উত্তর জেলা বিএনপি : বিভক্তি নিরসন, না অন্য কিছু

বাংলাদেশ মেইলঃঃ

৭ বছরের বিভক্তি নিরসন, নাকি নেপথ্যে অন্য কিছু? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁছছেন জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা। দলের আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা হচ্ছে শীঘ্রই, এটি পুরাতন খবর হলেও এর নতুন ডালপালা মেলছে। নাটকীয় কিছু না ঘটলে দলের চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকার উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হচ্ছেন তা অনেকটা নিশ্চিত। এ খবরে দলের বিবদমান দুই গ্রুপের ৭ বছরের বিভক্তি নাটকীয়ভাবে নিরসন হয়ে গেছে। বিবদমান গ্রুপগুলো ইতোমধ্যে দলীয় কার্যালয় ছাড়াও নেতাদের বাসাবাড়িতে একাধিক সভা ও একান্ত বৈঠক করেছেন। তবে খুশিতে নয়, গোলাম আকবর খোন্দকারকে ঠেকাতেই দলের বিবদমান গ্রুপগুলো একাট্টা হয়েছে বলে জানিয়েছে দলের নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র।

সূত্র জানায়, উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক হতে আগ্রহী ছিলেন না গোলাম আকবর খোন্দকার। কেন্দ্র থেকে তাঁকে অনেকটা জোর করে এ পদে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি করে দেওয়া পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল থাকবেন। কিন্তু তাঁর এ দায়িত্ব মেনে নিতে পারছে না বিএনপির বিবদমান গ্রুপ দুটি। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারীরা। এ গ্রুপের সাথে গোলাম আকবর খোন্দকারের অতীত সম্পর্ক কখনো সুখকর ছিল না। স্বাভাবিকভাবে তারা গোলাম আকবর খোন্দকারের আহ্বায়ক হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না। এ কারণে তারা তৎপর হয়ে উঠেছেন বেশি। তারা অতি দ্রুততার সাথে আসলাম চৌধুরীর অনুসারীদের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে মাঠে নামেন। অতীতের সব বিভেদ ভুলে তারা আসলাম চৌধুরীর অনুসারীদের সাথে একাধিক সভা ও বৈঠক করেছেন।

অপরদিকে আসলাম চৌধুরীর অনুসারীদের চাওয়া-পাওয়াও অনেকটা একই। তাদের বক্তব্য, আসলাম চৌধুরী দলের অত্যন্ত ত্যাগী নেতা। দলের আন্দোলন-সংগ্রামে জোরালো ভূমিকার কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে। ইতোমধ্যে তিনি অনেকগুলো মামলায় জামিনে রয়েছেন। জেল থেকে তিনি দ্রুত বের হয়ে আসবেন। সুতরাং তাঁকে জেলে রেখে নতুন কোন আহ্বায়ক কমিটি মেনে নিতে পারছেন না তাঁর অনুসারীরা। এ কারণে তারা গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারীদের সাথে একাট্টা হয়েছেন।

এদিকে একাট্টা হওয়া বিএনপির বিবদমান গ্রুপ দুটি কোনো কারণে গোলাম আকবর খোন্দকারকে ঠেকাতে না পারলে বিকল্প ফর্মূলাও করে রেখেছে বলে জানা গেছে। ফর্মূলাটি হচ্ছে- গোলাম আকবর খোন্দকারকে আহ্বায়ক রেখে উত্তর চট্টগ্রামের সাত উপজেলা থেকে ৭ জন যুগ্ম-আহ্বায়ক এবং একজন সদস্য সচিব করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা। কিন্তু বিষয়টি গোলাম আকবর খোন্দকার কতটুকু মেনে নেবেন তা দেখার বিষয়। কারণ গোলাম আকবর খোন্দকার শুরুতেই কেন্দ্রকে বলে দিয়েছেন তাঁকে আহ্বায়ক করা হলে পূর্ণ ক্ষমতা দিতে হবে। কোনো ধরনের বাধা ছাড়া তিনি স্বাধীনভাবে নতুন কমিটি গঠন করে দায়িত্ব ছাড়বেন। এ কারণে নতুন আহ্বায়ক কমিটিতে কোনো ‘সদস্য সচিব’ এর পদ রাখা যাবে না। কিন্তু বিবদমান গ্রুপগুলো তাঁর ক্ষমতা হ্রাস করতে ৭ জন যুগ্ম আহ্বায়ক ও একজন সদস্য সচিবের পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে এ নিয়ে নতুন করে জটিলতা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি চাকসু ভিপি মো. নাজিম উদ্দিন  বলেন, ‘উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আসলাম চৌধুরী দলের অত্যন্ত ত্যাগী নেতা। দলের আন্দোলন-সংগ্রামে জোরালো ভূমিকার কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে। ইতোমধ্যে তিনি সবগুলো মামলার জামিনে রয়েছেন। জেল থেকে তিনি দ্রুত বের হয়ে আসবেন। সুতরাং তাঁকে জেলে রেখে নতুন কোনো আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা ঠিক হবে না।’

বিএনপি নেতা গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত উত্তর জেলা বিএনপি’র সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘দলের স্বার্থে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। দলের আহ্বায়ক আসলাম চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রয়েছেন। তিনি বের হওয়ার পর আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করলে দল উজ্জ্বীবিত হবে।’

প্রসঙ্গত, ২০১৪ সালে আসলাম চৌধুরীকে আহ্বায়ক ও কাজী আবদুল্লাহ আল হাসানকে সদস্য সচিব করে উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্র। কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার কিছুদিনের মধ্যে দুইজনের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। আলাদাভাবে দলীয় কর্মসূচি পালন করতে থাকেন তারা। এমনকি উত্তর জেলার ৭ উপজেলা ও পৌরসভায় বিএনপির আলাদা কমিটিও ঘোষণা করেন। এ নিয়ে জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। বিএনপির একটি গ্রুপ আসলাম চৌধুরীর সাথে, অপর গ্রুপ কাজী হাসানের সাথে মাঠে সক্রিয় ছিলো। কাজী হাসানের গ্রুপটি মূলত নিয়ন্ত্রণ করেন গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী। এর মধ্যে ২০১৬ সাল থেকে আহ্বায়ক আসলাম চৌধুরী কারাগারে রয়েছেন। সদস্য সচিব কাজী আবদুল্লাহ আল হাসান ২০১৮ সালের ৮ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। এরপরও দুই দলের অনুসারীদের মধ্যে অনৈক্য থেকে যায়। দলীয় কর্মসূচিও পালন হয় আলাদাভাবে। এর আগে কোন্দলের কারণে ২০১৭ সালের ২ মে দলীয় কার্যালয় নাসিমন ভবনের সামনে দলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের কারণে উত্তর জেলা বিএনপির সমাবেশ প- হয়ে যায়। ওই সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। এ ঘটনার ১৫ দিন পর ১৭ মে বিএনপি থেকে বহিষ্কার হন উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব কাজী আবদুল্লাহ আল হাসান। পরে অবশ্য তাঁর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে নেয় কেন্দ্র।