ছয় জেলায় অবস্থান কর্মসুচী
সুন্দরবনকে ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া বন্ধের আহবান

বাংলাদেশ মেইল ::

সুন্দরবনকে ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া করছে জাতিসংঘের বিজ্ঞান শিক্ষা ও ঐহিত্যবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো । ইউনেস্কোর দেয়া শর্ত পালন করতে না পারলে ওয়াল্ড হেরিটেজ তালিকা থেকে বাদ পড়বে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন । ২০১৯ সালের জুন মাসে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঝুকিপুর্ন এহিত্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছিল ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটি । কমিটির সুপারিশে বলা হয় সুন্দরবন রক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের করা অঙ্গিকার বাস্তবায়নের অগ্রগতি খুবই ধীর । এমন সুপারিশের কারণ হিসেবে সুন্দরবনের ২০ কিলোমিটারের মধ্যে দুটি কয়লাভিক্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের প্রক্রিয়াকে দায়ী করা হয় ।

এক বছরের পর্যবেক্ষন সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয় । ২০২০ সালের জুলাই মাসে আজারবাইজানের বাকুতে কমিটির সাধারণ সভায় এ বিষয়ে ১০৪ পৃষ্ঠার খসড়া সুপারিশ উপস্থাপন করে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যায় ঐতিহ্য  কমিটির সেই সাধারন সভা । চলতি বছরের ১৬ জুলাই থেকে ৩০ জুলাই অনলাইনে ঐতিহ্য কমিটির এ সাধারন সভা অনুষ্ঠিত হবে। সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষায় সন্তোষজনক অগ্রগতি না হওয়ার কারণে চলতি বছর অনুষ্ঠেয় ইউনেস্কোর ঐতিহ্য  কমিটির সাধারন সভায় সুন্দরবনকে ঝুুুঁকিপুর্ণ ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি অনেকটাই চুড়ান্ত ।

এদিকে, সুন্দরবনকে ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্য হিসবে চিহ্নিত না করার দাবিতে বৃহস্প্রতিবার (১৫ জুলাই ) দেশের সাত জেলায় একযোগে “মৌমাছি ও মধু” সংগঠনগুলো অবস্থান কর্মসূচী পালন করেছে । ইউনেস্কো কতৃক ঘোষিত “সুন্দরবন”কে বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্মান অক্ষুন্ণ রাখতে ঢাকা,চট্টগ্রাম,রংপুর,বরিশাল,খুলনা, সাতক্ষীরা ,বাগেরহাট জেলায় একই সময়ে প্রেসক্লাব সমুহের সামনে একযোগে অবস্থান কর্মসূচী পালন করে সংগঠনগুলো ।

অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন , ইউনেস্কো ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য সম্মান ঘোষণা করে। কিন্তু সম্প্রতি ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানসমূহের তালিকা থেকে সুন্দরবনের নাম বাদ দিয়ে ঝুকিপুর্ণ ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা পরিকল্পনা করছে।ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির সর্বশেষ ২০১৯-এর সভায় সুন্দরবন ঐতিহ্য রক্ষায় বেশকিছু শর্ত আরোপ করেছিল।এই সকল শর্তাবলীগুলো পালনে বাংলাদেশ যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে কাজ করেছে বলে দাবি করা হলেও অগ্রগতিতে  সন্তুষ্ট নয় কমিটি। সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নয়,পুরো বিশ্বের একটি প্রাকৃতিক ঐতিহ্য । ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য এই বনটিকে টিকিয়ে রাখতে সকলের সম্মেলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য । সুন্দরবন তার প্রাকৃতিক অবয়ব নিয়ে ভালো আছে, তাই একে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকা থেকে বাদ দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়োজন নেই।

মৌয়াল ,চাষী , গবেষক ও ভোক্তাদের জাতীয় জোট ‘ মৌমাছি ও মধু ‘র সমন্বয়ক মঈনুল আনোয়ার বলেন ,বনজ সম্পদ রক্ষা আন্দোলনের জনক বলে খ্যাতি প্রাপ্ত নেদারল্যান্ডের  ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল বিশেষজ্ঞ জিনি ডি বেয়ার ২০১০ সালে সুন্দরবন সফরে এসে বলেছিলেন ,মধু বাঁচলে বন বাঁচবে।বনে বেশি মধু থাকা ভালো বনের লক্ষণ । ম্যানগ্রোভ বনে মধু থাকা মানে গাছ ,পানি,মাটি সহ পুরো প্রতিবেশ ব্যবস্থা ভালভাবে টিকে আছে। অর্থাৎ হরিণ ,বানরের খাদ্যের যোগান ভালো -এই প্রানী গুলো খেয়ে পরে বেঁচে থাকলে বাঘের খাদ্য ঠিক থাকবে ফলে বাঘ বাঁচবে এবং বাড়বে। তাই মধু রক্ষা করতে পারলে সুন্দরবন রক্ষা করা যাবে। বন বিভাগ করোনাকালীন সময়ে অন্যসব বনজ সম্পদ আহরণ বন্ধ রাখলেও মধু সম্পদ আহরণ চালু রেখেছিলো সরকার।  বনবিভাগের  তথ্যমতে প্রতি বছর মধু সংগ্রহ বাড়ছে। ২০১৫-১৬ অর্থ বছরে ১,৯২,৪০০ কেজি মধু সংগ্রহ হয় ।প্রতি বছর উৎপাদন বেড়ে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে ৪,৪৪,৮০০ কেজি মধু আহরণ হয়েছে।বছর বছর মধুর উৎপাদন বৃদ্বি পাওয়াই প্রমাণ করে ‘সুন্দরবন’ ভালো এবং ঝুকিমুক্ত রয়েছে ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার সুন্দরবনকে দস্যু মুক্ত ঘোষণা করে অতিষ্ট বনজীবিদের মনে যে রকম স্বস্তি আনতে সক্ষম হয়েছে ঠিক অনুরূপ বনের প্রতিবেশ ব্যবস্থার মধ্যেও স্বস্তি এসেছে।সুন্দরবনের অর্ধেক জায়গা  অভয়ারণ্য ঘোষণা সুন্দরবনকে রক্ষার ব্যাপারে ভুমিকা রেখেছে সরকার । সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ ঐহিত্য কমিটির সাধারন সভায় উপস্থাপন করা জরুরী বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা ।

বনের বৃক্ষ সম্পদ বুঝার জন্য বিশ্বব্যাপী যে নতুন পদ্বতি অনুসরণ করা হচ্ছে ,তা হচ্ছে ‘কার্বন মজুত তথ্য’ ।২০০৯ সালের সমীক্ষায় দেখা যায়, সুন্দরবনে কার্বন মজুতের পরিমাণ ১০ কোটি ৬০ লাখ টন। ২০১৯ সালের নতুন এই সমীক্ষায় কার্বন মজুতের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ কোটি ৬০ লাখ টনে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সুন্দরবনের বৃক্ষ সম্পদ বেড়েছে। এটি এই বনের প্রাকৃতিক শক্তিমত্তার পরিচয়। সবকিছু মিলিয়ে সুন্দরবন ভালো আছে। বনবিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সুন্দরবনের যেকোন দুর্ঘটনায় তাৎক্ষনিক তদন্তের ব্যবস্থা করে এবং সুপারিশ প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করে।সম্প্রতি বনবিভাগ জীব বৈচিত্র সংরক্ষণ বন ও বন্য প্রানীর অপরাধ দমনে ড্রোণের ব্যবহার সংযোজন করছে যা বন ব্যবস্থাপনায় অন্যতম মাইল ফলক।

বিএম/আ.মা