বিঘা প্রতি ব্যয় বাড়বে ৬৮০ টাকা
ডিজেলের আগুনে কৃষিকাজের সেচের ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ

ওয়াহিদ জামান, বাংলাদেশ মেইল ::

দেশের জ্বালানি খাতে সরকারি ভর্তুকি কমানোর প্রক্রিয়া হিসেবে সব ধরনের জ্বালানি তেলে দাম বৃদ্ধির কারণে দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে দেশের প্রান্তিক চাষিদের কপালে। সারের দাম বৃদ্ধি, ধারাবাহিক বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের  পরেই দেশের কৃষকদের জন্য নতুন দুঃসংবাদ ‘ ডিজেলের ‘ দাম বৃদ্ধি। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) তথ্যানুযায়ী, দেশের ১ কোটি ২৩ লাখ কৃষক ডিজেলচালিত যন্ত্রের মাধ্যমে সেচকাজ পরিচালনা করেন। ডিজেলের বাড়তি দামের কারণে উৎপাদন খরচ বাড়ার দুশ্চিন্তায়  দেশের বিপুল সংখ্যক কৃষক।

বাংলাদেশে কৃষিজমি চাষাবাদের উপকরণ হিসেবে বীজ, সেচ, প্রাকৃতিক ও রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও বালাইনাশক ব্যবহার করা হয়ে থাকে৷  বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) রিপোর্ট  অনুযায়ী কৃষিকাজের মোট খরচের প্রায় ৪৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ ব্যয় হয় সেচকাজে।

এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে এবারের বর্ষা মৌসুমে পানির অভাবে ধান চাষ করেন নি অনেকেই৷ ডিজেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সামনের বোরো মৌসুমে  কৃষিকাজের অপরিহার্য  সেচের বাড়তি খরচের চাপ সামাল দেয়াটা কঠিন হবে কৃষকদের। এছাড়া বিদ্যুৎ সংকটের কারণে ভোগান্তিতে রয়েছেন কৃষকরা।  সংশ্লিষ্টরা বলছেন বিশ্ববাজারে কেমিক্যাল সারের দাম বৃদ্ধির কারণে নতজানু দেশের কৃষিখাতে শেষ পেরেক মারা হয়েছে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে।

উত্তরাঞ্চের বেশ কয়েকজন কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সেচকাজ পুরোপুরি ডিজেল নির্ভর হওয়ার কারণে ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ৩৪ টাকা বৃদ্ধি কৃষকের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরিয়েছে।

রংপুরের বদরগন্জের রাধানগর ইউনিয়নের কৃষক আবদুল হালিম বলেন, এমনিতেই কৃষিজ উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায় না।  তার উপর মাত্রাতিরিক্ত উৎপাদন খরচের বোঝা।

দুশ্চিন্তায় ঘুমহীন রাত কাটিয়েছেন বদরগন্জের গোপীনাথপুর ইউনিয়নের আরেক কৃষক রহিম মোল্লাও। তিনি বলেন, ভোগান্তির তালিকায় নতুন করে যোগ হবে সেচের উচ্চ ব্যয় এবং রাসায়নিক সারের দাম।কৃষিখাতের দূর্দিন দেখতে হবে। ‘

দেশের কৃষিখাত পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে কৃষককে যথাসময়ে সঠিক মানের বীজ দিতে না পারা, শস্যের ন্যায্য মূল্য দিতে না পারা, দেশে খাদ্য শস্যের উৎপাদন ভালো হলেও কৃষকের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিতের বদলে আমদানির সুযোগ  অবারিত করে রাখা, কৃষি উপকরণ সুবিধার অভাব ইত্যাদি বিষয়কে দায়ী করেছেন এই অঞ্চলের কৃষকরা ।

কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক মনে করেন , জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে কৃষকরা কিছুটা ক্ষতির সম্মুখীন হলেও কৃষিজ উৎপাদনের নতুন নতুন পণ্য রপ্তানি সেই ক্ষতি পুষিয়ে দেবে।  এদেশের কৃষকরা পরিশ্রমী, তারা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন। তবে কৃষকদের একটু লাভ কম হবে। ‘

ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ডিজেলের দাম বিঘাপ্রতি সেচের জন্য বাড়তি ৬৮০ টাকা খরচ জোগানোর পাশাপাশি ধান বিক্রিতে প্রায় ৬ শতাংশ মুনাফা কমবে কৃষকের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে শস্য ও শাকসবজি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ০.৫৮ শতাংশ। জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গেও শস্য উৎপাদন খাতের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়ে গেছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষায়ও উঠে এসেছে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের ভিত্তি মূল্যে শস্য ও শাকসবজি খাতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২.২২ শতাংশ।

বিপিসির তথ্যমতে,দেশে গত বছরও ২২ হাজার কোটি টাকার বেশি পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। যার বেশিরভাগই ছিল ডিজেল। শিল্প ও পরিবহন খাতের পরে ডিজেল ব্যবহার করা তৃতীয়  বৃহত্তম  খাতটি হলো  কৃষি খাত। কৃষিকাজে শুধু সেচেই ডিজেল ব্যবহৃত হয় মোট ডিজেলের ১৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ফলে বর্ধিত ডিজেল মুল্যের মুল বোঝা কৃষকদের উপরই পড়বে।

বাংলাদেশ  সার উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নই। এরই মধ্যে গ্যাসের অভাবে চিটাগং ইউরিয়া সার ফ্যাক্টরি লিমিটেডে ( সিইউএফএল) সার উৎপাদন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কৃষিকাজে দেশে রাসায়নিক সারের বিপুল চাহিদা থাকায় সার সরবরাহের ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয় সরকারকে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বাজারে ডলারের সংকটের কারণে ফলে বিশ্ববাজারে সারের দাম বেড়েছে । সেজন্য দেশের অভ্যন্তরীণ সার উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো ছাড়া কোন বিকল্প নেই বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (বিএডিসি) পরিচালক আমিরুল ইসলাম বলেন,  ‘ জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর জন্য কৃষকদের পর্যাপ্ত সহায়তা দিতে হবে। কোনোভাবেই যেন সারের অপচয় না হয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। তাছাড়া অনেক সময় কৃষকেরা বুঝতে পারেন না কোন জমিতে কতটুকু সার দিতে হয়। সারের দাম বৃদ্ধির প্রভাব যেন উৎপাদনে না পড়ে।  ‘

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের কৃষিখাতকে বাঁচাতে তিউনিসিয়া, মরোক্কোসহ যেসব দেশ থেকে  সার আমদানি করা হয়, তাদের সঙ্গে আগে ভাগেই তিন অথবা পাঁচ বছর মেয়াদি চুক্তি করা উচিত। যেন কোনোভাবেই রাসায়নিক সারের সংকটে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যাহত না হয়।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার জরিপ থেকে জানা যায়, ৩৩ শতাংশ কৃষকের প্রত্যাশা এবছরও উৎপাদন একই থাকবে, ৩২ শতাংশ কৃষকের ধারণা ৫-২০ শতাংশ উৎপাদন কমবে এবং ২৩ শতাংশ কৃষকের আত্মবিশ্বাস উৎপাদন ৫-২০ শতাংশ বাড়বে।

কৃষিকাজে সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, দেশের মোট চালের অর্ধেকের বেশি উৎপাদন হয় বোরো মৌসুমে। বোরো চাষ অতিমাত্রায় সেচনির্ভর। কৃষকদের মতে, এ ধান চাষে মোট খরচের প্রায় অর্ধেকই ব্যয় হয় সেচকাজে। তথ্যমতে, বোরো মৌসুমে সেচকাজে নিয়োজিত থাকে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ ডিজেলচালিত পাম্প।

কৃষিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, ‘সম্প্রতি ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষিপণ্য পরিবহন ও সেচ খরচও আনুপাতিক হারে বাড়বে। সেচ খরচ বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে চুক্তির সময় পাম্পমালিক ও কৃষকদের মধ্যে বিরোধ বাড়তে পারে । ‘

প্রান্তিক কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়,  এখনো জমিতে সেচ দেয়ার ক্ষেত্রে অগভীর নলকূপের প্রাধান্য রয়েছে। ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র দিয়েই সাধারনত জমিতে পানি সরবরাহ করা হয়।  মোট সেচকৃত জমির ৪৭ শতাংশ জমিতে সেচকাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বিদ্যুচ্চালিত যন্ত্র, বাকি ৫৩ শতাংশে  পানি দিতে ব্যবহার করা হয় ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র। বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে ডিজেলের ব্যবহার যেমন বাড়বে তেমনিভাবে ডিজেলের বাড়তি দামের বোঝা গিয়ে পড়বে দেশের প্রান্তিক কৃষকদের উপর।