করোনা রোগীদের চিকিৎসা সংকট চট্রগ্রামে

চট্টগ্রামে করোনা

বাংলাদেশ মেইল::

করোনা রোগীদের চিকিৎসা সংকট প্রকট আকার ধারন করেছে চট্টগ্রামে। আক্রান্ত রোগীদের জন্য আইসিইউ মিলছে না কোথাও৷ হাসপাতাল কিংবা বেসরকারি ক্লিনিকে পাওয়া যাচ্ছে না সাধারণ বেডও ।

চট্টগ্রামের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে মোট ১৫৭টি আইসিইউর মধ্যে সবকটি আইসিইউ বেডই এখন মুমূর্ষু রোগীতে ভর্তি। এমন অবস্থায় আইসিইউ বেড পেতে আরও বেশ কয়েকজন অপেক্ষায় থাকছেন কখন সিটে থাকা রোগীর মৃত্যু হলে সেই সিটে তাদের রোগীকে ওঠাবেন।
চট্টগ্রামে এরকমই ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকবার। নতুন করে আবারও এমন এক ঘটনা ঘটেছে

বুধবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ৬৫ বছর বয়সী বৃদ্ধা মা কানন প্রভা পাল যখন করোনা আক্রান্ত হয়ে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন তখন সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন তার ৩৭ বছর বয়সী ছেলে শিমুলের অক্সিজেন লেভেল দ্রুত কমতে থাকে। তীব্র শ্বাস কষ্ট নিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুণছিলেন ছেলে শিমুল। কিন্তু হাসপাতালের ১৪টি আইসিইউ বেডের একটিও খালি নেই।

এদিকে ছেলের ছটফটানি বাড়ছে সাধারণ সিটে। এ খবর মায়ের কানে গেলে তিনি নিজের হাতে লাইফ সাপোর্টের সরঞ্জাম খুলে ছেলেকে আইসিইউতে আনতে চিকিৎসকদের ইশারা করেন। শত চেষ্টা করেও মাকে বুঝাতে পারেননি চিকিৎসকরা। বাধ্য হয়ে মাকে নামিয়ে আইসিইউ’র বেডে তোলা হয় ছেলেকে। যদিও এতে চিকিৎসকদের সায় ছিল না কিন্তু মায়ের আবদার রক্ষা করতে নিরুপায় ছিলেন দায়িত্বরত চিকিৎসকরাও। ছেলেকে বিকেলে মায়ের ছেড়ে দেওয়া আইসিইউ বেডে তোলার কয়েক ঘণ্টা পর মা কানন প্রভা পাল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। অন্যদিকে জীবন মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন ছেলে শিমুল পাল।

নগরের কোতোয়ালী থানার দিদার মার্কেট সিঅ্যান্ডবি কলোনি এলাকার বাসিন্দা মা কানন প্রভা পাল গত ১৫ জুলাই করোনা আক্রান্ত হয়ে জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে মায়ের অবস্থার অবনতি হলে গত ২২ জুলাই তাকে আইসিইউতে আনা হয়।

অন্যদিকে ২১ জুলাই করোনা আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালের সাধারণ ওয়ার্ডে ভতি হন ছেলে শিমুল পাল। এরমধ্যে বুধবার সকাল থেকে ছেলে শিমুলের তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। কমতে থাকে অক্সিজেন লেভেল। পরে মায়ের ছেড়ে দেওয়া আইসিইউর বেডেই এখন মৃত্যু দূতের সঙ্গে লড়াই করছেন ছেলে শিমুল পাল।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের সিনিয়র কনসালটেন্ট ও কোভিড ফোকাল পার্সন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. আবদুর রব জানান মায়ের অসাধারণ ত্যাগের কারণে ছেলে এখনো বেঁচে আছে। তবে মা কানন প্রভা পাল যেটা করেছেন তাতে আমাদের সায় ছিল না। এরপরও উনার জোরাজুরিতেই আমরা নিরুপায় হয়ে তাকে আইসিইউ বেড থেকে নামিয়েছি। নামানোর কয়েক ঘণ্টা পরেই তিনি মারা যান। মায়ের ছেড়ে দেওয়া সিটে ছেলে শিমুল পাল এখন আছেন। তার অবস্থাও আশঙ্কাজনক।’

এ পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে ডা. আবদুর রব বলেন, ‘গেল কিছুদিন ধরেই হঠাৎ রোগীর চাপ বেড়েছে কয়েকগুণ। যাদের বেশিরভাগরই অক্সিজেন প্রয়োজন হচ্ছে। যাদের শারীরিক অবস্থা খারাপ হচ্ছে, তাদের আইসিইউ’র প্রয়োজন হচ্ছে। কিন্তু শয্যা না থাকায় দিতে পারছি না। এখনও যে পরিমাণ রোগী আইসিইউতে আছে, একই পরিমাণ রোগী আইসিইউ’র জন্য অপেক্ষামান। বাধ্য হয়েই তাদের হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানোলা দিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে।’

রোগীদের হঠাৎ চাপ আর অক্সিজেনের প্রয়োজনীয়তা বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আরও বলেন, ‘এখন যে রোগীগুলো আসছে, তাদের লক্ষণগুলো দেখে বুঝা যায়, ডেল্টা ভেরিয়েন্ট ক্রমশ নীরবে ছড়িয়ে পড়েছে। যার কারণে তাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হচ্ছে অক্সিজেন। পরিস্থিতি এমন থাকলে সামনে আরও খারাপ অবস্থার সামনে দাঁড়াতে হবে। তাই সকলকে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি মানতেই হবে।’

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই সকলকে সতর্ক করে আসছি। কিন্তু মানুষ কোন কথাই শুনতে চায়নি। সরকারি বলেন আর বেসরকারি, সবগুলো হাসপাতালেই রোগীর প্রচুর চাপ বেড়েছে। এখন যেভাবে প্রতিদিন সংক্রমণ বাড়ছে। তাতে সামনের পরিস্থিতি কী হবে, তা বলা যাচ্ছে না। আমরা বরাবরই ঝুঁকির মধ্যেই আছি। এরপরও যদি সাধারণ মানুষ সচেতন না হয়, তাহলে কিছুই করার থাকবে না।’

চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. হাসান শাহরিয়ার কবীর বলেন, ‘পরিস্থিতি খুবই নাজুক। ঈদের এক সপ্তাহ আগেই এসব বিবেচনা করে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে শয্যা বাড়ানোর জন্য চিঠি দেয়া হয়েছিল। তারাও চেষ্টা করছেন। অনেক হাসপাতালেই ইতোমধ্যে শয্যা বাড়িয়েছেন। কিন্তু কথা হচ্ছে, সংক্রমণ যেভাবে বাড়ছে, তাতে যতই শয্যা বাড়ানো হোক, কোন কাজেই আসবে না। আমাদের অবস্থান থেকে সকলকে সচেতন হতে হবে। বারবার একই কথাই বলে আসছি। আবারও বলছি, সচেতন না হলে খুবই ভয়াভহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।’