চকবাজারে পিডিবির ‘চাঁদা’র ফাঁদে এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা জিম্মি,বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন

বাংলাদেশ মেইল ::

চট্টগ্রামের চকবাজারের জয়নগরস্থ একটি ভবনে বিদ্যুৎ পরিদর্শক চাঁদাদাবি করে না পেয়ে পুরো ভবনটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। সোমবার সকালে ভবনটির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করার পর ভবনের ভাড়াটিয়া সর্বশেষ বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করার নথি উপস্থাপন করলেও সেই ‘পরিদর্শক’ এর মন গলাতে পারেন নি। এই ভবনে বর্তমানে উনিশ জন এইচএসসি পরীক্ষার্থী অবস্থান করছেন। সোমবার সকাল সাড়ে এগারোটায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়েছে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের।

জোনের দায়িত্ব পালনরত নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে অভিযোগ করা হলে তিনি উল্টো ভবনটিতে অবৈধ সংযোগ পাবার অভিযোগ করেন। ভবনের তত্বাবধায়ক এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করে বলেন, বিল পরিশোধ করছি প্রতিমাসে অবৈধ সংযোগ কেন থাকবে?

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায় ছাত্রীদের আবাসনের জন্য ভাড়া দেয়া ভবনটির পাঁচটি ফ্লোরে তিনটি পোস্ট পেইড মিটার ও দুটি প্রি পেইড মিটার  রয়েছে। নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ  করা নথিও রয়েছে । এছাড়া ভবনটির দুইটি প্রি পেইড মিটার নস্ট রয়েছে মর্মে বিদ্যুৎ বিভাগে বেশ কয়েকবার অভিযোগ দাখিল করা হলেও বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে ব্যবস্থা নেয়া হয় নি। এক বছরের বেশি সময় ধরে দুটি মিটার নস্ট থাকার কারণে পোস্ট মিটারের মাধ্যমেই বিল পরিশোধ করা হচ্ছে।

ভবনটির তত্ববধায়ক হোসনে আরা জানান, সোমবার সকালে বিদ্যুৎ বিভাগের জনৈক  নাজমুল এসে একটি চিঠি দিয়ে বলেন তার বসদের সাথে যোগাযোগ করতে। এর দশ মিনিট পরে দেখা যায় নাজমুল  নিজ উদ্দ্যেগে বিদ্যুতের মুল সংযোগ পোল থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন। দুপুরে বিদ্যুৎ বিভাগের প্রকৌশলী   ‘নাজমুল ‘কে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের রিসিট উপস্থাপন করলে তিনি নতুন অভিযোগ তোলেন। একটি বাতি অবৈধভাবে সংযোগ নিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। অথচ সেধরনের কোন অবৈধ লাইনের অস্তিত্বই মেলেনি ভবনটিতে। মুলত বেশ কয়েকমাস ধরে বিভিন্নভাবে মাসিক চুক্তিতে ‘ঘুষ’ চেয়ে আসছিলেন  সেই কর্মকর্তা । ‘

জয়নগর মহল্লা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নাফিজ ইমতিয়াজ সানজু জানান,  ‘ পুরো ভবনে নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করা হচ্ছে নিয়মিত। একটি বাতি কেন অবৈধ সংযোগ লাগিয়ে ব্যবহার করবে?  মুলত এই ভবনে বসবাসরত ছাত্রীদের অধিকাংশই এইচএসসি পরীক্ষার্থী।  ছাত্রীদের এইচএসসি পরীক্ষা চলার সময় সংযোগটি  বিচ্ছিন্ন করে,  ভোগান্তি সৃস্টির মাধ্যমে অনৈতিক সুবিধা আদায়ের কৌশল নিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা। ‘

তাসমিমা হোসেন নামের এক এইচএসসি  পরিক্ষার্থী  বলেন, ‘ কোন বিদ্যুৎ বিল বকেয়া নেই, তবুও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কারণ কি?   এইচএসসি পরীক্ষার সময়  এমনভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তারা এই ভবনে বসবাসরত  শিক্ষার্থীদের জিম্মি করেছে। যাতে মাসিক চাঁদার টাকা পৌঁছে দেয়া হয়। বাড়তি দামে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করবো,  আবার ঘুষও দেবো – এটা কেমন দেশ!

এই বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের ( রেয়াজউদ্দিন বাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী তৌহিদুল আলমের  কাছে ভবনের মালিকের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হলে তিনি ভবনটিতে ‘দুইটি’ অবৈধ সংযোগ থাকার কথা জানান। অথচ এরআগে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সেই কর্মকর্তা  অবৈধ সংযোগ থেকে একটি বাতি জ্বলার অভিযোগ করেছিলেন। সেই অভিযোগও সত্য নয় বলে স্থানীয়রা প্রতিবেদককে জানিয়েছেন। নির্বাহী প্রকৌশলী তৌহিদুল আলম সেই ভবনে দুটি অবৈধ সংযোগ থাকার নতুন অভিযোগ তোলেন।

স্থানীয়রা জানান, বিদ্যুৎ এর তিনটি মিটারের মাধ্যমে পুরো ভবনের নিয়মিত বিল পরিশোধ করা হচ্ছে। একটি বাতির জন্য অবৈধ লাইন দেবার প্রয়োজন কি?  মুলত এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে ফেলে অনৈতিক সুবিধা আদায় করতে গিয়েছিল বিদ্যুৎ পরিদর্শক নাজমুল। একইভাবে নানা অজুহাত দাঁড় করে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করার অভিযোগ করেছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তা নাজমুলের বিরুদ্ধে।

সরেজমিনে গিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা  ভবনের পার্শ্ববর্তী তিনটি বাড়িতে কথা বলে জানা যায় প্রতিটি বাড়ি থেকে মাসে পাঁচশো টাকা করে সংগ্রহ করছেন বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মচারীরা। এরমধ্যে  জয়নগর আবাসিকের এখলাস সাহেবের টিনসেট থেকে মাসে নেয়া হয় ‘ ৪০০’ টাকা। বিদ্যুৎ বিলের নথি অনুযায়ী বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা ভবনটির বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিপরীতে (মিটার নং ১১৯০৩২৫২৬০৮০   ১১৯০৩২৫০৩৪৪০)  চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে  ৩৪৩০ টাকা, ২০২২ সালের ডিসেম্বর ৩৬১৮ টাকা ,নভেম্বর ৪৭১৫ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চকবাজারের জয়নগর, পারসিভিল হিল, দেব পাহাড় এলাকার বিভিন্ন  আবাসিক ভবন ও শপিং মল থেকে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা নিয়মিত ‘ চাঁদা’ নেয়া সংগ্রহ করেন মাঠ পরিদর্শকদের মাধ্যমে। কিন্তু প্রি পেইড মিটারের কারণে সেই চাঁদার পরিমান কমে যাবার কারনে কৌশল পরিবর্তন করেছেন বিদ্যুৎ বিভাগের এসব অসাধু কর্মকর্তা। এলাকায় গড়ে উঠা ১২ টি ছাত্রী হোস্টেলকেও বিদ্যুৎ বিলের উপরে বাড়তি মাসোহারা  গুনতে হয়। শিক্ষাজোন হিসেবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টার থেকে বড় অংকের মাসিক চাঁদা সংগ্রহের বিষয়টিও একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেছে। কেয়ারী ইলিসিয়াম, সাফআমিন, গোলজার টাওয়ার, সুবাস্তু টাওয়ার, চকসুপার মার্কেট, বালি আর্কেট এই ছয়টি মার্কেট থেকেই দেড় লক্ষ টাকা মাসোহারা সংগ্রহ করেন বিদ্যুৎ বিভাগের জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা।

মাসোহারার বড় অংশই আসে মেডিকেল বস্তি, দেবপাহাড়ের বস্তি থেকে। অবৈধভাবে গড়ে উঠা এসব বস্তিতে অন্তত ‘এক হাজার গ্রাহক’ বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। বস্তিতে  কিছু মিটার সংযোগ দিয়ে সেসব মিটার থেকে পুরো বস্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে দীর্ঘদিন থেকে। সুত্রমতে, অবৈধ সংযোগের পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করেন বিদ্যুৎ বিভাগের একজন নির্বাহী প্রকৌশলী,  তিনজন উপসহকারী প্রকৌশলী  ও চার বিদ্যুৎ পরিদর্শকের সংঘবদ্ধ চক্র। তবে এসব বস্তিতে বসবাসরতদের দাবি তারা নিয়মিত বিল দিচ্ছে মুল মিটারের বিপরীতে। একটি বাতি, একটি ফ্যান কিংবা দুইটি ফ্যান, তিনবাতির প্যাকেজে বিদ্যুৎ কিনে ব্যবহার করছে বাসিন্দারা। এসব বিদ্যুৎ সংযোগের টাকা কারা সংগ্রহ করছে সেই বিষয়ে মুখ খুলতে নারাজ বাসিন্দারা। সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া, বাড়তি গড় বিল ধরিয়ে দেয়ার মতো  ভোগান্তির ভয়ে চকবাজার এলাকার ভবন মালিকরাও তটস্থ।

জয়নগর আবাসিক এলাকার দুজন ভবন মালিক বলেন, ‘ জোনের নির্বাহ প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী,  উপ সহকারী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে মিটার রিডার সবাই এই ‘ঘুষবাণিজ্যে’ জড়িত। সুতরাং মুখ বুজে সহ্য করা ছাড়া উপায় নেই, কাউকে অভিযোগ দেয়াটাই বোকামো হবে। ‘

জানা গেছে, অবৈধভাবে বিদ্যুৎ  বিচ্ছিন্ন করা ভবনটিতে  সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত  বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপন করা হয় নি। তবে এই ভবনে অবৈধ সংযোগ থাকার বিষয়টি প্রমাণ করতে না পেরে, নস্ট থাকা দুটি প্রিপেইড মিটারের বিপরীতে  ১৩ হাজার টাকা জমা দেবার নির্দেশনা দিয়েছেন বিদ্যুৎ বিভাগের  নির্বাহী প্রকৌশলী তৌহিদুল আলম। ভবন কর্তৃপক্ষ এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী  তের হাজার টাকার প্রি পেইড ভাউচার পরিশোধ করে রেয়াজউদ্দিন বাজারের বিদ্যুৎ কার্যালয়ে রিচার্জের কোড জমা দিয়েছেন। দীর্ঘদিন থেকে নস্ট থাকা দুটি প্রি পেইড  মিটারের বিপরীতে কেন নতুন করে রিচার্জ করতে হবে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেন নি সংশ্লিষ্টরা।