ক্যাপিটল হিলে আক্রমণকে ‘ওয়ার্ল্ড মাস্টারপিস’ বলে প্রচার চীনা গণমাধ্যমের

বাংলাদেশ মেইল ::

চীনের টুইটার হিসেবে পরিচিত ওয়েইবোতে ট্রেন্ডিং চলছে ‘বিউটিফুল সাইট টু বিহোল্ড’ বা কি সুন্দর দৃশ্য বাক্যাংশটি। গত ৭ই জানুয়ারি থেকে ট্রেন্ডিং হওয়া এই বাক্যাংশটি প্রথমে ব্যবহার করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি। ২০১৯ সালের জুনে হংকংয়ে হওয়া বিক্ষোভকে বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি এই বাক্যাংশটি ব্যবহার করেছিলেন।

এবার চীনের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস হংকং বিক্ষোভ এবং গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে হওয়া হামলার সাদৃশ্য প্রকাশ করেছে। উভয় ঘটনার তুলনামূলক চিত্র পাশাপাশি জুড়ে দেয়া হয়েছে। এতে হংকংয়ের বিক্ষোভকারীরা যেভাবে আইনসভা দখলের চেষ্টা করেছিল তারসঙ্গে ক্যাপিটল হিল হামলার তুলনা করা হয়েছে। চীনের কমিউনিস্ট ইয়োথ লীগের সদস্যরাও ক্যাপিটল হিলের হামলার ছবির সঙ্গে একই ক্যাপশন জুড়ে দিচ্ছে। তারা একে বলছে ‘ওয়ার্ল্ড মাস্টারপিস’।

এই ওয়েইবো পোস্টগুলোতে হাজার হাজার মানুষের কমেন্ট পড়ছে, হাজারো মানুষ তা শেয়ার করছেন।
গত বছর কোভিড-১৯ যখন চীনের অর্থনীতিতে আঘাত হেনেছিল, তখন দেশটির পুরো একটি প্রজন্ম বিদেশি রাষ্ট্রগুলোকে ঘৃণা করতে শিখে গেছে। দেশটির সরকারও নাগরিকদের জাতীয়তাবাদ শক্ত করতে প্রচার চালিয়ে গেছে। এখন সপ্তাহে সাতদিন ২৪ ঘন্টা করে বিভিন্ন কন্টেন্ট সরকারের এই প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে দেশটির বিরোধী মতগুলোও আর টিকতে পারছে না। যখন বিদেশি গণমাধ্যমগুলো চীনের সমস্যা নিয়ে লেখে তখন তাকে বলা হয় শত্রু বিদেশি শক্তি। আর এখন যখন যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রে আঘাত লেগেছে তখন চীনা নাগরিকরা তা উদযাপন করছেন। সাংবাদিকদের ওপরও এই উদযাপনকে আরো পুষ্ট করতে আর্টিকেল লেখার নির্দেশনা রয়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘটনা কীভাবে লিখতে হবে তার একটা নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। তাদের বলা হয়েছে, ওইদিনের ঘটনার কারণে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি কীভাবে নষ্ট হয়েছে তা নিয়ে আর্টিকেল লিখতে। একইসঙ্গে প্রতিবেদনে থাকতে হবে, কীভাবে বিশ্বনেতারা ওই ঘটনায় হতভম্ব হয়ে গেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতা রাখা নিয়ে শঙ্কিত বোধ করছেন। একইসঙ্গে গণতন্ত্র রক্ষায় শিক্ষার গুরুত্বও বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে বিভিন্ন আর্টিকেলে যাতে মানুষ মনে করে, চীনের বর্তমান শিক্ষার হার গণতন্ত্রের জন্য উপযুক্ত নয়।

৭ই জানুয়ারি ফিনিক্স মিডিয়া এমন একটি আর্টিকেল প্রকাশ করেছে যাতে বলা হয়েছে, কীভাবে ডনাল্ড ট্রাম্পকে টুইটার, ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মতো পশ্চিমা রাষ্ট্রেও মানুষের বাক স্বাধীনতা নেই। এই ধরণের আলোচনা এর আগেও চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে করা হয়েছিল। এগুলোতে শক্তি যোগায় চীনের কমিউনিস্ট পার্টিপন্থী ব্লোগাররা। চীনের নাগরিকদের একটি বড় অংশই মনে করেন যে, পশ্চিমা দেশগুলোতে আসলে বাক স্বাধীনতা বলতে কিছু নেই। তাই যখন পশ্চিমা দেশগুলো চীনের খবরদারি নিয়ে কথা বলে তখন চীনা নাগরিকরা একে পশ্চিমাদের দ্বিমুখী নীতি মনে করে।

এ নিয়ে চীনা সাংবাদিকরাও উদ্বিগ্ন। তারা বলছেন, তাদের লেখার নিচে মানুষ যেভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় তাতে বুঝা যায় ভবিষ্যতে কীভাবে সেদেশে মানবাধিকার ও বাক স্বাধীনতার প্রসঙ্গ তোলাও কঠিন হয়ে যাবে। ক্যাপিটল হিলে হামলা চীন সরকারকে আরো সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। চীন সরকার এখন প্রচার করতে পারছে যে বাক স্বাধীনতারও নিয়ন্ত্রণ থাকার প্রয়োজন রয়েছে।

নিজ সরকার ব্যবস্থাকে বড় করে দেখানোর কোনো সুযোগই বেইজিং হারাতে চায় না। ক্যাপিটল হিলে যে সহিংস, নোংরা ও সন্ত্রাসবাদী কর্মকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে তা চীনের জন্য বড় সুযোগ সৃষ্টি করেছে। দেশটি এখন বোঝাতে চাইছে, সেন্সরশীপ দেশ শাসনের সবথেকে ভাল পদ্ধতি। একইসময়ে চীন হংকংয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। বুধবারই সেখানে ৫৩ জন গণতন্ত্রপন্থী নেতাকর্মী গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু চীনের মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্রের দূরাবস্থা নিয়েই মেতে ছিলো। প্রমাণের চেষ্টা চলছিল, কীভাবে গণতন্ত্রের বাতিঘর হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র আসলে অন্যদেরও অন্ধকারে ডেকে নিচ্ছে।