সুমেরীয় সভ্যতার শিল্পকলা ও সমসাময়িক প্রাসঙ্গিকতা

জ্ঞান, বিজ্ঞান ও শিল্পচর্চার এক অপূর্ব ভান্ডার বর্তমান বিশ্ব সভ্যতা। কিন্তু, একদিনে গড়ে উঠেনি আজকের এই সভ্য সমাজ। পৃথিবীতে মানব সভ্যতার ইতিহাস সুপ্রাচীন। হাজারো কঠিন ও কঠোর তপস্যা এবং শত-সহস্র বন্ধুর পথ পেরিয়ে অদ্যবধি পৌঁছেছে সভ্যতার উৎকর্ষ ও বিকাশ। ইতিহাসের দৃষ্টিতে মানব সভ্যতা বিকাশের প্রধান দুটো যুগ রয়েছে। এর প্রথমটি হচ্ছে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ, আর দ্বিতীয়টি, ঐতিহাসিক যুগ।

মূলত, ইতিহাস লিপিবদ্ধকরণের পূর্বের যুগকেই প্রাগৈতিহাসিক যুগ বলা হয়। ভিন্নার্থে, সভ্যতার পূর্বের যুগকে প্রাগৈতিহাসিক যুগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অন্যদিকে, যখন থেকে পৃথিবীতে ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা শুরু হয়, যে যুগের প্রারম্ভ হতে আমরা মানব সভ্যতার ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারি, সেটিই ঐতিহাসিক যুগ হিসেবে খ্যাত। অর্থাৎ, প্রাগৈতিহাসিক যুগের অবসানের মাধ্যমেই পৃথিবীতে সভ্যতার সূত্রপাত।

বিশ্ব সভ্যতার সূত্রপাত হয় আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০ অব্দ থেকে। সংবিধিবদ্ধ ইতিহাস ঘাটলেই আমরা প্রাচীন সভ্যতাসমূহ সম্পর্কে জানতে পারি। এসব সভ্যতার মধ্যে – মিশরীয় সভ্যতা, মেসোপটেমীয় সভ্যতা, সুমেরীয় সভ্যতা, ব্যবিলনীয় সভ্যতা, অ্যাসিরীয় সভ্যতা, ক্যালডীয় সভ্যতা, সিন্ধু সভ্যতা, ফিনিশীয় সভ্যতা, পারস্য সভ্যতা, হিব্রু সভ্যতা, চৈনিক সভ্যতা, গ্রীক সভ্যতা ও রোমান সভ্যতা প্রভৃতি মানব সভ্যতার বিকাশ সাধনে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।

এই নিবন্ধটির মূল উদ্দেশ্য, সংক্ষেপে সুমেরীয় সভ্যতার শিল্পকলার বিভিন্ন অবদান তুলে ধরা। তবে, যেহেতু শিল্পের নিদারুণ রস ও অনুপ্রেরণা শিল্পীগণ সমাজ থেকে গ্রহণ করেন, শিল্প ও শিল্পী উভয়ই দারুণভাবে সামাজিক প্রেক্ষাপট কর্তৃক প্রভাবিত হয়, তাই সুমেরীয় সভ্যতার পরিচয় ও অন্যান্য দিকও এখানে আলোচনা করা হলো।

সুমেরীয় সভ্যতার প্রাথমিক পরিচিতি: মেসোপটেমীয় অঞ্চলে বসতি গড়ে তোলায় প্রথম নেতৃত্ব দেয় সুমেরীয়রা। এরাই মেসোপটেমীয় সভ্যতার ভিত্তি গড়ে। সুমেরী মূলত একটি জাতির নাম। তাঁদের আদি বাসস্থান ছিলো মেসোপটেমিয়ার (বর্তমান ইরাক) উত্তর-পূর্বে অবস্থিত এলামের পাহাড়ী অঞ্চলে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে এদের একটি শাখা মেসোপটেমিয়ার দক্ষিণে বসতি গড়ে তোলে। তাঁদের নামানুসারে এ অঞ্চলটিকে সুমেরীয় অঞ্চল হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। আর তাঁদের বিকাশ করা সভ্যতার নামই সুমেরীয় সভ্যতা।

সুমেরীয়রা খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দের পূর্বেই সুমেরু নগর গড়ে তোলে। এটি ছিলো মূলত একটি কৃষিভিত্তিক সভ্যতা। সমাজব্যবস্থা ছিলো শ্রেণীভিত্তিক। ধর্ম মন্দিরের পুরোহিত ছিলেন সমাজের শাসক। সভ্যতায় এদের প্রধান অবদান কিউনিফর্ম লিপি ও গণনা পদ্ধতি আবিস্কার। সুশৃঙ্খল জীবনের জন্য এরা আইনের কাঠামো প্রতিষ্ঠা করেছিলো। ভাস্কর্য, চিত্রশিল্পী ও সাহিত্যের বিকাশে তাঁদের অবদান অবিস্মরণীয়।

সুমেরীয়দের সামাজিক অবস্থা: সুমেরীয় সমাজের মানুষজন বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত ছিলো। যেমন: অভিজাত সম্প্রদায়। মূলত, উচ্চ শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত ছিলো শাসক, পুরোহিত, অভিজাত, সামন্ত প্রভু, বণিক, শিল্পমালিক এবং উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মকর্তাগণ এই শ্রেণীভূক্ত ছিলেন। এছাড়া ছিলেন মধ্য শ্রেণীয় সমাজ। চিকিৎসক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীগণ, স্বাধীন জমিমালিক (কৃষক) এই শ্রেণীর অন্তর্গত ছিলেন। সবশেষে ছিলেন নিম্ন শ্রেণীর মানুষজন। দাস, ভূমিদাস, সাধারণ শ্রমিকগণ তথা সর্বসাধারণ এই শ্রেণীভূক্ত নাগরিক ছিলেন।

সুমেরীয়দের ধর্মীয় রীতি: সুমেরীয় ধর্মের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ছিলো। প্রথমত, সুমেরীয়রা বহু দেবতায় বিশ্বাসী ছিলেন। দ্বিতীয়ত, এদের ধর্ম ছিলো আদ্যোপান্ত ইহজাগতিক। তৃতীয়ত, এদের ধর্ম বিশ্বাসে নৈতিকতার অভাব ছিলো স্পষ্ট। তারা বৃষ্টির, বাতাস, পানি, উর্বরতা, প্লেগ ইত্যাদি প্রাকৃতিক শক্তিকে দেবতা মনে করতো। তাঁদের কেন্দ্রীয় ধর্ম মন্দিরের নাম ছিলো ‘জিগুরাত’ আর ধর্মগুরুকে তারা ‘পাতেজি’ নামে সম্মান জানাতো।

সভ্যতার বিকাশে সুমেরীয়দের অবদান: সভ্যতার বিকাশে সুমেরীয়দের দান ব্যাপক ও বিশাল। নিচে এ বিষয়ে আলোচনা করা হলো:

১। প্রশাসনে অবদান: ২৮০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের আগে সুমেরীয় সভ্যতা ৩০ টি নগর রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিলো। এসব নগর রাষ্ট্র প্রধানকে পাতেজি বলে সম্বোধন করা হতো। তিনি একাধারে ছিলেন প্রধান পুরোহিত, সেনাপ্রধান ও কৃষি বিভাগের প্রধান। সুমেরীয় সম্রাট ডুঙ্গি সর্বপ্রথম এই ৩০ টি নগর রাজ্যকে একত্রিত করে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ফলত, একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরী হয় সুমেরীয়দের তত্ত্বাবধানে।

২। লিখন পদ্ধতি আবিস্কার: এক ভিন্ন ধরণের লিখন পদ্ধতির উদ্ভব ঘটায় সুমেরীয়রা। প্রথমদিকে তারাও মিশরীয়দের মতো চিত্রলিপি ধাচের লেখন পদ্ধতি ব্যবহার করতো। তবে, দ্রুত ভাব প্রকাশের জন্য ক্রমশ এই লেখন পদ্ধতির পরিবর্তন আনে তারা। এভাবেই মেসোপটেমিয়াতে এক নতুন ধরণের লেখন পদ্ধতি উদ্ভাবিত হয়। কাদামাটির স্লেটে নল-খাগড়ার কলম দিয়ে এক রকম কৌণিক রেখা ফুটিয়ে তোলা হতো। খাঁজ কাটা এ চিহ্নগুলো অনেকটা ইংরেজি অক্ষর ‘v’ এর মতো। আবার, কখনো তীরে মতো ডিজাইন করেও অক্ষর লেখা হতো। প্রাচীন সুমেরীয়দের এই লিপির নাম দেয়া হয় কিউনিফর্ম লিপি, যা মেসোপটেমীয় লিপি হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। সুমেরীয় ভাষায় ৫০০ এর বেশি কিলবাকার সাংকেতিক চিহ্ন ছিলো। এই লিপি বাম থেকে ডান দিকে লেখা হতো।

৩। কৃষি: সুমেরীয়দের আয়ের মূল উৎস ছিল কৃষি। কৃষিকার্য পরিচালনার জন্য উন্নত সেচ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলো তারা। গম, যব, বার্লি, খেঁজুর, শাক-সব্জি ছিলো তখনকার মূল কৃষি পণ্য।

৪। আইন: সুশৃঙ্খল জীবন পরিচালনার জন্য সুমেরীয়গণ এক আইনের কাঠামো গড়ে তোলে। প্রাচীন সুমেরীয় সম্রাট ডুঙ্গি এসব আইন প্রণয়ন করেন। কঠোর এসব আইনে ছিলো, চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত এবং অঙ্গের বদলে অঙ্গ কর্তনের বিধান। ডুঙ্গি কর্তৃক গৃহীত এই আইনই ছিলো পৃথিবীর প্রথম আইন। এই আইন ছিলো প্রতিশোধমূলক। পরবর্তী অনেক সভ্যতা এই আইন গ্রহণ করে।

৫। ব্যবসা-বাণিজ্য: প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলো সুমেরীয়রা। ফিলিস্তিন, ফিনিশিয়া, ক্রীট, ইজিয়ান দ্বীপমালা, এশিয়া মাইনর এবং মিশরের সাথে তাঁদের বাণিজ্য সম্পর্ক ছিলো। ধারণা করা হয়, তাঁদের বাণিজ্য বিস্তৃতি ভারতেও ছড়িয়েছিলো।

৬। বিজ্ঞান চর্চা: বিজ্ঞানের প্রসারে সুমেরীয়দের দান ব্যাপক। জলঘড়ি ও চন্দ্রপঞ্জিকা তাদেরই অবদান। জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতশাস্ত্রেও তারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। ৩৬০ ডিগ্রীতে বৃত্ত বিভাগ ও ৬০ ভিত্তিক গননা পদ্ধতি তাদেরই চালু করা।

শিল্পকলায় সুমেরীয়দের দান: উপরোক্ত আলোচনা হতে নিঃসন্দেহে ইতিহাসে সুমেরীয়দের অবদান ও কর্মে সুনিপুণতা সম্পর্কে একটি সম্যক ধারণা লাভ করা সম্ভব। শিল্পকলার ক্ষেত্রে সুমেরীয়দের এসব কাজের প্রভাব পড়েছিলো ব্যাপক অর্থেই। সুরক্ষিত শহর নির্মাণে তারা ছিলেন দক্ষ, ভাস্কর্য নির্মাণেও ব্যাপক অবদান রেখেছেন এবং দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

সুমেরীয়ান ভাস্কর্যের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এগুলোতে বড় বড় চোখ ও সিলিন্ডার আকৃতির দেহ পরিলক্ষিত হয়। সুমেরীয়ান ভাস্কর্যের মধ্যে অন্যতম ‘টেল-আসমারে আবুর মন্দির’ হতে প্রাপ্ত এই উপাসনালয়ের পূজারীদের কতগুলো মুর্তি। এসব মুর্তিগুলোর সবকটি উপাসনার ভঙ্গিতে দন্ডায়মান। এগুলো ঘাঘরা সদৃশ পোষাক পরিহিত। পুরুষ মুর্তির লম্বা ও কুঞ্চিত চুল ও দাড়ি সম্পূর্ণ কামানো। সিলমোহর তৈরী করে ও ধাতব্য দ্রব্য খোদাই করে তারা মূর্তি নির্মাণ করতেন। চিত্রশিল্পের বিকাশেও তাঁদের দক্ষতা ও অবদান ছিলো ব্যাপক। ধর্মীয় স্থাপনা জিগুরাত নির্মাণের মাধ্যমে উন্নত স্থাপত্য রীতির ছাপ রাখতে সক্ষম হয়েছিলো এই সভ্যতার মানুষজন।

লিখন পদ্ধতির আবিষ্কারের ফলে সুমেরীয়রা সাহিত্য রচনায়ও উদ্যোগী হয়। তাদের বেশিরভাগ সাহিত্য অবশ্য বিভিন্ন আদিরস সংক্রান্ত রোমাঞ্চকর ও কামনা উদ্দীপক ঘটনা এবং রূপকথা ও যৌনাচারের ঘটনা সম্বলিত। এসবের মধ্যে গিলিগামেশের রূপকথা সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়।

সুমেরীয়গণ খিলান ও গন্ধকের ব্যবহার শিখেছিলো। কখনো কখনও তারা দালানে স্তম্ভ ব্যবহার করত। তাদের ধর্মমন্দির ছিল কয়েকতলা পর্যন্ত উঁচু, যার প্রাসাদের দেয়ালে মানুষ ও পশুর ছবি থাকত। তাদের ধাতব অলংকারের খোদিত চিত্র প্রশংসার দাবিদার ছিলো। সেখানে তারা জীবজন্তুর দেহ খুব নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলতো।

ষাড় ছিল তাদের ভাস্কর্যের অন্যতম বস্তু, যাতে বাহুর সবল পেশীর প্রাধান্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। এছাড়া ভাস্কর্যে ঈগল পাখির প্রতীক তারাই প্রথম ব্যবহার করেছিল। এতে বুঝা যায় যে, সুমেরীয়রা শক্তির পূজারী ছিল।

সুমেরীয়দের শিল্পকলার মান ও সৌকর্য ছিল অতুলনীয়। বিভিন্ন উপাদানে সুমেরীয় কারুশিল্পেরও ব্যাপক উৎকর্ষ সাধিত হয়। চিত্রকলার মধ্যে তারা ধাতুর তৈরি পাত্রে বিভিন্ন চিত্রকর্ম করত। এছাড়া, তাদের প্রধান শিল্প ও চিত্রকর্ম ছিল জুয়েলারি।

তাছাড়া, সুমেরীয় রাজকীয় সমাধি ও বিভিন্ন প্রাচীন শহরে খনন করে যে বিপুল প্রত্নসামগ্রী পাওয়া গেছে, তাতে খোদিত লিপি ও চিত্রের মধ্যে সুমেরীয় ইতিহাস, কৃষ্টি ও প্রাচীন ঐতিহ্য নিহিত রয়েছে।

সর্বোপরি, প্রাচীন সুমেরীয়গণ যে এক সুপ্রাচীন মানবসভ্যতার উন্মেষ ও বিকাশ ঘটিয়েছিলো, তা বহমান মানবসভ্যতায় এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও অবদান রেখে চলেছে। যদি আমরা স্বীকার করি যে আমাদের আজকের সভ্যতা আমাদের সামগ্রিক মানব অতীতের ফলাফল, তাহলে বলতে হবে সেখানে প্রাচীন সুমেরীয়দের অবদান অনেক বেশি।

পরিশেষে, লিখাটির তথ্যসূত্র হিসেবে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রাচীন সভ্যতাসমূহ (ইউনিট-২, পাঠ-৩) ব্যবহার করা হয়েছে। আমাদের দেশের মতো ক্রমশ উন্নতির দিকে ধাবমান সদ্য উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের জন্য সুমেরীয় সভ্যতার ক্রমবিকাশ, সমাজব্যবস্থা ও ধ্বংসের কারণ, সকলই শিক্ষার উপাদান। আমরা যদি আমাদের ইতিহাসের সভ্য ও বিলুপ্ত জাতিসমূহের উত্থান ও পরিণতি থেকে শিক্ষা না নিতে পারি, তবে আমাদের উন্নতিও বিলম্বিত হবে। তাই, আমাদের রাষ্ট্রীয়-সামাজিক উন্নতির জন্যেও অতীত ইতিহাস জানা অত্যন্ত জরুরী।

লেখক: নওশীন নাওয়ার রাফা, শিক্ষার্থী, শিল্পকলার ইতিহাস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, [email protected]