শরীফ হারেনি, হেরেছে সুশাসন
বছর জুড়ে আলোচনায় দুদকের শরীফ

রাহাত আহমেদ 

বছরের প্রথম থেকে শেষ অব্দি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন দুর্নীতি দমন কমিশনের  ( দুদক) চাকরিচ্যুত উপ সহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিন। উন্নয়ন প্রকল্পের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা দূর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে সারাদেশের মানুষ, সুশীল সমাজের প্রশংসা কুড়ালেও শেষ পর্যন্ত নিজের চাকরি হারাতে হয়েছে শরীফ উদ্দিনকে। অপরাধ  বিশ্লেষক, সুশাসনের জন্য কাজ করা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন স্পষ্ট করেছে যে, দূর্নীতিবাজদের চাপে নতি স্বীকার করেছে দুদক। দূর্নীতি বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দুদকের হাতেই নিজের চাকরি কোরবানি দিয়ে শরীফ উদ্দিন দেশের উন্নয়নের একমাত্র প্রতিবন্ধকতা ‘ দূর্নীতি’র শেকড়ের বিস্তৃতি কতদুর সেটিই প্রমাণ করেছেন।

(ডিএডি) শরীফ উদ্দিন প্রায় সাড়ে ৩ বছর দুদকের চট্টগ্রাম সমন্বিত কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। সে সময় এনআইডি সার্ভার ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের  ভোটার করার অভিযোগে ২০২১ সালের জুনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) একজন পরিচালক, ৬ কর্মীসহ আরও ১০ জনের বিরুদ্ধে তিনি মামলা করেছিলেন। এ মামলার পরপরই ১৬ জুন তাকে চট্টগ্রাম থেকে পটুয়াখালীতে বদলি করা হয়।

দুদকের সাবেক কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিন প্রায় দুই  বছর আগে চট্টগ্রাম কার্যালয়ে যেসব তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলেন সেসবের  ভিত্তিতে এখনো কোন ব্যবস্থা নেয়নি কমিশন। উল্টো শরীফ উদ্দিনকে বদলি করে কোন কোন প্রতিবেদন  পুনরায় তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘ ইয়াবা সিন্ডিকেট, ভূমি অধিগ্রহণের দালাল, প্রভাবশালীদের  তদন্ত প্রতিবেদন থেকে বাদ দেয়ার চাপ ছিল।  প্রভাবশালী আমলা ও রাজনীতিবিদদের নাম বাদ দেবার জন্য  চাপ এসেছিল। একসপ্তাহের মধ্যে চাকরি খেয়ে দেবার হুমকি ছিল,এসবে  নতি স্বীকার করলে চাকরি হারাতে হতো না। তবে দেশের মানুষের ভালোবাসা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। দেশপ্রেমিক গণমাধ্যমকর্মীরা, দুদকের সহকর্মী পাশে দাঁড়িয়েছিল – এটি দূর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আশার আলো। ‘

শরীফ তার চাকরির মেয়াদকালে বিভিন্ন খাতে অনিয়মের তদন্তের  জন্য আলোচিত হন। সে সময় তিনি ইসি কর্মকর্তা, কর্মচারী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (সিসিসি) ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ইয়াবা চোরাকারবারি, রোহিঙ্গা, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের কর্মকর্তা, সরকারের স্পর্শকাতর আমলাদের বিরুদ্ধে ১ ডজনেরও বেশি মামলা করেন।

বিশ্লেষকদের মতো দুর্নীতিবাজদের ক্ষমতার কাছে পরাজিত শরীফ উদ্দিন, দুর্নীতি দমন কমিশনে কর্মরত দেশপ্রেমিক  সংখ্যালঘু কর্মকর্তা কর্মচারীদের ঐক্য প্রতিষ্ঠায় নতুন পথ দেখিয়েছেন। দুদক সার্ভিস এসোসিয়েশন নানা ইস্যুতে দূর্নীতির বিপরীত পক্ষের ঐক্যের বন্ধন তৈরির বার্তা দিয়েছেন। যদিও সেটি বেশিদুর এগোতে দেয়া হয় নি।  তথাপি সরকারি -বেসরকারি সংস্থার রন্ধ্র রন্ধ্রে ডুকে পড়া প্রাতিষ্ঠানিক দূর্নীতির অন্ধকারে  আশার আলো জ্বালানোর এই প্রচেষ্টা সাধুবাদ পেয়েছে।

শরীফ উদ্দিন যে তিনটি প্রকল্পে দুর্নীতির তদন্ত করেছিলেন সেগুলো হচ্ছে – কক্সবাজার পানি শোধনাগার প্রকল্প, ইস্টার্ন রিফাইনারি সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং ইন্সটলেশন এবং পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশনের ভবন নির্মাণ। এ প্রতিটি কাজের জন্য সরকারি অর্থে জমি অধিগ্রহণ করতে হয়েছে। সেখানেই বড় ধরনের অনিয়মে জড়িয়েছিলেন রাজনীতিবিদ, সরকারী কর্মকর্তা, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার বেশ কিছু প্রভাবশালী মানুষ।

প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় রাজনীতিবিদের সংযোগে কোটি কোটি টাকা লোপাট হয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে। কিন্তু চাকরিচ্যুত হবার পরে তদন্ত, মামলা কোনটিরই দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। কক্সবাজারে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের ভবন নির্মাণের জন্য যখন জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছিল, তখন জমি হারাতে বসেছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা নরুল আলম।

তার জমি অন্যদের নামে দেখিয়ে অধিগ্রহণের পায়তারা করেছিল দালাল চক্র এবং জেলা ভূমি অধিগ্রহণ কমিটির জানিয়েছেন  আলম। শেষ পর্যন্ত আইনি লড়াই চালিয়ে তিনি জায়গা টিকিয়ে রেখেছেন,  কিন্তু দুদক কর্মকর্তা শরীফ  চাকরি হারিয়ে মুদিদোকানে কাজ করে সংসার চালানোর মতো খবর গণমাধ্যমের কল্যাণে সারাদেশের মানুষ জেনেছে।

ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে যেসব দুর্নীতির কথা দুদক কর্মকর্তা শরীফ উদ্দিনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল সেগুলো হচ্ছে – ক্ষতিপূরণের টাকা দেবার ক্ষেত্রে কমিশন আদায় করা, একজনের জমি অন্যজনের নামে দেখানো, বেশি দামে জমি কেনা, সরকারি অন্য আরেকটি সংস্থার অধিগ্রহণ করা জমি নতুন করে অধিগ্রহণ করা। সারাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে লুটপাটের এমন দৃশ্য কক্সবাজারের উন্নয়ন প্রকল্পে পরিষ্কার হয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আকতার উল কবির মনে করেন, ‘ শরীফ উদ্দিনের তদন্তে উঠা আসা এসব অভিযোগ মিথ্যা নয়। সব উন্নয়ন প্রকল্পে দূর্নীতি অনেকটাই ওপেন সিক্রেট ।দুর্নীতি তো হয়েছে অনেক। শত শত অভিযোগ আছে। এগুলো প্রকাশ্যেই হয়, এখনো হচ্ছে। ‘

তবে দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী খুরশিদ আলমের মতে , শরীফ উদ্দিনের তদন্তের সাথে তাকে বরখাস্ত করার কোন সম্পর্ক নেই। চাকুরি বিধি না মানায় শরীফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

খুরশিদ আলম বলেন, যখন কোন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয় তখন কমিশন সেটি পর্যালোচনা করে এবং আইনগত দিক খতিয়ে দেখে। কোথাও ঘাটতি থাকলে সেটি নিয়ে অধিকতর তদন্ত হতে পারে।

দুর্নীতি দমন কমিশন কারণ যাই বলুক না কেন, কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন এতো বড় আকারের দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও সেগুলোর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা দেখা যায় নি। একারণেই তদন্তে শরীফের বাড়াবাড়ি কিংবা আইন  লঙ্ঘনের মতো অপরাধকে আমলে নিতে নারাজ সাধারণ মানুষ।