ফুসফুস রক্ষায় নাগরিক সমাজের সমাবেশ
সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল,ক্ষোভে উত্তাল পুরো চট্টগ্রাম

ক্ষোভে উত্তাল

বাংলাদেশ মেইল ::

চট্টগ্রাম নগরীর ফুসফুস হিসাবে পরিচিত পূর্ব রেলের সদর দফতর সিআরবিতে একটি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণের উদ্যোগে ক্ষোভে উত্তাল পুরো চট্টগ্রাম । বৃহস্প্রতিবার বিকেলে সিআরবি এলাকায় প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে নাগরিক সমাজ । সমাবেশে গণমাধ্যমকর্মিসহ সমাজের নানা শ্রেণী পেশার মানুষ এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান ।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, কবি-সাংবাদিক আবুল মোমেন, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান, অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, পরিবেশবিদ ও কর্ণফুলী গবেষক ড. ইদ্রিস আলী, ডা. একিউএম সিরাজুল ইসলাম, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব কাজী মহসিন, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শুকলাল দাশ, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. ইউনুস, আবৃত্তি শিল্পী রাশেদ হাসান, মিলি চৌধুরী প্রমুখ।

সমাবেশে কবি-সাংবাদিক আবুল মোমেন বলেন , বৃটিশ আমলের ভবন, আকাবাঁকা রাস্তা, পাহাড়-টিলা ও শতবর্ষী নানা গাছ-গাছালিতে পরিপূর্ণ এ এলাকাটি চাটগাঁর ঐতিহ্যের অংশ। গাছ-গাছালিতে পাখির কল-কাকলি, সবুজের সমারোহ এমন দৃশ্য সচরাচর চোখে পড়ে না। এটিকে ধ্বংস করা যাবে না।

নাগরিক সমাবেশে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ডা. মাহফুজুর রহমান বলেন ,শিরীষ তলা, সাত রাস্তার মাথাসহ পুরো এলাকা জনসমাগমের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। পহেলা বৈশাখসহ নানা অনুষ্ঠানমালা ছাড়াও ছায়া-সুনিবিড় এ এলাকায় নগরীর প্রবীণরা সকাল-বিকেল ভ্রমণ, ব্যায়াম চর্চা করে থাকেন। শিশু-কিশোর-যুবকদের খেলাধুলা, বিনোদন তথা মানসিক বিকাশের কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত সিআরবি। ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসাবে ১৮৭২ সালে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন সিআরবি ভবনের পাশাপাশি সেখানে রয়েছে ১৮৯৯ সালে ব্যবহৃত প্রথম স্টিম ইঞ্জিন। এসব স্থাপনা দেখতে সেখানে প্রতিনিয়ত পর্যটকের ভিড় জমে। হাসপাতালের প্রয়োজনে নগরীর অন্য কোন জায়গা বরাদ্ধ দেয়া সম্ভব ।

ডা. একিউএম সিরাজুল ইসলাম বলেন , মহানগরীর প্রাণকেন্দ্রের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হাসপাতাল, কলেজ ও নার্সিং ইনস্টিটিউটের মত স্থাপনা নির্মাণ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন পরিবেশবিদ, নগর বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা বলছেন, চট্টগ্রামে হাসপাতাল করার মত উপযুক্ত জায়গার অভাব নেই। এছাড়া মহানগরীতে একাধিক মেডিক্যাল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থাকায় নতুন করে মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণের আদৌ কোন দরকার আছে কি না তা ভেবে দেখা জরুরি। সিআরবিতেই রয়েছে রেলওয়ে হাসপাতাল।

ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের যুগ্ম মহাসচিব মহসিন কাজী বলেন , নগরবাসী ফুসফুসের উপর সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) এই হাসপাতাল ও কলেজ প্রতিষ্ঠায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত শতাব্দি প্রাচীন সুউচ্চ বৃক্ষরাজি ঘেরা এলাকায় ৫শ’ শয্যার হাসপাতাল ও ১শ’ আসনের কলেজের মতো একাধিক বহুতল ভবন নির্মাণের এমন উদ্যোগে চট্টগ্রামে সর্বমহলে ব্যাপক ক্ষোভ, অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।

চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শুকলাল দাশ বলেন , ঐতিহ্যবাহী সিআরবিতে হাসপাতাল নির্মাণের খবর চট্টগ্রামবাসীকে অত্যন্ত ব্যথিত, উদ্বিগ্ন ও ক্ষুব্ধ করেছে। এলাকাটি চট্টগ্রামের ফুসফুস হিসাবেই গণ্য। হাসপাতালের কারণে জনসমাগম বৃদ্ধি ও ক্লিনিক্যাল বর্জ্য সিআরবি এলাকার নির্জনতা ও পরিবেশকে ঝুঁকিতে ফেলবে। সংবেদনশীল ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের স্থানে এ ধরনের একটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ অনুচিত হবে ।

প্রতিবাদ সমাবেশে অ্যাডভোকেট রানা দাস গুপ্ত বলেন ,পরিবেশবাদী সংগঠনের পাশাপাশি সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা ঐতিহ্য ও পরিবেশ বিধ্বংস এই কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। তাদের দাবি সেখানে হাসপাতাল হলে বৃক্ষরাজি আর সবুজ বন ধ্বংস হয়ে যাবে। পৌনে এক কোটি মানুষের এই নগরীতে নান্দনিক উম্মুক্ত সবুজ চত্বর বলে আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না। কালের সাক্ষী অবিভক্ত ভারতের আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের সদর দফতর সিআরবি ভবনটি হয় ১৮৯৫ সালে। শতবর্ষী বৃক্ষরাজি, পাহাড়, টিলা ও উপত্যকা ঘেরা এই এলাকাটি হরেক প্রজাতির পাখ-পাখালি ও প্রাণির আবাস। এমন পরিবেশ বিধ্বংসী সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার দাবি জানান তিনি ।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে  হ্যাস ট্যাগ ব্যবহার করে সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল নির্মানের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানাচছেন নেটিজেনরাও । শতবর্ষী গাছ রক্ষা ও সিআরবির সৌন্দর্য রক্ষায় ক্ষোভে উত্তাল পুরো চট্টগ্রাম ।