চসিকে প্রকল্প পরিচালক গোলাম ইয়াজদানী আর দূর্নীতিবাজদের রশি টানাটানি

বাংলাদেশ মেইল  ::

প্রকল্প পরিচালক হিসেবে যোগ দেবার পর থেকে প্রকৌশলী গোলাম ইয়াজদানীকে অনিয়ম দূর্নীতির সঙ্গী হিসেবে পাচ্ছেন না চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দূর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট। প্রকল্প পরিচালক হিসেবে যোগ দেওয়ার পরপরই প্রকল্পের জন্য নতুন হিসাব খুলতে বলে প্রতাপশালীদের চমকে দেন তিনি।

সুত্রমতে,নগরের সড়ক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের ২৫ টি প্যাকেজের টেন্ডারে অনিয়ম ও কাজ বিক্রির অভিযোগ উঠার পর সেসব কাজের বিপরীতে কার্যাদেশ দিতে রাজি হন নি তিনি। অগত্যা উপ প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী জসিম উদ্দিনকে কার্যাদেশ ইস্যু করার নির্দেশ দেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র এম রেজাউল করিম। অভিযোগ উঠে, টেন্ডারের অর্ধেক বিক্রি করা হয়েছে ; বাকি কাজ লটারি করে ঠিকাদারদের দেয়া হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী গোলাম ইয়াজদানীকে চাপে ফেলার কৌশল হিসেবে সপ্তাহে মাত্র দুদিন (বুধবার ও বৃহস্পতিবার) অফিস করার বিষয়টি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে দাপ্তরিকভাবে অবহিত করেছে চসিক। চসিকের দাবি এতে আড়াই হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটির কাজে গতি আসছে না। শঙ্কা তৈরি হয়েছে নির্দিষ্ট সময়ে প্রকল্প শেষ করা নিয়েও। এমন কি যে উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়েছে তা ‘ব্যাহত’ হওয়ারও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ‘

জানা যায়, গোলাম ইয়াজদানী স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী। তাকে গত ১৪ আগস্ট ‘চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতায় এয়ারপোর্ট রোডসহ বিভিন্ন সড়কসমূহ উন্নয়ন ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে অফিস আদেশ জারি করেছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগ। পরে ২০ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর দপ্তর থেকে আরেকটি অফিস আদেশ জারি করা হয়। এতে গোলাম ইয়াজদানীকে সপ্তাহে দুদিন চসিকে কাজ করতে বলা হয়। তখন থেকেই বিষয়টি আমলে নেয়নি চসিক। এছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম মানিক প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিতে চেয়ে ব্যর্থ হন। এখন কাজে গতি কমার কথা বলে গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রালয়কে দাপ্তরিকভাবে জানিয়েছে চসিক।

চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শহীদুল আলম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, সিটি কর্পোরেশনের এ যাবৎকালের সবচেয়ে বৃহৎ প্রকল্পটির সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প পরিচালকের পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্পটি যথাসময়ে বাস্তবায়নের সাথে আগামী জাতীয় নির্বাচন ও সরকারের ভাবমূর্তির বিষয় জড়িত রয়েছে। কারণ এ প্রকল্পের মাধ্যমে চট্টগ্রামের নান্দনিক সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। এ ধরনের প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালকের কর্মস্থলে সার্বক্ষণিক উপস্থিতি একান্ত প্রয়োজন। প্রকল্প পরিচালক যদি চসিকে সপ্তাহে শুধুমাত্র দুদিন দায়িত্ব পালন করেন তাহলে প্রকল্প বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত হবে। সিটি মেয়র এ প্রকল্পের মাধ্যমে চট্টগ্রাম শহরের যে পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করেছেন তা ব্যাহত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বৃহৎ প্রকল্পটির সুফল হতে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম বঞ্চিত হবে।’

এ বিষয়ে সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, প্রকল্প পরিচালক বুধবার ও বৃহস্পতিবার অফিস করেন। যেহেতু এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প তাই প্রকল্পের পরিচালক বেশি থাকলে আমাদের জন্যও সুবিধা বেশি। পুরো সপ্তাহ এখানে থাকলে কাজেও গতি আসবে। তাই তাকে যেন সার্বক্ষণিক চসিকে রাখা হয় সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখতে নির্দেশনা দিয়েছি। ‘

সুত্রমতে, চসিকে যোগ দেবার পর থেকেই কার্যত একঘরে করে রাখা হয়েছে তাকে। সমঝোতা করতে রাজী না হবার কারণে বিপাকে পড়েছে প্রকৌশল বিভাগের দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীরা। সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে যেন ইয়াজদানীকে সার্বক্ষণিক চসিকের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালনের আদেশ জারি করার প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করে সেই অনুরোধ করার পেছনেও ঘুষ বাণিজ্য।

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ঠিকাদারদের সাথে কথা বলে জানা যায় বিভিন্ন প্রকল্পের টেন্ডার বিক্রিতে সুবিধা করতে না পাবার কারনে আরেকজন পরিচালক চান চসিক। বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৮% ঘুষে ‘টেন্ডার বিক্রি’র সংবাদ প্রকাশিত হলেও এই বিষয়ে চুপ চসিকের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

চসিক তথ্যমতে , নতুন প্রকল্পের আওতায় বিমানবন্দর সড়ককে চার লেনে উন্নীত করার পাশাপাশি ৬০০ মিটার ওভারপাস নির্মাণ করা হবে। ওভারপাস নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৮৪ কোটি টাকা। এছাড়া ২ হাজার ১০৪ কোটি ৩৯ লাখ টাকায় নগরের ৭৬৯ কিলোমিটার রাস্তার উন্নয়ন, ৫৬ কোটি টাকায় ২২৪ মিটার করে ১৪টি ব্রিজ, ৫৮ কোটি টাকায় ১৫২০ মিটার করে ৩৮টি ফুট ওভারব্রিজ, ১৪ কোটি টাকায় ৮৭ মিটার করে ২২টি কালভার্ট নির্মাণ, ১২ কোটি টাকায় ১০টি গোল চত্বরের উন্নয়ন করা হবে। প্রকল্পের আওতায় ২৯ কোটি ৮০ লাখ টাকায় ১৫টি নির্মাণ যন্ত্রপাতিও ক্রয় করা হবে।
জানা গেছে, ম্যাচিং ফান্ডের শর্ত ছাড়াই চসিকের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এ প্রকল্পটি গত ৪ জানুয়ারি ২ হাজার ৪৯০ কোটি ৯৬ লাখ ৬৯ হাজার টাকায় অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পটিতে সম্পূর্ণ অর্থায়ন করবে সরকার। জিও অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয় ২০২২ সালের ১ মার্চ থেকে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

সুত্রমতে, ঠিকাদাররা কাজ পাবার জন্য অনেকেই ঘুষের অগ্রীম টাকা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূল মনে না হওয়ার কারণে বেশ চাপে রয়েছেন চসিকের প্রকৌশল বিভাগের দূর্নীতির কুশীলবরা। শুধুমাত্র নয়টি জোনের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পেতে প্রকৌশল বিভাগের শীর্ষকর্তাকে ঘুষ দেয়া হয়েছে সাড়ে চার কোটি টাকা। শুধুমাত্র নির্বাহী প্রকৌশলীর স্কেল পেতে একজন প্রকৌশলীকে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে ঘুষ দিতে হয়েছে চল্লিশ লক্ষ টাকা। এমন চড়া বিনিয়োগের সুফল পেতে মরিয়া হয়ে আছেন প্রকৌশলীরা। বাকি থাকা টেন্ডারের আগে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে পরিবর্তন না আসলে কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়া সম্ভব হবে না – সেটি প্রমাণিত হয়েছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি সুত্র জানায়, একনেকে বড় প্রকল্প অনুমোদনের পরপরই প্রকৌশলীদের সিন্ডিকেটের ছক অনুযায়ী চসিকের প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলামকে প্রকল্পটির পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেবার তদবির চালান। প্রধান প্রকৌশলীর রফিকুল ইসলামের স্বাক্ষরে গত ১২ মে দরপত্রও আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু তার বিরুদ্ধে চসিকে ঠিকাদারির ( ছেলের নামে) গুরুতর অভিযোগ থাকার কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে মন্ত্রণালয়। পরে ১৪ জুলাই চসিকের নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) আবু সাদাত মোহাম্মদ তৈয়্যবকে প্রকল্প পরিচালক করা হয়। তিনিও গত ৭ আগস্ট দরপত্র আহ্বান করেন। প্রকৌশল বিভাগের দূর্নীতির বিষয়ে জানাজানি হলে পাঁচদিন পরই ১১ আগস্ট স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করে তাকে প্রকল্প পরিচালক থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।

এরমধ্যে প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগ তদন্তে চট্টগ্রাম আসে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। অভিযোগ থেকে সাফসুতরা হতে প্রধান প্রকৌশলীকে খরচা করতে হয়েছে আড়াই কোটি টাকা। সুত্রমতে, চসিকের প্রকৌশল বিভাগের ঘুষের খাতা থেকে সেই টাকা ব্যয় করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের অন্তত ১৫ জন প্রকৌশলীর দূর্নীতি অনিয়ম, টেন্ডার বাণিজ্যে শত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। চসিকে পরিবারের সদস্যদের নামে ঠিকাদারি করা প্রকৌশলীর সংখ্যাও কম নয়। সব জেনে বুঝে বোবাকর্তা’র ভূমিকায় রয়েছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে আসা প্রকল্প পরিচালক গোলাম ইয়াজদানী আর সিটি করপোরেশনের দূর্নীতিবাজদের রশি টানাটানিতে শেষ পর্যন্ত উন্নয়ন প্রকল্পের ভরাডুবির আশংকা করছেন বিশ্লেষকরা।