মুক্তিযুদ্ধে ফেনী
ফেনী : পাক হানাদার মুক্ত দিবস আজ

পাক হানাদার
ফেনীর বিধায়ক খাজা আহমেদ, ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর শহর মুক্ত হওয়ার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন

বাংলাদেশ মেইল ::

আজ ৬ ডিসেম্বর। ফেনী পাক হানাদার মুক্ত দিবস। এদিন বাংলার বীর সেনাদের দীপ্ত পদভারে প্রকম্পিত হয়েছিল ফেনীর আকাশ-বাতাস। ১৯৭১-এর এই দিনে মুক্তিযোদ্ধারা সম্মুখ সমরে পাক বাহিনীদের পরাজিত করে ফেনীর পূর্বাঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিল।

ফেনীর উত্তর পূর্বাঞ্চলের দৈর্ঘ্যে প্রায় ২০ মাইল প্রস্থে ৮ মাইল তিনদিকে ভারত বেষ্টিত এ এলাকাটি দেখতে পকেটের মত। অত্র এলাকার আদি নাম রৌশনাবাদ এর অংশ খন্ডল পরগনা। তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালির সর্বপ্রকার আন্দোলন ও খন্ডলের ন্যায্য দাবী-দাওয়ার তুখোড় আন্দোলনকারী হিসেবে পরিচিত নাম জাহাঙ্গীর খন্ডলী এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে একজন মহান সংগঠক। মুক্তিযুদ্ধে রণকৌশলের জন্য এ অঞ্চলটি একটি মডেল। মুক্তিযুদ্ধের শুরু হতে শেষ পর্যন্ত এখানে যতগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে, সেগুলো বিলোনিয়ার যুদ্ধ হিসেবে ব্যাপক ভাবে প্রচারিত ও পরিচিত। ২৭ মার্চ হতেই সীমান্তের ক্যাম্পগুলিতে যে সব অবাঙালি ইপিআর ছিল তাদের সারেন্ডার করানোর জন্য স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা আমিনুল করিম মজুমদার খোকা মিয়া ও মৌলভী আজিজুল হক মজুমদার সহ প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এএফকে সফদারের নির্দেশে কার্যক্রম চলতে থাকে। ২৮ মার্চ ক্যাপটেন (অবঃ) এম ইসহাক এর নেতৃত্বে সুবেদার (অবঃ) ইমাম হোসেন ও সুবেদার মিজানুর রহমানসহ অন্যান্যরা মুক্তিযোদ্ধাদের পরশুরাম পাইলট হাইস্কুল মাঠে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ দেয়া শুরু করেন।

ফেনী সরকারি কলেজের কলা অনুষদের বৃহত্তম গণকবরসহ আটটি গণকবর রয়েছে।  ফেনীতে পাকসেনাদের হাতে নির্যাতিত ও নিহত হাজার হাজার মানুষের ভয়াবহতার স্বাক্ষী এসব গণকবর। ফেনীর বিধায়ক খাজা আহমেদ, ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর শহর মুক্ত হওয়ার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীকে অভিনন্দন জানান ।

এদিন বাংলার বীর সেনাদের দীপ্ত পদভারে প্রকম্পিত হয়েছিল ফেনীর আকাশ-বাতাস। ১৯৭১-এর এই দিনে মুক্তিযোদ্ধারা সম্মুখ সমরে পাক বাহিনীদের পরাজিত করে ফেনীর পূর্বাঞ্চল দিয়ে প্রবেশ করে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়েছিল।

নভেম্বরের শেষ দিকে ফেনী জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর প্রবল আক্রমণে দিশেহারা হয়ে পড়ে পাক বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনীসহ মিলিশিয়া বাহিনীর সদস্যরা। ফেনী জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পালিয়ে ফেনী শহরে একত্রিত হয়ে চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যায়। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা সংগ্রামে হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের নৃশংস বর্বরতায় ক্ষত-বিক্ষত ফেনী শহরে স্বাধীনতাকামী বাঙালিরা বিজয়ের নিশান উড়িয়ে উল্লাস করে স্বজন-হারাদের কান্না ভুলে গিয়েছিল। জেলার বিভিন্ন স্থানে আটটি বধ্যভূমিতে শহীদদের লাশ শনাক্ত করতে বা তাদের কবর চিহ্নিত করতে ছুটে বেড়িয়েছিল স্বজন-হারারা।

ফেনী অঞ্চলের মুক্তিবাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত তৎকালীন ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের নেতৃত্বে (পরবর্তীতে লে. কর্নেল হিসেবে (অব.) ভারতের বিলোনীয়া ও তৎসংলগ্ন অঞ্চল থেকে ১০ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের অভিযানে পর্যুদস্ত হয়ে সম্মিলিত পাক বাহিনী চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যায়। ফেনী হানাদারমুক্ত হওয়ার কারণে ঢাকা-চট্টগ্রামের সঙ্গে সড়ক ও রেল পথে হানাদার বাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এতে করে বাংলাদেশ স্বাধীনতার সূর্য উদিত হওয়ার বিষয়টি সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

মুক্তিযুদ্ধে ফেনীর অনেকগুলো রণাঙ্গনের মধ্যে মুন্সীর হাটের মুক্তারবাড়ী ও বন্ধুয়ার প্রতিরোধের যুদ্ধ ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এ রণাঙ্গনে সম্মুখ সমরের যুদ্ধকৌশল বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানি মিলিটারি একাডেমিগুলোতে পাঠ্যসূচির অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যা এ রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের অহংকার ও গর্বের বিষয়।

ফেনী কলেজ মাঠ ছিল পাকিস্তানিদের নির্যাতন কেন্দ্র। বিভিন্ন স্থান থেকে স্বাধীনতাকামী মানুষকে ফেনী কলেজে ধরে নিয়ে চালানো হতো অমানুষিক নির্যাতন। নির্যাতনের পর তাঁদের হত্যা করে মাটিচাপা দেওয়া হতো। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ফেনী পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত হলে হাজারো মানুষ ছুটে আসে কলেজ মাঠে তাঁদের আত্মীয়স্বজনের খোঁজে। ফেনী কলেজ মাঠ খুঁড়লে বেরিয়ে আসে অসংখ্য মানুষের হাড়গোড় ও মাথার খুলি। শতাধিক মানুষকে এখানে হত্যা করা হয় বলে জানা যায়।

দাগনভূঞা উপজেলার ২ নম্বর রাজাপুর ইউনিয়নের রাজাপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করে। এখানে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধা, যুবক, নারী, শিশুসহ বিভিন্ন বয়সের লোকদের ধরে এনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নির্যাতন করত। চৌধুরীবাড়ির পশ্চিম পাশে ফেনাযুক্ত পুকুরে মুক্তিযোদ্ধা আশরাফকে গুলি করে হত্যা করা হয়। একই স্থানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মারাত্মক আহত হয়ে অল্পের জন্য বেঁচে যান ডাক্তার আবদুল হালিম। যুদ্ধাহত হালিম আজও পিঠের ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন।

ফেনী পলিটেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে বধ্যভূমিতে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক সন্দেহে ধরে এনে অসংখ্য নিরীহ মানুষকে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়। স্বাধীনতার পর এখান থেকে উদ্ধার করা হয় অসংখ্য মানুষের কঙ্কাল, হাড়গোড় ও মাথার খুলি।

ফেনী রেলওয়ে স্টেশনে রয়েছে আরেকটি বধ্যভূমি। ১৯৭১ সালের মে মাসে পাকিস্তানি বাহিনী ফেনী রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন ডোবায় অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়।

এছাড়া ফেনী নদীর ওপর নির্মিত দাউদপুর ব্রিজ এবং তার তলদেশের বধ্যভূমিতে বিভিন্ন স্থান থেকে বাঙালিদের ধরে এনে ব্রিজের ওপর দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। ফেনী কলেজের জীববিজ্ঞানের অধ্যাপক ফজলুল হককে এখানে হত্যা করা হয়।

ফেনীর রেলওয়ের কালিদহ-পাহালিয়া ব্রিজের বধ্যভূমিতে কালিদহ ইউনিয়নের আশপাশের মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে বাঙালিদের ধরে এনে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা।

ফুলগাজী উপজেলার আনন্দপুর ইউনিয়নের ২৬ মুক্তিকামী মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা, রাজাকার, আলবদররা। এখানে হত্যা করা হয় শরিফা খাতুন, সেতারা বেগম, আবুল মনসুর, জোহরা আক্তার এ্যানী, সাইফুল ইসলামসহ নাম না–জানা অনেকেই।

পরশুরাম উপজেলার চিথলিয়া ইউনিয়ন মালিপাথর নামক স্থানে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনারা হত্যা করে মুক্তিকামী একই পরিবারে পাঁচ সদস্যকে। প্রাণে রক্ষা পাওয়া ওই শহীদ পরিবারের সন্তান মো. মাওলানা নুরুল আমিন জানান, ওই স্থানে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তাঁর বাবা, চাচা, জ্যাঠাসহ পাঁচজনকে।

পরশুরাম পৌরসভার সলিয়ায় বধ্যভূমিতে নীরবে শুয়ে আছেন একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার একই পরিবারের তিন মুক্তিকামী শহীদ।

ফেনীর দাগনভূঞা এলাকা ব্যবহার করা হয়েছে বধ্যভূমি হিসেবে। এখানে অসংখ্য মানুষের কঙ্কাল ও মাথার খুলি পাওয়া গেছে। এখানে কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তার পরিসংখ্যান জানা যায়নি।

ফেনীর কুটিরহাট সেতু এলাকা বধ্যভূমিতে প্রায় ১৩৪ জন নিরীহ গ্রামবাসীকে হত্যা করা হয়। এখানে পুলের নিচে অসংখ্য কঙ্কাল পাওয়া যায়। এ ছাড়া মাতুভূইয়া সেতু বধ্যভূমি ও রেজুমিয়া সেতু বধ্যভূমিতে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর ভারতে একতরফা আক্রমণের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনী এবং মিত্র ভারতীয় বাহিনীর সমন্বয়ে গড়া যৌথ বাহিনী  সীমান্ত অতিক্রম করে সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশে অভিযান শুরু করে। যৌথ বাহিনী বাংলাদেশের পাকিস্তানি অবস্থানগুলো ঘিরে ফেলার জন্য সীমান্তের সাতটি এলাকা দিয়ে তীব্র আক্রমণ পরিচালনা করে। এভাবেই ৬ ডিসেম্বর ফেনী পাক হানাদার মুক্ত হয়।