বিভাগীয় পদ্ধতির আড়ালে বাণিজ্য
সেতুর টোলে আদায় লুটপাট: রাজস্ব ক্ষতি ৫০ কোটি টাকা

::: নিজস্ব প্রতিবেদক :::

টোল আদায় বাবত সরকারের রাজস্ব খাতের আয় কমে গেছে। একই সঙ্গে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো নিয়ম-নীতি না মেনে টোল প্লাজা ইজারা দেয়া, ইজারার মেয়াদ বৃদ্ধির মাধ্যমে  লুটপাটের সুযোগ অবারিত করার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে টোলকাতে  কম রাজস্বকে বৈধতা দিতে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে ইজারার মেয়াদ শেষে বিভাগীয় পদ্ধতিতে টোল আদায় করছে সড়ক ও জনপদ বিভাগের একটি চক্র।

বঙ্গবন্ধু সেতু পাড়ি দিয়ে দেশের ২৩ জেলায় প্রতিদিন  চলাচল করে প্রায় ১৫ হাজার যানবাহন। এই সেতুর টোল আদায়ে নজিরবিহীন অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সিলেটের কুশিয়ারা সেতুর টোল আদায়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠে। ২০১২ সালে তিন বছরের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হলে মার্গানেট ওয়ান লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান ৯ কোটি ৯২ লাখ ৪৩০ টাকায় সেতুর টোল আদায়ের অনুমতি পায়। ২০১৫ সাল পর্যন্ত টোল আদায়ের পর আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক আরও ১ বছর প্রতিষ্ঠানটি টোল আদায় করে। ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঐ প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ শেষ হয়। পরে ফেঞ্চুগঞ্জ সেতুর টোল আদায়ের দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে বিভাগীয় পদ্ধতির মাধ্যমে  টোল আদায় হচ্ছে নিয়মিত। এ নিয়ে অসন্তোষ চালক মালিকদের ভিতরে।

এ বিষয়ে জানতে টোল প্লাজায় গেলে ম্যানেজার  জানান, টোল কার ইজারায় তা তার জানা নেই। তারা টাকা তুলে দেন এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের লোকজন এসে টাকা নিয়ে যায়।

খুলনার রূপসা (খানজাহান আলী) সেতুর টোল আদায় নিয়ে অনিয়মের প্রমাণ পায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত বছরের জুলাই মাসে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা অভিযান চালিয়ে ট্রাকের টোল আদায়ে অনিয়মের প্রমাণ পান।  এ ঘটনায় টোল আদায়কারী কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করে দুদক।গেল মাসের ২৭ শে ফেব্রুয়ারী খুলনার রুপসা সেতুর টোল আদায়ে আবারও অনিয়ম পায় দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদক খুলনার উপ-পরিচালক মো. নাজমুল হাসান অভিযান চালিয়ে উদঘাটন করেন  সেতু পারাপারের ক্ষেত্রে বড় ট্রাকের ধার্য্য  টোল ২৭৫ টাকা। কিন্তু ডাটা এন্ট্রি অপারেটররা ২৫০ টাকা নিয়ে মাঝারি ট্রাকের রশিদ কাটছে। মাঝারি ট্রাকের টোল ১৮০ টাকা। বাকি ৭০ টাকা তারা আত্মসাৎ করছে।  এভাবে প্রতিদিন ২২০/২৫০টি ট্রাকের টোলের টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতো আদায়কারীরা।

চাঁদপুর জেলার মতলব সেতুতে নির্ধারিত টোলের চেয়ে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ বেশি টোল আদায় করার অভিযোগে অভিযান চাৱায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযানকালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টেকবে ইন্টারন্যাশনালের বিরুদ্ধে এনফোর্সমেন্ট টিম অতিরিক্ত টোল আদায়ের প্রমাণ পায় দুদক ।  ১৬ জানুয়ারি দুদকের চাঁদপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয় থেকে এই অভিযান চালানো হলে মেলে অনিয়মের প্রমাণ।

দুদক সূত্রে জানা যায়, মতলব উত্তর ও দক্ষিণ উপজেলার একমাত্র যোগাযোগের বন্ধন মতলব সেতু। এই সেতু দিয়ে চাঁদপুরের সদর, হাজীগঞ্জ, ফরিদগঞ্জ ও শাহরাস্তি এবং লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী জেলার মানুষ ঢাকায় যাতায়াত করেন। কিন্তু এ সুযোগে অতিরিক্ত টোল আদায় করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান টেকবে ইন্টারন্যাশনাল।

যদিও তালিকা অনুযায়ী, ট্রেইলার ১২৫ টাকা, হেভি ট্রাক ১০০ টাকা, মিডিয়াম ট্রাক ৫০ টাকা, বড় বাস ৪৫ টাকা, মিনিট্রাক ৪০ টাকা, কৃষি যান ৪০ টাকা, মিনিবাস কোস্টার ২৫ টাকা, মাইক্রোবাস/প্রাইভেটকার ২০ টাকা, ফোর হুইল যান ২০ টাকা, সিডান কার ১৫ টাকা, ৩/৪ চাকার যান ৫ টাকা ও মোটরসাইকেল ৫ টাকা করে রেট নির্ধারিত করে চাঁদপুর সড়ক ও জনপথ বিভাগ। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তোয়াক্কা না করেই দ্বিগুণ ও তিনগুণ অতিরিক্ত হারে টোল আদায় করছে।

এরআগে ২০১০ সালে দেশের ৪টি বড় সেতুর টোল আদায়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়। নতুন করে ইজারাবিহীন টোল আদায়ের কারণে অনিয়মের ফলে সরকার রাজস্ব হারাবে প্রায় ৫০ কোটি টাকা।এসব দুর্নীতি ও অনিয়মের কথা তুলে ধরে  দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

২০১২ সালেো কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব সেতু, নারায়ণগঞ্জের কাঞ্চন সেতু, নরসিংদীর ঘোড়াশাল সেতু ও চট্টগ্রামের তৃতীয় কর্ণফুলী সেতুর টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে দেশের অধিকাংশ সেতুতে কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে টোল আদায় ও অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স (ওএন্ডএম) কাজের দরপত্র দেয়ার ক্ষেত্রে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) ও সরকারের নিয়ম-নীতি মানা হয়নি। দরপত্রের শর্ত হিসেবে সেতুতে ওজন স্কেল বসানোর কথা থাকলেও সড়ক ও জনপদ বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ‘ওজন স্কেল’ বসানো হয়নি কোন সেতুতেই। ফলে  টোল আদায় খাতে সরকারের প্রায় ৫০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হবে।

দুদকে জমা দেয়া অভিযোগে বলা হয়েছে, সড়ক ও জনপদ (সওজ) অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তারা বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে অবৈধভাবে টোল আদায়কারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রক্রিয়া মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাো জড়িত। এ ব্যাপারে যোগাযোগ মন্ত্রী ও সচিবের  অনুমোদন নিয়ে  চূড়ান্ত কার্যাদেশ দেয়া হয়।
অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, সাধারণ ঠিকাদাররা যাতে শত কোটি টাকার ইজারার  টেন্ডারের তথ্য জানতে না পারেন সেজন্য অখ্যাত পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সুত্রমতে, সেতু ইজারা দেবার ক্ষেত্রে  প্রাক টেন্ডার মিটিং-এর ঘরেও কোনো তারিখ ও সময় রাখা হয় না। এমনকি কি  টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবার পরই তা সিপিটিইউ ও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। এর ফলে অধিকাংশ পেশাদার ঠিকাদার বিষয়টি জানতে পারে না।

রেজা কনস্ট্রাকশনকে গত অর্থ বছরে ভৈরব সেতুর টোল আদায়ের কাজ ৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা দেয়া হলেও এবার একই কাজ দেওয়া হচ্ছে ৩৬ কোটি টাকায়।
একইভাবে এম, এম, বিল্ডার্সকে ঘোড়াশালকে সেতুর কাজ ৩ কোটি ৯৯ লাখ টাকায় দেওয়া হলেও এবার এই কাজ দেওয়া হচ্ছে ১৮ কোটি টাকায়। একই সাথে কাঞ্চন ব্রীজের ক্ষেত্রে শতকরা তিনশ ভাগ বেশি দরে কাজ দেয়া হচ্ছে।

সেল-ভান, ইউডিসি, এমএম বিল্ডার্স, রেজা কনস্ট্রাকশন এমন কিছু প্রতিষ্ঠানের নামে টোলের ইজারা নিয়ে উপটোল আদায়কারী বসানো হয়েছে ঘোড়াশাল, ভৈরব, চট্টগ্রাম পোর্ট এক্সেস রোড, শাহ আমানত সেতুতে। সংশ্লিষ্টরা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ঠিকাদার নিয়োগের অনুরোধ জানালেও কর্ণপাত করে মন্ত্রণালয়।

একইভাবে ৩য় কর্ণফুলী সেতুর টেন্ডার দেয়া হয়েছে ২০১২ সালে।  সেতুর প্রকল্প পরিচালক টোল আদায়ের দরপত্র আহবান করেন। এই কাজের দরপত্র কেনা ও জমা দেয়ার  জন্য দরপত্র দাখিলের সময় দেয়া হয় মাত্র ১৯ কার্যদিবস, যা সম্পূর্ণ পিপিআর বহির্ভূত। এছাড়া দরপত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানদের সঙ্গে রাখার সুযোগ দেয়া হয়নি। পরে সেটি হাত ঘুরে সড়ক ও জনপদ বিভাগের প্রকৌশলীদের পকেটে ডুকেছে।

এভাবে কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও কিছু মাফিয়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের যোগসাজোগে অবৈধ প্রক্রিয়ায় দেশের  বিভিন্ন  সেতুর টেন্ডার করায় সরকার অন্তত ৫০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে। তৃতীয় কর্নফুলী সেতুর অনিয়ম তদন্ত করে কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি।  তদন্ত কমিটি তৃতীয় কর্নফুলী সেতুর টেন্ডার প্রক্রিয়ার অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত করে প্রতিবেদন দেবার পরে  বিভাগীয় পদ্ধতিতে টোল আদায়ের সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেয় সেতু বিভাগ।

মহাসড়কের বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে আইনি ভিত্তি দিতে ২০২১ সালের ২৭ নভেম্বর জাতীয় সংসদে ‘মহাসড়কে টোল আদায়’ আইন পাস করা হয়। ওই আইন অনুসারে সরকার গেজেট প্রকাশ করে বলে দিতে পারবে, কোন সড়ক বা মহাসড়কে কে প্রবশে করতে পারবে আর কে পারবে না। একই প্রক্রিয়ায় মহাসড়ককে এক্সপ্রেসওয়ে ঘোষণা করে এ পরিচালনা পদ্ধতি ও টোল সম্পর্কিত ঘোষণা দিতে পারবে। এতে আরো বলা হয়েছে, সরকার বা সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি মহাসড়ক উন্নয়ন, মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণ, মহাসড়ক সংশ্লিষ্ট স্যুয়ারেজ সিস্টেম, ড্রেন, কালভার্ট, সেতু নির্মাণ ও সংস্কার করবে। আইনে সরকারের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেয়ার মধ্যেই রয়ে গেছে সড়ক নির্মান ও রক্ষণাবেক্ষনে বেসরকারী প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেয়ার সুযোগ।

দেশে বর্তমানে নির্মানাধীন সব মহাড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, ফ্লাইওভার জনগণের করের টাকায় নির্মাণ করা হচ্ছে বিশ্বব্যাংক-এডিবি বা অন্য কোনো বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেয়া হলেও তা জনগণের অর্থেই পরিশোধ করা হবে। আবার এসব সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ কাজ চলাকালে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। নির্মান কাজ শেষে মহাসড়কের মাঝে টোল আদায় সাধারণ মানুষের উপর বাড়তি খরচের বোঝা চাপানোর পাশাপাশি চলাচলেও দুর্ভোগ সৃষ্টি করবে।