কংগ্রেসে হামলায় ভেতরের সহযোগিতা ছিল, বিশ্বাস গোয়েন্দাদের

বাংলাদেশ মেইল ::

সদ্যসমাপ্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জো বাইডেনের জয়কে কংগ্রেসে চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে অধিবেশন বসেছিল মার্কিন আইনসভা কংগ্রেসে। আর তখনই হামলা চালায় প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থকরা। কংগ্রেসের ভেতরে জোরপূর্বক প্রবেশ করে ভাংচুর চালায় সহিংস বিক্ষোভকারীরা। এই ঘটনা নিয়ে ইউরোপীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলছেন, আদতে সহিংস অভ্যুত্থান চালাতে চেয়েছিল ট্রাম্পের সমর্থকরা। তাদের বিশ্লেষণ, এই হামলায় ক্যাপিটল হিলের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মার্কিন ফেডারেল সংস্থাগুলোও হামলাকারীদের সহায়তা করে থাকতে পারেন। এ খবর দিয়েছে বিজনেস ইনসাইডার।
খবরে বলা হয়, হামলাটির বিষয়ে তিন জন ইউরোপীয় কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছে বিজনেস ইনসাইডার। তাদের মধ্যে একজন প্যারিসের জননিরাপত্তা বিষয়ক পুলিশ কর্মকর্তা, বাকি দুইজন ন্যাটো-সদস্যভুক্ত দেশের দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তা। কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, হামলাটিতে এমন সব অবস্থাগত প্রমাণ পাওয়া গেছে, যেগুলোর ভিত্তিতে অন্য যেকোনো দেশে এটিকে খোলামেলাভাবে অভ্যুত্থান বলা যেত।
নাম না প্রকাশের শর্তে ওই কর্মকর্তারা আরো বলেন, ফেডারেল সংস্থার কর্মকর্তারাই ওই বিশৃঙ্খলার সুযোগ করে দিয়েছেন।

যদিও এ বিষয়ে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি তারা।
বিজনেস ইনসাইডার জানায়, ওই কর্মকর্তাদের বক্তব্য এটা প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা বিশ্বাস করেন ট্রাম্প নির্বাচনি ফলাফল পাল্টাতে সহিংসতা উস্কে দিয়েছেন ও কিছু সরকারি সংস্থাও তাতে ভূমিকা রেখেছে।
‘আমার সরকারকে বলবো এটা অভ্যুত্থান ছিল’
ন্যাটোর এক কর্মকর্তা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলেন, নির্বাচনে পরাজিত প্রেসিডেন্ট তার সমর্থকদের বলেন যে, নির্বাচনে কারচুপি করে তাকে হারানো হয়েছে। এরপর তার সমর্থকদের বলেন, যে ভবনে ভোটগ্রহণ হচ্ছে সেখানে হামলা চালাতে।
‘প্রেসিডেন্টের সমর্থকরা সামরিক পোশাক পরে, বিদ্রোহী-ঘরানার পতাকা উড়িয়ে সে ভবনে হামলা চালায়। ভবনটিতে ওই প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রাধীন ফেডারেল আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো কোনো নিরাপত্তা দেয়াল তৈরি করেনি। বিক্ষোভকারীরা সহজেই পুলিশকর্মীদের ধরাশায়ী করে ফেলে। প্রেসিডেন্ট এরপর এক বিবৃতিতে জানান, তিনি তার সমর্থকদের ভালোবাসেন। কিন্তু তাদের থামতে বলেন না।’
ন্যাটোর ওই কর্মকর্তা জানান, তিনি তার সরকারকে নিজের বিশ্লেষণীতে জানাবেন যে, ডনাল্ড ট্রাম্প একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালিয়েছেন।
এদিকে, মার্কিন সামরিক বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন, এমন এক ফরাসি পুলিশ কর্মকর্তার বিশ্বাস, কংগ্রেসের চারপাশে নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের ব্যাপারে কেউ হস্তক্ষেপ করেছে। তদন্ত করলে এমনটা বের হয়ে আসবে।
উল্লেখ্য, ক্যাপিটল ভবনের চারপাশের নিরাপত্তা প্রক্রিয়া সম্পর্কে সরাসরি তথ্য রয়েছে ওই ফরাসি কর্মকর্তার কাছে।
কংগ্রেসের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকে ইউএস ক্যাপিটল পুলিশ। বাহিনীটি সরাসরি কংগ্রেসের কাছেই জবাবদিহিতা করে। বড় ধরণের বিক্ষোভের আগে সিক্রেট সার্ভিস, পার্ক পুলিশ ও ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা তাদের রুটিন। অনেক ক্ষেত্রে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রাধীন ন্যাশনাল গার্ডও মোতায়েনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়। কিন্তু বুধবার বাহিনীগুলোর মধ্যে ওই সমন্বয় দেখা যায়নি বা তাদের পদক্ষেপ বিলম্বিত ছিল।
তিনি বলেন, আপনি এটা বলতে পারবেন না যে, তারা জানতো না কী করা উচিৎ ছিল। আমি কাল ওয়াশিংটনে গিয়ে সে কাজ করতে পারবো। একইভাবে ওয়াশিংটনের যেকোনো পুলিশ কর্মকর্তাও প্যারিসে এসে আমার কাজ করতে পারবে।
উল্লেখ্য, ওই কর্মকর্তা প্যারিসের একটি পুলিশ ডিসট্রিক্টের জননিরাপত্তার দায়িত্বে আছেন।
মার্কিন নিরাপত্তাকর্মীদের সমন্বয়হীনতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, এগুলো কেবল বিক্ষোভ সামলানোর জন্য কোনো সূক্ষ্ম নীতিমালা নয়। এগুলো যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রযোজ্য। এজন্যই আমরা মার্কিন ফেডারেল আইনপ্রয়োগকারীদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নেই, এই পরিস্থিতিগুলো সামলানোর জন্য।
বার্তা সংস্থা এপি অনুসারে, গত বছর ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটারস আন্দোলনে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন করা হলেও, বুধবার তারা পুলিশকে সহায়তা করতে ক্যাপিটল হিলে পৌঁছায় হামলার দুই ঘণ্টা পর।
এক ভিডিওতে দেখা গেছে যে, কিছু পুলিশকর্মী হামলাকারীদের জন্য বেষ্টনি উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। আরেক ভিডিওতে দেখা গেছে, এক পুলিশকর্মী এক দাঙ্গাকারীকে তার সঙ্গে সেলফি তোলার সুযোগ করে দিয়েছেন।
২০১২ থেকে ২০১৬ সাল অবধি ক্যাপিটল পুলিশের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কিম ডাইন দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, ক্যাপিটল পুলিশ দাঙ্গাকারীদের ভবনটির সিড়িতে প্রবেশ করতে দিয়েছে দেখে বিস্মিত হয়েছেন তিনি। এছাড়া, ঘটনাস্থলে গ্রেপ্তার হওয়া দাঙ্গাকারীদের কম সংখ্যা নিয়েও বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি।
ক্যাপিটল পুলিশের কর্মী হিসেবে ৩০ বছর কাজ করা ল্যারি শ্যাফার প্রোপাবলিকাকে বলেন, এমন একটি পরিকল্পিত বিক্ষোভের জন্য কেন তারা পূর্বের মতো প্রস্তুত থাকেনি? যেখানে অতীতে দেখা গেছে, এসব বিক্ষোভ সহিংস হওয়ার ঝুঁকি থাকে ও এতে অস্ত্র ব্যবহৃত হওয়ার হুমকি থাকে।
এ বিষয়ে জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে বিজনেস ইনসাইডারকে মন্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানায় ক্যাপিটল পুলিশ।
ফরাসি ওই কর্মকর্তা বেশ কয়েকটি নিয়মানুগ ব্যর্থতার ঘটনা তুলে ধরেন।
বড় ধরণের জমায়েত নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে অনেক আগ থেকেই পদক্ষেপ নিতে হয়। কিন্তু বুধবার পুলিশ কেবল ট্রাম্পের ভাষণের সময়ই প্রথম বিক্ষোভের একটি ঘটনা সামলিয়েছে। এরপর বিক্ষোভকারীরা যখন ক্যাপিটলের দিকে দলবেঁধে রওনা দেয়, তখন তাদের আর বাধা দেয়নি।
ফরাসি কর্মকর্তা জানান, ওই দলটিকে তাৎক্ষণিকভাবে চারপাশ থেকে ঘিরে, নিয়ন্ত্রণে এনে, ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া উচিৎ ছিল। কিন্তু তা হয়নি।
তার ভাষ্য, জনতার ভীড়কে নিয়ন্ত্রণ না করায় ও ভিন্নদিকে ঘুরিয়ে না দেওয়ায় তারা ক্যাপিটলে হামলা চালাতে পেরেছে। দ্বিতীয় বড় ব্যর্থতা দেখা যায় সেখানে।
তিনি বলেন, ভবনটির বাইরে বড় ধরণের পুলিশি নিরাপত্তা না থাকার ব্যাপারটি অচিন্তনীয়। পুলিশ বাহিনীর জোরালো উপস্থিতি ব্যতিত বেষ্টনি আর ব্যারিকেড অকার্যকর। আর তখন আপাতদৃষ্টিতে সহিংস, পুলিশকর্মীদের উপর হামলাকারী ও ব্যারিকেড অতিক্রমকারী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা শুরু করতে হয়। আপনাকে এটা অবশ্যই স্পষ্ট করে তুলতে হবে যে, ওই সীমা অতিক্রম করা যাবে না। করলেই গ্রেপ্তার করা হবে।
তিনি আরো বলেন, আমি বিশ্বাসই করতে পারি না যে, যথাযথ নিরাপত্তা স্থাপন কোনো ভুল ছিল। তারা খুবই দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তা। কিন্তু তারা ফেডারেল। এর মানে, সবশেষ তারা প্রেসিডেন্টের অধীনস্থ। এটা খতিয়ে দেখতে হবে।
তিনি বলেন, বিক্ষোভকারীরা যখন ভবনের সিঁড়ির কাছে পৌঁছায়, তখনই পরিস্থিতি শেষ হয়ে গেছিল। সেখানকার পুলিশদের মোতায়েন করা হয়েছিল সন্ত্রাসী হামলা ও অপরাধ ঠেকাতে, পদাতিক সেনাবাহিনীর কোনো ব্যাটালিয়নকে রুখতে নয়। সেটা আরো কয়েকশ’ মিটার আগেই সামলানো উচিৎ ছিল।
এদিকে, ন্যাটোর অপর এক প্রতি-গোয়ান্দা বিষয়ক কর্মকর্তাও একইরকম বক্তব্য দিয়েছেন। তার মতে, এটা কেবল অভ্যুত্থানের চেষ্টা হিসেবেই বিবেচনাযোগ্য। তিনি বলেন, এর প্রভাব অনেক সুদূরপ্রসারী হতে পারে যা তাৎক্ষণিকভাবে উপলব্ধি করা যাবে না।