শকুনের চোখ পড়েছে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায়’

বাংলাদেশ মেইলঃঃ

চট্টগ্রামে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত ও দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্তের বাড়ি জাদুঘর করার দাবি জানিয়েছে চট্টগ্রামের সচেতন নাগরিক সমাজ। বুধবার দুপুরে (৬ জানুয়ারি) সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজনের হাতে এ সময় স্মারকলিপিও দেয়া হয়।

সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে এ সময় উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দাশ গুপ্ত, কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন।
এ সময় কবি ও সাংবাদিক আবুল মোমেন স্মারকলিপি পাঠ করেন। এ সময় তিনি বলেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু, লোকমান খান শেরোয়ানী, মাওলানা মোহাম্মদ আলী সহ অসংখ্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পদস্পর্শে ধন্য হয়েছে রহমতগজ্ঞে অবস্থিত ঐতিহাসিক বাড়িটি।
২০১৮ সালের ৯ জুলাই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সভায় মাস্টার দা সূর্যসেনসহ ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সকল স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবীদের স্মৃতি রক্ষার্থে জাদুঘর করার প্রকল্প গৃহীত হয়েছিল। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২৪ নং অনুচ্ছেদের আলোকে বিকৃতি, বিন্যাস ও অপসারণ থেকে রক্ষা করে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এ কারণে ঐতিহাসিক ভবনটিকে জাদুঘর নির্মাণের জন্য এ সময় স্মারকলিপি দেয়া হয়।
স্মারকলিপি গ্রহণ করে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক খোরশেদ আলম সুজন জানান, ঐতিহাসিক এই বাড়িটি শুধু ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ নয়, আগামী প্রজন্মের সাহসী তরুণদের জন্য সাহসী ঠিকানা। এটাকে রক্ষা করা জাতীয় স্বার্থে দরকার। তবে শকুনের দৃষ্টি পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার উপর। অনেক জায়গা রাতের আঁধারে বেদখল হয়ে গেছে। এটাও দখল হয়ে যেত, যদি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর রানা দা যথাসময়ে সেখানে না পৌঁছাতেন।
এ সময় তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীকে আগামীকালের মধ্যে ভবনটি সংরক্ষণ ও জাদুঘর নির্মাণের জন্য আবেদনের প্রেক্ষিতে চিঠি দেয়া হবে। হাইকোর্টের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে সঠিক তদন্ত হওয়া উচিত বলে জানান খোরশেদ আলম সুজন।
এ সময় হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত বলেন, জাতীয় পার্টি আমাদের আন্দোলনের সাথে একাত্মতা পোষণ করেছে। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করে আন্দোলনের সাথে একাত্মতা পোষণ করেন। সেই সাথে শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছেন বলে জানান রানা দাশগুপ্ত।
এ সময় তিনি আরও বলেন, হাইকোর্টে আজকে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে। বিচারপতি সরকারের প্রতি রুল জারি করে “কেন এই ভবনটিকে ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে না ও জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হবে না” জানতে চেয়েছেন।
এ সময় যুদ্ধাপরাধ বিচার ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর আরও বলেন, জে এম সেনের যে ভবনটি, এটির সাথে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশ ভারত থেকে বাংলাদেশের ইতিহাস। একাত্তর এর আগের সময়ের ইতিহাস, সেই ইতিহাস বিজড়িত স্থানটিকে সরকার রক্ষা করুক। বিষয়টি যেহেতু অর্পিত সম্পত্তিতে পরে, সেহেতু সম্পত্তির যদি কোনো দাবিদার না থাকে, সরকার এই সম্পত্তি নিজের কাছে রাখতে পারবে।
সরকার দ্রুত ঐতিহাসিক এই ভবনটিকে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করুক, এটি আমাদের দাবি, বলেন রানা দাশগুপ্ত।
জানা যায়, ভারতীয় কংগ্রেসের নেতা যাত্রা মোহন সেনগুপ্ত এই বাড়িটি নির্মাণ করেছিলেন। তার ছেলে দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত। ব্যারিস্টার যতীন্দ্রমোহন ছিলেন সর্ব ভারতীয় কংগ্রেসের নেতা। তিনি কলকাতার মেয়রও ছিলেন। মহাত্মা গান্ধী, সুভাষ চন্দ্র বসু, শরৎ বসু, মোহাম্মদ আলীসহ কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা এই বাড়িতে এসেছেন। এটি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত ভবন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবীরা এই বাড়িতে আসতেন। সূর্য সেন, অনন্ত সিংহ, অম্বিকা চক্রবর্তীর হয়ে মামলা লড়েছিলেন যতীন্দ্রমোহন। তার ইংরেজ স্ত্রী নেলী সেনগুপ্তা ১৯৭০ সাল পর্যন্ত এই বাড়িতে ছিলেন।
ঐতিহাসিক আড়াইশ বছরের পুরনো ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ঐতিহাসিক নিদর্শন এই ভবনের সামনের অংশ সোমবার (৪ জানুয়ারি) নিজের দাবি করে বুলডোজার দিয়ে আঘাত করে ভাঙচুর করেন ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী নামের এক ব্যক্তি।