করোনার ছোবলে ৫ জেলায় সাংবাদিক সহ ৭ জনের মৃত্যু

১০০ শয্যা বিশিষ্ট মুক্তি করোনা আইসোলেশন সেন্টার

বাংলাদেশ মেইলঃঃ

 

পুনরায় দেশে করোনার প্রকোপ বেড়ে নরসিংদী, মৌলভীবাজার, খুলনা, ফরিদপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় ৭ ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জে করোনা উপসর্গ নিয়ে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে নরসিংদীতে স্থানীয় একটি সাপ্তাহিকের একজন সাংবাদিকও রয়েছেন।

জানা যায়, নরসিংদীতে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তোফাজ্জল হোসেন (৫৩) নামের এক সাংবাদিকের মৃত্যু হয়েছে। (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মঙ্গলবার (২৪ মার্চ) দিবাগত রাত ১২টার দিকে রাজধানীর একটি হাসপাতালে নেওয়ার পথে নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় তাঁর মৃত্যু হয়। এর আগে ২৫ ফেব্রুয়ারি ১০০ শয্যা বিশিষ্ট নরসিংদী জেলা হাসপাতালে তিনি করোনার টিকা নিয়েছিলেন।

বুধবার (২৫ মার্চ) বেলা ১১টার দিকে শহরের তরোয়া এলাকার কাবুল শাহ মাজারের ইদগাহ মাঠে জানাজা শেষে সেখানেই সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেনকে দাফন করা হয়। তিনি নরসিংদীর স্থানীয় সাপ্তাহিক নরসিংদীর খবর এর বার্তা সম্পাদক ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে নরসিংদীর সাংবাদিক মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

টিকা নেওয়ার প্রায় একমাস পর করোনায় আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যুর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন নরসিংদী প্রেসক্লাবের সভাপতি মাখন দাস।

তিনি জানান, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেনের শারীরিক পরিস্থিতির খোঁজখবর প্রতিদিনই রাখছিলাম। করোনা আক্রান্ত হলেও তার শরীরে সেভাবে করোনার কোনও লক্ষণ ছিল না। মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হলে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে রাজধানীর ঢাকায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

তার পরিবারের লোকজন জানান, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ১০০ শয্যা বিশিষ্ট নরসিংদী জেলা হাসপাতালে করোনার টিকা নেন তোফাজ্জল হোসেন। এর ১৫ দিন পর জ্বর-ঠাণ্ডা হওয়ায় করোনা সন্দেহে গত ১৬ মার্চ তোফাজ্জল হোসেনের নমুনা পরীক্ষা করানো হয়। ওই নমুনা পরীক্ষার ফলাফলে তার করোনা পজেটিভ আসে। এরপর থেকেই তিনি নিজবাড়িতে আইসোলেশনে ছিলেন। এ সময় তার অন্য কোনও লক্ষণ না থাকায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়নি।

মঙ্গলবার রাতে হঠাৎ তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। তারপরই স্থানীয় চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল। মাধবদী এলাকায় পৌঁছার পর পথেই তাঁর মৃত্যু হয়।

সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেন নরসিংদী শহরের ভেলানগরে স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে বসবাস করতেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ডায়াবেটিসে ভুগছিলেন। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে নরসিংদীতে সাংবাদিকতা করা তোফাজ্জল হোসেন নরসিংদী প্রেসক্লাবের সদস্য ও সাবেক দফতর সম্পাদক ছিলেন।

করোনার দ্বিতীয় ধাপে মৌলভীবাজারে করোনায় আক্রান্ত হয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়াও গত দুই দিনে ১৮ জন করোনা পজিটিভ হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন।

মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, দুই দিনে ৫৬ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার ফলে ১৮ জনের করোনা পজিটিভ আসে। এর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়। আক্রান্তদের মধ্যে সদর হাসপাতালে ১৪ জন, শ্রীমঙ্গলে ২ জন, কমলগঞ্জে ১ জন ও কুলাউড়ায় ১ জন। এর মধ্যে সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১ জনের মৃত্যু হয়।

জেলায় এখন পর্যন্ত করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ১৯৮৪। সুস্থ রোগীর সংখ্যা ১৯১২। এবং মৃতের সংখ্যা ২৩।

সিভিল সার্জন জানান, মৃত ব্যক্তি আগে থেকেই করোনা সন্দেহে সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তার নমুনা পাঠানোর পর পরীক্ষার ফল আসার আগেই তার মৃত্যু হয়। এই রিপোর্টটি শাহজালালা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিসিআর ল্যাবের।

খুলনা প্রতিনিধি জানান, খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। বুধবার সকাল সাড়ে ৭টায় খুমেকের করোনা ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আরএমও মো. মিজানুর রহমান জানান, মৃত ব্যক্তি হলেন ঝিনাইদহ সদরের আরবপুর এলাকার বাসিন্দা মৃত সিরাজুল হকের ছেলে আ. হাসেম (৪৫)। তিনি জানান, আ. হাসেম গত ২২ মার্চ করোনা আক্রান্ত হয়ে খুমেকের করোনা ইউনিটে ভর্তি হন। তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। বুধবার সকাল সাড়ে ৭টায় তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

এদিকে মঙ্গলবার খুমেক ল্যাবে পরীক্ষায় ২৩ জনের করোনা পজিটিভ হয়। এর মধ্যে খুলনার ১৩ জন রয়েছে। সাতক্ষীরার ৩, বাগেরহাটের ৫ এবং যশোর ও নড়াইলের একজন করে রয়েছেন।

ফরিদপুরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নারীসহ দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (২৪ মার্চ) ভোরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান তারা।

ওই নারীর নাম হাফিজা বেগম (৬১)। তিনি ফরিদপুর সদরপুর উপজেলার চর বিষ্ণুপুর গ্রামের সালাম ব্যাপারীর স্ত্রী। গত সোমবার তাকে করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অপরজন হলেন, নূর ইসলাম (৪৯)। তিনি মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার কাচিকাটা গ্রামের বাসিন্দা ইউনুস হাওলাদারের ছেলে। গত বৃহস্পতিবার তাকে ফরিদপুর করোনা ডেডিকেটেড হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ফরিদপুরে করোনা শনাক্তের হার ১১ দশমিক ১৭। মঙ্গলবার ২৩৩ জনের পরীক্ষা করে করোনা শনাক্ত হয়েছে ২৬ জনের।

ফরিদপুর সিভিল সার্জন ছিদ্দীকুর রহমান বলেন, ফরিদপুরে এ পর্যন্ত করোনা শনাক্ত হয়ে ১২৩ জন মারা গেছেন। করোনা শনাক্তের হার বাড়ছে। আমাদের স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলা ছাড়া এ বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার সুযোগ নেই।

ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. আলিমুজ্জামান বিপিএম বলেন, আমাদের উদ্দেশ্য হলো জনসাধারণকে করোনার বিষয়টি আবারও মনে করিয়ে দেওয়া। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব রেখে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, সরকারি নির্দেশে শহর ও উপজেলা সদরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে মাইকিংসহ বিভিন্ন ধরনের করোনার বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছি। জনসাধারণের মাঝে মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া কোথাও কোথাও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হচ্ছে।

জেলা সিভিল সার্জন অফিস জানিয়েছে, এ পর্যন্ত জেলায় মোট করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৮ হাজার ৫২৭ জন এবং সুস্থ হয়েছেন ৮ হাজার ৩৩৭ জন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১২৩ জন। বর্তমানে আইসোলেশনে রয়েছেন ৫০ জন।

নারায়ণগঞ্জে করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতিদিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। গত দুই দিনে নগরীর খানপুর তিনশ’ শয্যা হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত হয়ে দুইজন এবং করোনার উপসর্গ নিয়ে দুইজন মোট চারজন নিহত হয়েছে। এছাড়া হাসপাতালের আইসিউ ইউনিটে রোগী ভর্তি আছে ৬ জন এবং করোনা ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে আরও ৩৮ জন রোগী চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন। বুধবার (২৪ মার্চ) খানপুর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল বাসার এ তথ্য জানান।

তিনি জানান, ২৩ মার্চ (মঙ্গলবার) বিকেল সাড়ে ৫টায় মৃত্যু হয় ফতুল্লার পশ্চিম দেওভোগ বাসিন্দা মো সোলাইমান (৭০) এর। এর আগে একই দিন বিকেল সাড়ে ৩টায় মৃত্যু হয় সিদ্ধিরগঞ্জের চিটাগাং রোড এলাকার হিরাঝিলের বাসিন্দা রোকেয়া বেগম (৬০)। তাদের দুই জনেরই করোনা পজিটিভ ছিল বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

এছাড়া ২৩ মার্চ বিকেলে আমীর হোসেন (৭৩) নামের আরেক রোগীর মৃত্যু হয়েছে খানপুর হাসপাতালে। ২৪ মার্চ সকাল ৬টা নাগাদ ফজলুল হক (৫৭) নামে আরেক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। তাদের করোনার উপসর্গ ছিল।

গত ২৪ ঘণ্টায় (২৩ মার্চ সকাল ৮টা- ২৪ মার্চ সকাল ৮টা) নারায়ণগঞ্জে নতুন করে ৮২ জনের করোনা শনাক্ত করা হয়েছে। এ নিয়ে মোট ৯৪৭৯ জনের দেহে করোনা শনাক্ত করা হয়েছে জেলাজুড়ে।

খানপুরস্থ নারায়ণগঞ্জ ৩’শ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল বাসার জানান, গত দুই দিনে (২৩মার্চ ও ২৪ মার্চ) দুই জন করোনায় আক্রান্ত হয়ে ও দুই জন করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন খানপুর তিনশ’ শয্যা হাসপাতালে। বর্তমানে হাসপাতালের আইসিউ ইউনিটে ৬ জন ও সাধারণ ইউনিটে ৩৮ জন করোনার রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।

করোনার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে শঙ্কা করে নারায়ণগঞ্জের সকলকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে ডা. আবুল বাসার জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের প্রতি অনুরোধ করেছেন, দ্রুত যেন কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তিনি জানান, বেশি বেশি সচেতনতা বাড়াতে প্রচারণার পাশপাশি স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করার ব্যবস্থাসমূহ প্রয়োগ করতে হবে।