শিবিরের সাজ্জাদ বাহিনীর চাঁদাবাজি
আলোচিত মামুন গোয়েন্দা পুলিশের জালে

::: নিজস্ব প্রতিবেদক :::

চট্টগ্রামের আলোচিত এইড মার্ডারের মাস্টার মাইন্ড বিদেশে পালিয়ে থাকা শিবিরের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ দীর্ঘদিন থেকে পালিয়ে বেড়ালেও চট্টগ্রামে তার দাপট কমেনি কিঞ্চিত পরিমানও। আওয়ামী লীগ নেতা সেজে গুরু সাজ্জাদের সাম্রাজ্য পাহারা দিচ্ছিলেন শিষ্য আবদুল্লাহ আল মামুন। বুধবার (৭ই জুন)  ভোররাতে তাকে অক্সিজেনের বাসা থেকে আটক করে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একটি দল।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ কমিশনার (দক্ষিন)  নিহাদ আদনান।

গোয়েন্দা সুত্র জানিয়েছে, আটক করার পর থাকে মনসুরাবাদ ডিবি কার্যালয়ে আনা হয়। তাকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত জিজ্ঞেসাবাদ করে ডিবি। পরে তাকে বায়েজিদ থানায় সোপর্দ করা হয়। তার বিরুদ্ধে পাঁচলাইশ ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার কফিল উদ্দিন খান বাদি হয়ে হত্যার হুমকি ও চাঁদা দাবির মামলা দায়ের করেছেন। এছাড়া শাকিল আহমেদ নামের নয়াবাজার এলাকার আরেক ভুক্তভোগী জমি দখল ও চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেছেন।

শাকিল আহমেদ জানান, এক নং কালারপুল এলাকায় নিজের জমির দেয়াল নির্মাণ করতে গেলে মামুন সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে বাঁধা দেয়। পরে দশ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দেয়ায় নয়াবাজার এলাকায় বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে প্রতিদিন চলার পথে বাঁধা হুমকি দেয় মামুন।

শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের নামে চট্টগ্রাম শহরের বায়েজিদ থানার ওয়াজেদিয়া, চালিতাতলী, হাজীরপুল, চান্দগাঁও এলাকার শমসের পাড়া, পাঁচলাইশ থানার বিবিরহাট এলাকায় নিরবে চাঁদাবাজি করলেও পুলিশ কোন ব্যবস্থা নেয় নি। ভূঁইপোড় সংগঠন ‘বাংলাদেশ জননেত্রী শেখ হাসিনা পরিষদ’এর নেতা পরিচয় দিয়ে সাজ্জাদের চাঁদাবাজি ও বাহিনীর সমন্বয় করে আসছিলো ‘আব্দুল্লাহ আল মামুন’।

তার বাহিনীর অন্য সদস্যরা হলেন  নূরনবী ওরফে ম্যাক্সন ও মঈনুদ্দিন রাশেদ ওরফে ভাগিনা রাশেদ।  ইতিমধ্যে এদের মধ্যে সরওয়ার  এবং মো: ফিরোজ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছে। এইড মার্ডার ছাড়াও একটি অস্ত্র মামলায় ২১ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত নুর নবী ওরফে ম্যাক্সন গেল বছর ভারতের কোলকাতায় আশ্রয়দাতা এক নারীর হাতে মারা গেছেন। ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী  সাজ্জাদের চাঁদাবাজি ও জমিদখল, কন্ট্রাক কিলিং কাজের সমন্বয় করে আসছিলেন  আবদুল্লাহ আল মামুন।

গেল সপ্তাহে একটি মামলায় সাজ্জাদকে কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।চট্টগ্রামে ২২ বছর আগে অস্ত্র উদ্ধারের মামলায় তিনজনকে ২০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। তাঁরা হলেন ‘শিবির ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিত সাজ্জাদ আলী খান, দেলোয়ার হোসেন ওরফে আজরাইল দেলোয়ার ও আলমগীর ওরফে বাইট্টা আলমগীর।

সাজ্জাদের সাম্রাজ্য পাহারা দিতে শিল্পএলাকা খ্যাত বায়েজিদ, বিবিরহাটে শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ে তিনটি কিশোর গ্যাং প্রতিষ্ঠা করেছেন আব্দুল্লাহ আল  মামুন। জানা যায়,  এসব কিশোরদের কাছেই তুলে দেয়া হয়েছে শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদের অস্ত্রভান্ডার। কিছুদিন আগে একটি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা অস্ত্রসহ ধরা পড়লে, তাদের স্বীকারোক্তিতে ফাঁস হয় আব্দুল্লাহ আল মামুনের নাম।

গোয়েন্দা সুত্র মতে, , ২০০২ সালে ভিন্ন নামে  জাল পাসপোর্ট তৈরি করে মধ্যপ্রাচ্যে পালিয়ে যান সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী  এই আবদুল্লাহ আল  মামুন। প্রতিবেদকের হাতে আসা পাসপোর্ট অনুযায়ী ‘নিজের নাম’ ‘পিতার নাম ‘ পরিবর্তন করে মামুন পাসপোর্টটি সংগ্রহ করেছিলেন ২০০২ সালের ১৯ শে মে। সেই পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয় ২০০৭ সালের ১৮ ই মে। ‘ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ‘ নামে সেই জাল পাসপোর্টটি তৈরি করেছিলেন মামুন। নিজের পিতার নাম মোহাম্মদ ইউনুচ হলেও পাসপোর্টে লিখেছেন ‘ মোহাম্মদ আলী’। হাটহাজারী উপজেলার দক্ষিণ মাদার্শার ঠিকানা ব্যবহার করে এই জাল পাসপোর্ট তৈরি করেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। ২০০৭ সালের ৩রা আগস্ট সেই জাল পাসপোর্টটি নবায়নও করা হয়েছে। দুবাইয়ে শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ,  মামুনের ছত্রছায়ায় আস্তানা গেড়েছিলেন।  দেশ থেকে পালিয়ে এইড মার্ডারের আসামী ‘বেলাল উদ্দিন মুন্না’ যোগ দিয়েছিলেন তাদের সাথে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে ,  আব্দুল্লাহ আল মামুনই মুলত সাজ্জাদের হয়ে চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন  বায়েজিদ থানার ওয়াজেদিয়া, চালিতাতলী, হাজীরপুল, চান্দগাঁও এলাকার শমসের পাড়া, পাঁচলাইশ থানার বিবিরহাট এলাকায়। এসব এলাকায় বাড়ি নির্মাণ থেকে শুরু করে জমি ক্রয়-বিক্রয়, জমি ভরাট, সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, শিল্পকারখানা থেকে ভাসমান দোকান ও পরিবহন স্ট্যান্ড কেন্দ্রিক বেপরোয়া চাঁদাবাজিতে সক্রিয় বিদেশে পলাতক ইন্টারপোলের রেড নোটিশধারী শিবিরের  শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ বাহিনী। বিভিন্ন ব্যবসায়ী, নির্মাণাধীন ভবন মালিক ও শিল্পকারখানার মালিকদের ফোন করে চাঁদা দাবি করেন তিনি ; মামুন নিজের কিশোর গ্যাং দিয়ে সংগ্রহ করে চাঁদা। তার কথামতো চাঁদা না দিলে টার্গেট করা ব্যক্তির বাসাবাড়ি কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গুলিবর্ষণ, পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ ও অগ্নিসংযোগ করে মামুনের নেতৃত্বাধীন তিন কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা।

দীর্ঘ বিশ বছর ধরে শিবিরের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী  সাজ্জাদের সাম্রাজ্য পাহারা দেয়া বিভিন্ন সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারের পর কারাগার থেকে ছাড়িয়ে নেবার দায়িত্বও পালন করে আসছেন ‘আবদুল্লাহ আল মামুন’। নথি অনুযায়ী ২০১৬ সালের ১৯ জানুয়ারি সাজ্জাদ গ্রুপের  দুই সন্ত্রাসী ফারুক ও মইনুল হোসেনের জামিননামায় স্বাক্ষর করেছেন মামুন। দুইজনই ২০১৪ সালে একনলা বন্দুক, গোলাবারুদ ও মোটর সাইকেলসহ পুলিশের  গ্রেফতার হয়েছিলেন।

২০০৩ সালের দিকে আবার দুবাই পাড়ি জমায় মামুন। পরে দেশে থাকা শিবির ক্যাডার সাজ্জাদ ২০০৪ সালের শেষের দিকে র‌্যাবের অভিযানে টিকতে না পেরে দুবাই গিয়ে মামুনের আশ্রয়ে ওঠে। সেখানেই পুনরায় সংগঠিত হয় সাজ্জাদের বাহিনী। সাজ্জাদের মা বেঁচে থাকাকালীন বেশ কবার মামুনের সাথে নিয়ে  ভারতে গিয়ে ছেলে সাজ্জাদের সাথে দেখা করেছিলেন।