মিরসরাইয়ে সালাফি মাদ্রাসা নির্মাণঃ ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী

বাংলাদেশ মেইলঃঃ

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলাতে সরকারী নির্দেশনা অমান্য করে মাদ্রাসা নির্মাণ করছে বিতর্কিত সংগঠন আহলে হাদিস বাংলাদেশ। স্কুলের আশপাশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করতে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও স্কুল কতৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই নির্মাণ করা হচ্ছে এ মাদ্রাসা। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন পাশ্ববর্তী  স্কুল কতৃপক্ষ। মাদ্রাসা নির্মাণকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসীর মধ্যেও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ- উৎকন্ঠা। তবে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন উপজেলা শিক্ষা অফিসার।

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ১০নং মিঠানালা ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের লন্ডন প্রবাসী নিজাম উদ্দিনের অর্থায়নে আহলে হাদিস আন্দোলন বাংলাদশের কেন্দ্রীয় তত্ত্বাবধানে এবং আহলে হাদীস আন্দোলন বাংলাদেশ, চট্টগ্রাম জেলা ও কুমিল্লা জেলার যৌথ সহযোগিতায় মুজিবুল হক সালাফি মাদ্রাসা নির্মানের কাজ শুরু হয় গত ৯ ফেব্রুয়ারী।

সালাফি মতাদর্শের পত্রিকা মাসিক আত-তাহরীকের ফেইসবুক পেজে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান লাইভ প্রচার করা হয়। এতে দেখা যায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থতি ছিলেন মাসিক আত- তাহরীক পত্রিকার সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ড. সাখাওয়াত হোসাইন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুমিল্লা জেলার সভাপতি শাইখ শফিউল্লাহ এবং চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি মুহাম্মাদ শেখ সাদী। মাদ্রাসাটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে দেখা যায় মুজিবুল হক সালাফি মাদ্রাসার উদ্যোক্তা ও অর্থের যোগানদাতা লন্ডন প্রবাসী নিজাম উদ্দিন এবং তার ভাই সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা সিরাজউদ্দোলা।

মুজিবুল হক সালাফি মাদ্রাসা উদ্বোধনের পর এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এলাকাবাসীরা জানান, বিতর্কিত এই সংগঠনকে এলাকায় ডেকে এনে শান্তিপ্রিয় ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করতে চায় উদ্যোক্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন এলাকাবাসী জানান, বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদে আমরা জানতে পেরেছি আহলে হাদিসের সঙ্গে জঙ্গি সম্পৃক্ততা রয়েছে। যা নিয়ে আমরা ভীতির মধ্যে রয়েছি।

গত ২০১৯ সালের ১৯ আগষ্ট সরকারী এক নির্দেশনায় বলা হয় সরকারি প্রাথমকি বিদ্যালয়ের আশপাশে নতুন কোনও শক্ষিা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যাবে না। এ বিষয়ে নজরদারি করতে থানা, উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসারদের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন) খান মো. নুরুল আমিনের সই করা একটি নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে।

এর আগে ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সুপারিশ করা হয়েছিল – সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলাের আশপাশে সমমানের কোনও ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যাতে গড়ে না ওঠে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া জরুরী। সংসদীয় কমিটির ওই সুপারিশের পর প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর এই নির্দেশনা জারি করে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, মিঠানালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তপন ধুম বলেন, সরকারের নির্দেশে স্পষ্ট বলা হয়েছে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশপাশে যেন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে না উঠে। তিনি বলেন, স্কুলের পাশে (ক্যাচম্যান এরিয়ার) মধ্যে হওয়ায় সালাফি মাদ্রাসাটি আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কামনা করছি। তপন ধুম আরো বলেন, সরকার শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়মুখী করার জন্য বিনা মূল্যে বইসহ শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করছে।  এছাড়া উপবৃত্তি প্রদান করছে সরকার। আমার বিদ্যালয় থেকে মাত্র সামান্য দূরত্বে সালাফি মাদ্রাসা চালু করা হচ্ছে। ঐ মাদ্রাসা চালু হলে শিক্ষার্থী সংকটে পড়তে পারে আমার বিদ্যালয়।

একই দুরত্বে মিঠানালা রামদয়াল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় অবস্থিত। এর প্রধান শিক্ষক সফিউল আলম বলেন, মাত্র ২০০ মিটার দূরত্বে আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি আরেকটি শিক্ষা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে উদ্যোক্তারা আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা করছেন। তিনি আরো বলেন, ওই পরিবার তাদের সন্তানদের আধুনিক পড়ালেখা শিখিয়ে ইঞ্জিনিয়ার বানিয়েছেন আর ইসলামিক শিক্ষার নামে এলাকার মানুষকে অন্ধকারে রাখতে চান তারা।

এ বিষয়ে মিরসরাই উপজেলা শিক্ষা অফিসার (প্রাথমিক) গোলাম রহমান চৌধুরী বলেন, আমি স্কুলের সামনে মাদ্রাসা নির্মাণের বিষটি জেনেছি। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে আগামী মিটিংয়ে বিষয়টি উত্থাপন করা হবে। এরপর ইউএনও’র নির্দেশে পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

মিরসরাই উপজেলা শিক্ষা অফিসার (মাধ্যমিক) হুমায়ুন কবির বলেন, নীতিমালা অনুসরণ না করে স্কুলের সামনে মাদ্রাসা করার নিয়ম নেই। এ বিষয়ে স্কুল কতৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মাদ্রাসার উদ্যোক্তা সালাফি মতাদর্শে বিশ্বাসী লন্ডন প্রবাসী নিজাম উদ্দিন বলেন, গত ৮ ফ্রেব্রুয়ারী উক্ত প্রতিষ্ঠান নির্মাণের লক্ষে আনুষ্ঠানিক ভাবে কাজ শুরু করি। কিন্তু কাজ শুরু করার পর থেকে এলাকার মানুষের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখে আমরা মাদ্রাসার কাজ বন্ধ রেখেছি। তিনি আরো বলেন, আহলে হাদিস কোন জঙ্গি সংগঠন নয়। এলাকাবাসী চাইলে প্রয়োজনে আমরা সালাফি মাদ্রাসা করবো না।

এ বিষয়ে নিজাম উদ্দিনের বড় ভাই সিরাউদ্দোলাকে বারবার ফোন করা হলেও তিনি কোন সাড়া দেননি।

জানা যায়, সালাফি মাদ্রাসা নির্মাণে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদে আবেদন করা হলে সেটির অনুমোদন দেয়া হয়নি।

এদিকে গত ৫ মার্চ শুক্রবার উপজেলার আবুতোরাব উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বার্ষিক ইসলামী মহাসম্মেলনে বিতর্কিত সালাফিয়্যাহ বক্তা থাকায় ওই সম্মেলন বন্ধ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন।

সম্মেলনে প্রধান বক্তা হিসেবে থাকার কথা ছিল আল-জামি’আহ আস সালাফিয়্যাহ মাদ্রাসার রাজশাহী ও রূপগঞ্জ শাখার পরিচালক শায়খ আবদুর রাজ্জাক বিন ইফসুফ। বিশেষ বক্তা হিসেবে থাকার কথা ছিল আল-জামি’আহ আস সালাফিয়্যাহ রাজশাহীর প্রধান মুহাদ্দিস শায়খ ইমামুদ্দীন বিন আবদুল বাছির। প্রধান বক্তা ও বিশেষ বক্তাদের মতাদর্শ নিয়ে এলাকায় বিতর্কের ঝড় উঠলে উপজেলা প্রশাসন সম্মেলন বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।