই চুক্তি ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব ও তাদের আন্দোলন নিয়ে আরব বিশ্বের, বিশেষ করে সৌদি আরব ও আমিরাতের কিছু নেতাদের ক্লান্তি ফুটিয়ে তুলেছে। তারা ‘ফিলিস্তিনিদের প্রত্যাখ্যান’ নিয়ে আটকে থাকতে চায় না।
মধ্যপ্রাচ্যের মূল ফাটলও এখন আরব-ইসরাইল সংঘাত থেকে সরে আরব-ইরান সংঘাতে পরিণত হয়েছে। স্থান পাল্টেছে শত্রুতা, একইসঙ্গে পাল্টেছে কূটনৈতিক উদ্যম। যেমনটা প্রবাদে আছে- তোমার শত্রুর শত্রু হচ্ছে তোমার বন্ধু- আরব বিশ্বও এখন তেমনভাবে ইরানের শত্রু ইসরাইলের দিকে ঝুঁকছে। হয়তো ইসরাইল-আমিরাত চুক্তিটি অঞ্চলে ইরান-বিরোধী ব্লক তৈরির ইঙ্গিত। খুব শিগগির হয়তো এই ব্লকে আরো রাষ্ট্র যোগ দেবে। ইসরাইল ইতিমধ্যে প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে যে, ওমান ও বাহরাইন তাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও প্রত্যাশা করেছেন যে, অন্যান্য আরব রাষ্ট্রও ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে এগিয়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্য শান্তিচুক্তির তত্ত্ববধানে থাকা কুশনার বলেছেন, আমিরাতের জায়গায় প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে পারেনি বলে কিছু রাষ্ট্র হতাশা প্রকাশ করেছে। এর ইঙ্গিতও মিলেছে, ইসরাইলের সঙ্গে চুক্তি করায় আমিরাতকে তাৎক্ষণিকভাবে অভিনন্দন জানিয়েছে বাহরাইন। মরোক্কোর সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক রয়েছে বলে বহুদিন ধরেই জল্পনা চলছে। ২০১৮ সালে ওমানের সুলতান নেতানিয়াহুকে দেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। গত শতকের শেষের দিকে ইসরাইলকে সাময়িকভাবে অফিস খুলতে অনুমতি দিয়েছিল কাতার। যদিও ফিলিস্তিনিদের আর্থিকভাবে সহায়তা করে আসছে দেশটি।

আমিরাতের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক স্বিকৃতী পাওয়ার বদলে পশ্চিম তীর অধিগ্রহণ স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন নেতানিয়াহু। নেতানিয়াহুর ক্ষমতায় ফেরত আসার অন্যতম প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল এই অধিগ্রহণ। তবে হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, আমিরাতকে পাশে পাবার পর এখন অন্যান্য আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নতির দিকে মনোনিবেশ করবে নেতানিয়াহু সরকার। অন্যদিকে, আমিরাতের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আনোয়ার গার্গশ জানান, তাদের উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিম তীর অধিগ্রহণ বন্ধ করা ও ইসরাইলি-ফিলিস্তিনি শান্তি প্রক্রিয়ায় ‘মৃত্যুঘাত’ ঠেকানো। তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের মর্যাদা ও সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি ব্যবহার করে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের জন্য হুমকিস্বরূপ একটি টাইম বোমা পরাস্ত করার চেষ্টা করছে। কিন্তু কট্টরপন্থি নেতানিয়াহু জানান, তিনি অধিগ্রহণের চিন্তা পুরোপুরি ফেলে দেননি। তিনি বলেন, আমি সার্বভৌমতা নিশ্চিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। পশ্চিম তীরের অংশবিশেষ অধিগ্রহণের পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে জানান তিনি। বলেন, আমি বসতি স্থাপনে হাল ছেড়ে দেইনি।

ইসরাইলের সঙ্গে আমিরাতের চুক্তি নিয়ে ফিলিস্তিনিদের অবস্থান হচ্ছে, তাদের সঙ্গে চরম প্রতারণা করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব চুক্তিটির তীব্র সমালোচনা করেছে। তারা বলেছেন, এটি ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে আগ্রাসন। আমিরাত থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। তাৎক্ষণিকভাবে আরব লীগের একটি জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছেন। এক বিবৃতিতে ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব জানিয়েছে, আমরা নিশ্চিত করছি যে, সংযুক্ত আরব আমিরাত বা অন্যকোনো গোষ্ঠীর ফিলিস্তিনি জনগণের হয়ে কথা বলার অধিকার নেই। এক টুইটে শীর্ষ ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদ হানান আশরাওয়ি তিক্ততা নিয়ে লিখেন, আপনাদের বন্ধুরা যেন আপনাদের কখনো বিকিয়ে না দেয়।
ইসরাইল ও মিসরে দায়িত্ব পালনকারী সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল কার্টজার দ্য নিউ ইয়র্কারকে বলেন, আমিরাত ফিলিস্তিনিদের পুরোপুরি ফেলে দেয়নি। তারা এই আশা বাদ দিয়েছে যে, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে বাঁচানো সম্ভব।

গাজা ও পশ্চিম তীর- দুটি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডই ২০০৭ সাল থেকে বিরোধী দুই গোষ্ঠী শাসন করে আসছে। গাজা শাসন করছে সশস্ত্র ইসলামিস্ট দল হামাস ও পশ্চিম তীর শাসন করছে পিএলও’র আওতাধীন ফাতাহ। দুই পক্ষকে মিলিত করার বহু চেষ্টা পূর্বে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। ইসরাইলের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য বা সহিষ্ণু শান্তির স্বার্থে আলোচনা প্রায় অসম্ভব প্রতীয়মান হয়েছে। মাহমুদ আব্বাস (৮৪) ২০০৫ সালে চার বছর মেয়াদে পিএলও’র প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর থেকে প্রতিবার নতুন নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। কার্টজার বলেন, এই নেতৃত্ব এখন সংবেদনহীন হয়ে পড়েছে। সৃজনশীল কূটনীতি বা রাজনীতি নেই তাদের। তিনি বলেন, আমি একজন ফিলিস্তিনি হলে আমি আমার নেতাদের প্রতি চরমমাত্রায় হতাশ হয়ে পড়তাম। তারা ভুক্তভোগী হওয়ার ব্যাপারটিকে ইতিবাচক নীতিমালা হিসেবে ব্যবহারে নিদারুনভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের আগে তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ঠিক করতে হবে। এরপর হয়তো আরব বিশ্ব ফের তাদের পাশে এসে দাঁড়াবে।

মিসর বা জর্ডানের সঙ্গে করা চুক্তির তুলনায় আমিরাতের সঙ্গে ইসরাইলের চুক্তিটি ভিন্ন। এটি শান্তির প্রাঙ্গণে মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। সেন্টার ফর মিডল ইস্ট পলিসি’র পরিচালক নাটান সাক্স বলেন, বহু দশক ধরে আন্তর্জাতিক কূটনীতির কাঠামো ছিল ‘ভূখণ্ডের বিনিময়ে শান্তি’। আরবদের সঙ্গে যুদ্ধে ইসরাইল যে ভূখণ্ড দখল করেছিল, আরবদের আগ্রাসন বন্ধের প্রতিশ্রুতিতে তা ফিরিয়ে দেওয়া নিয়েই কাজ চলছিল। নতুন কাঠামো হচ্ছে, ‘শান্তির জন্য শান্তি’। ইসরাইলের ডানপন্থিদের কাছে এ নীতি বেশ জনপ্রিয়। সাক্স বলেন, নতুন এই নীতি কোনো ভূখণ্ড ফিরিয়ে দেওয়ার উপর ভিত্তি করে নয়, আরো আরব ভূখণ্ড অধিগ্রহণের প্রতিশ্রুতি স্থগিত রাখার উপর ভিত্তি করে চলছে। অধিগ্রহণ স্থগিতের বিনিময়ে অনাগ্রাসী ও আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্থাপন অর্জন করছে ইসরাইল।
এই অবস্থায় সবার মনে যে প্রশ্ন ঝুলে আছে সেটা হলো, ইসরাইল এবং প্রভাবশালী, ছোট উপসাগরীয় দেশটির মধ্যকার চুক্তিটি ইরানের সঙ্গে অন্যান্য দেশের উত্তেজনায় কেমন প্রভাব ফেলবে। কার্টজার বলেন, গত ছয় থেকে সাত বছরে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত বদলেছে। আপনি যদি কোনো সাংগঠনিক আইডিয়া চান, যেটা এমন কিছু করতে পারে, তাহলে আপনার ইরান দিয়েই শুরু করা উচিৎ। এজন্যই উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো ইসরাইলের সঙ্গে সহাবস্থান করতে পারছে। ইরানের সঙ্গে লড়াইয়ে একদম সম্মুখভাগে একটি মিত্র পেয়েছে ইসরাইল। আমিরাত থেকে ইরানের দূরত্ব মাত্র ৩০ মাইল।